চিকিৎসাসেবা-আসুন, একটি ন্যায্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি by তানজিনা হোসেন

রাজধানীর একটি ব্যয়বহুল পাঁচ তারকা বেসরকারি হাসপাতালে সর্দিজ্বরের কারণে দিন চারেক কাটিয়ে পরিচিত প্রবাসী এক ভদ্রলোক মুগ্ধ কণ্ঠে রায় দিলেন, ‘বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। কী চমৎকার ইনটেরিয়র, সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, ঝকঝকে তকতকে মার্বেল পাথরের মেঝে,


সেবিকা ও কর্মচারী সবাই পশ্চিমা ধাচের পোশাকে ফিটফাট ও সুসজ্জিত—অনায়াসে সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককের কোনো হাসপাতালের সঙ্গে তুলনীয়।’ যে কথাটি ভদ্রলোক বলেননি তা হচ্ছে, সর্দিজ্বরের কারণে এখানে চার দিন চিকিৎসা নিতে তাঁর ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছিল এবং প্রবাসী আয়ের সঙ্গে এই ব্যয় তাঁর কাছে সংগত মনে হলেও বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের পক্ষে তা ন্যায়সংগত কি না।
এ প্রসঙ্গে হয়তো অনেকেই বলবেন, যাদের সংগতি নেই, তারা কেন এসব হাসপাতালে আসবে? তাদের জন্য তো সরকারি হাসপাতাল রয়েছে, থানায় থানায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, তারা ওখানে গেলেই পারে। এটাই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পরিণতি। এখানে শেষ পর্যন্ত কেবল টাকা থাকলেই মিলবে চিকিৎসা, টাকা থাকলে পাওয়া যাবে শিক্ষা; মানুষের সব মৌলিক অধিকার এখানে টাকার অঙ্কে কেনা-বেচা করা হয়। পকেটে টাকা না থাকলে বাঁচার অধিকারও থাকবে না কারও। আর সবকিছুর মতোই স্বাস্থ্যসেবারও চূড়ান্ত বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে আমাদের দেশে। পুরো চিকিৎসা খাতকেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের করপোরেট দৌরাত্ম্য চিকিৎসাব্যবস্থাকে কিনে নিয়েছে প্রায়, এমনকি ফার্মাসিউটিক্যালগুলো নিজেরাই অনেক হাসপাতালের মালিক, আর ওই হাসপাতালে কেবল ওই কোম্পানির ওষুধই চলে—এমন চক্রও গড়ে উঠেছে এখানে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন প্রচলবিরোধী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডেভিড ওয়ারনার। তিনি বলেছেন, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান বা মেডিকেল এস্টাবলিশমেন্ট হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় বাধা। বলেছেন এই সত্য যে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বিশ্বে সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেন মায়েরা। মায়ের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়ন জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি ঘটাতে পারে। ডেভিড ওয়ারনারের এই বক্তব্যগুলো খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার আজকের বাংলাদেশে। উন্নত চিকিৎসাসেবার উদাহরণ শহরের মোড়ে মোড়ে পাঁচ তারকা হোটেলের আদলে তৈরি ক্লিনিক বা হাসপাতাল স্থাপন নয়, বরং ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, কম খরচে দ্রুত হাতের কাছে ন্যূনতম জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ, নিরাপদ মাতৃত্ব, শিশুর সঠিক পুষ্টি ও বৃদ্ধির নিশ্চয়তা। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান বিচার সব সময় সম্ভব নয়। এর একটি চমৎকার উদাহরণও দিয়েছেন ডেভিড ওয়ারনার। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে মাথাপিছু ব্যয় ২০ গুণ কম হলেও কিউবার স্বাস্থ্যসেবার মান যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো। প্রায় একই ধরনের কথা বলে গেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনও। সাম্প্রতিক সফরে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার দিক দিয়ে বিশেষ করে মাতৃ ও প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবায় ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে। ভারতের বড় বড় শহরে এ অঞ্চলের সর্বাধুনিক ও খ্যাতনামা সব হাসপাতাল অবস্থিত হলেও সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান খারাপ। কিছু কিছু এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব মারাত্মক প্রকট, গ্রামাঞ্চলে জনস্বাস্থ্য সচেতনতার অবস্থাও ভালো নয়। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, সীমিত আয় ও সম্পদ নিয়েও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো সম্ভব। তার জন্য দরকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কোনটি প্রায়োরিটি বা বেশি জরুরি, তা নির্ধারণ করা।
বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবার পথে সবচেয়ে বড় বাধাটি বোধ হয় বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার বিপরীতে অত্যন্ত অপ্রতুল চিকিৎসক-নার্স ও প্রশিক্ষিত লোকবল। আজকের দুনিয়ায় তাই স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর থেকে বিপুল ভার হ্রাস করার জন্য জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে সব জনসাধারণের অংশগ্রহণকে বেশি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা, শিশুর সঠিক পুষ্টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার গুরুত্ব এবং ডায়রিয়া-নিউমোনিয়া প্রভৃতি রোগে প্রাথমিক কর্তব্য সম্পর্কে মায়ের সঠিক ধারণা লাখ লাখ শিশুর মৃত্যু ঠেকিয়ে দিতে পারে—এটা আজ সত্য প্রমাণিত হয়েছে আমাদের দেশে। কেবল মায়েদের সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই কমিয়ে দিতে পারে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর বিপুল পরিমাণ চাপকে। একইভাবে ছোটদের স্বাস্থ্যশিক্ষা যেমন-বিশুদ্ধ পানি পান, খাওয়ার আগে ও বাথরুমের পর হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা, খাদ্য সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান, ময়লা-আবর্জনা, মলমূত্র ও বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিক্ষা ইত্যাদি পরিবার তথা জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরাট ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, যা কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণের চেয়েও বেশি ফলদায়ক। একসময় বাড়ির বা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ সদস্যটির স্বাস্থ্য-উপদেশ সবাই মাথা পেতে নিত, শিশুজন্মে বা যেকোনো অসুস্থতায় ডাক পড়ত পাড়ার অভিজ্ঞ নানি-দাদির—এই অগ্রজদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায় বিকল্প স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বয়স্ক মানুষকে এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তা অনেকেরই জানা। স্বাস্থ্যসেবাকে গুটিকয় হাসপাতাল বা ক্লিনিক-চেম্বারে কুক্ষিগত না করে তাকে সত্যিকার অর্থেই দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, যদি পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তোলা যায় প্রশিক্ষিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাস্থ্য ইউনিট, যারা নিজেদের মধ্যে থেকেই নিজেদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে অবদান রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন স্বাস্থ্যসেবার মূলধারায় কবিরাজ, ওঝা, শামান ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসকদেরও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে, যাতে করে সবাই মিলে একটি বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতে স্বাস্থ্যবিষয়ক এক চিকিৎসক সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে মানবিকতা (হিউম্যানিজম), নেতৃত্ব (লিডারশিপ) ও পেশাদারিত্ব (প্রফেশনালিজম) বিষয়ে সে দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকদের সুগভীর ভাবনাচিন্তা শুনে বিস্মিত হয়ে ভেবেছি, আমাদের দেশে চিকিৎসকদের সেমিনার বা সম্মেলনগুলো কেন খটোমটো মেডিকেল টার্মসেই শেষ পযন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, কেন আমাদের ভাবনাগুলো কেবল টেক্সটবুক ও জার্নালকেন্দ্রিকই থেকে যায়, কিছুতেই গণবান্ধব হয়ে ওঠে না।
কেন আমাদের চিন্তাচেতনা আর স্বপ্নভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার বিশাল আর অবাস্তব এক ফারাক থেকে যায়? কেন আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন বলতে কেবল আরও বেশিসংখ্যক চিকিৎসকের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, আরও বেশিসংখ্যক ঝা চকচকে হাসপাতাল নির্মাণ, আরও বেশিসংখ্যক ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির আমদানি ও সমাহারকেই বুঝি? সবার জন্য ন্যায্য ও টেকসই এক স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্নটি পর্যন্ত এখনো আমরা দেখে উঠতে পারিনি, তার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা। ডেভিড ওয়ারনারের মতো স্বপ্নদ্রষ্টা চিকিৎসকের আজকের বাংলাদেশে তাই সত্যি প্রয়োজন।
তানজিনা হোসেন: এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিজম বিশেষজ্ঞ, বারডেম।

No comments

Powered by Blogger.