মধ্যবর্তী নির্বাচন, আমেরিকায়, বাংলাদেশে! by সোহরাব হাসান

‘ছাত্রলীগ’ না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডেমোক্রেটিক দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে; বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে আগামী নির্বাচনে জয়ী হবেন?
এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে উঠেছে আওয়ামী লীগের কট্টর ও নরম সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে, যারা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কিছু চায় না। মৌলবাদী জঙ্গিবাদীদের হাত থেকে রেহাই পেতে চায়, যারা বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ছিল। আবার তত্ত্বাবধায়কের আড়ালে আধা উর্দি শাসনও পছন্দ করে না।
বাংলাদেশ ও আমেরিকার রাজনীতিতে অমিলই বেশি। বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ, আমেরিকা ধনী দেশ। আমেরিকায় কখনো সামরিক শাসন আসেনি, বাংলাদেশে সেনা শাসন আসে যাওয়ার জন্য, যায় আসার জন্য। আবার কিছু কিছু বিষয়ে মিলও রয়েছে। দুই দেশেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমেরিকায় রিপাবলিকানরা অধিক কট্টর ও ডানপন্থী বলে পরিচিত। ডেমোক্র্যাটদের উদারপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুই দশক ধরে বাংলাদেশও শাসন করে আসছে দুটি দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এখানেও আওয়ামী লীগকে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ও বিএনপিকে ডানপন্থী দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তাদের উভয়ের মধ্যে অগণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা এত প্রবল যে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে চিহ্নিত করতে কষ্ট হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামা অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তি এবং দিনবদলের কথা বলে আমেরিকানদের ভোট আদায় করেছিলেন। জর্জ ডব্লিউ বুশের যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা সে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। স্বভাবতই মার্কিন জনগণের প্রত্যাশা ছিল, ওবামা তাদের ভাগ্যোন্নয়নে কিছু করবেন, বেকারত্ব দূর হবে, অর্থনৈতিক মন্দা কেটে যাবে। কিন্তু প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়লেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানকার মানুষ যতটা আশা নিয়ে ওবামাকে ভোট দিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি হতাশা নিয়ে তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তরুণদের একটি বড় অংশ এখন রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশেও ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়। ওবামার সঙ্গে সুর মিলিয়ে শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের মানুষকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সাল নাগাদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছিলেন। তরুণ প্রজন্ম তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। ওবামার মতো শেখ হাসিনারও শুরুটা ছিল চমৎকার। তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন ধারা তৈরির ওয়াদা করেছিলেন। দুর্ভাগ্য, পুরোনো ধারাতেই রাজনীতি চলছে। সরকার কিংবা বিরোধী দল—কোথাও পরিবর্তনের সামান্য ইঙ্গিত নেই। একদিকে সরকারি দলের একগুঁয়েমি, অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন। কারও মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা নেই। একে অন্যকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত। কেউ আদালতে, কেউ রাজপথে রাজনৈতিক বিরোধে মীমাংসা চায়। সংসদকে অকার্যকর করে রাখতে চায়।
শুরুতে লিখেছিলাম, ওবামার দলে ছাত্রলীগ নেই। অর্থাৎ, তাঁর ডেমোক্রেটিক দলে এমন কোনো কর্মী নেই—যাঁরা নানা অপকর্ম করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে, যাঁরা দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি ছাত্রসংগঠনটি সব সময় জনগণের স্বাধীনতা হরণের স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। স্বাধীনতার পর তারা মুজিববাদের নামে, পঁচাত্তরের পর ‘আমরা শক্তি আমরা বল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ স্লোগান দিয়ে সরকার-সমর্থক সংগঠনগুলো অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
সেই ধরনের কোনো অপশক্তি সিনবাদের দৈত্যের মতো ওবামার কাঁধে চেপে না বসলেও তার দল প্রতিনিধি পরিষদে ৫৭টি ও সিনেটে আটটি আসন হারিয়েছে। আগে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। এখন এক আসনের ব্যবধানে সিনেটে জয়ী হলেও প্রতিনিধি পরিষদে সুনামি হয়েছে তাদের।
নির্বাচনের পর বারাক ওবামা বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীদের মতো একে নীলনকশার নির্বাচন বলে অভিহিত করেননি, ফলাফলের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রও আবিষ্কার করেননি। তিনি জনরায় মেনে নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে একযোগে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একইভাবে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরাও মহাবিজয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বেফাঁস কিছু বলে ফেলেননি। ‘মুক্তাঙ্গনে’ জনসভা ডেকে সরকার পতনের আন্দোলনেরও ডাক দেননি। এটাই হলো গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সুস্থ রাজনীতি। স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি, তাজুল-নূর হোসেন-মিলনরা জীবন দিয়েছেন; কিন্তু জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র এখনো আসেনি। আমাদের আর কত কাল এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে?
আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেছে। সেটি পূর্বনির্ধারিত। প্রতি দুই বছর পর পর প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি উঠেছে। সেটি অনির্ধারিত। প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দল মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এ ধরনের দাবি ওঠে। দাবি ওঠানো হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি এক সমাবেশে সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘জনরোষ বাড়ার আগেই ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।’ গণতান্ত্রিক সমাজে যে কেউ যেকোনো দাবি পেশ করতে পারেন। কিন্তু তারও নিয়মকানুন আছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের পতন ঘটাতে হলে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে হবে। ভোটাভুটিতে জয়ী হতে হবে। মুক্তাঙ্গনে সরকারের পদত্যাগ দাবি করলেই সরকার বদলাবে না। এ ছাড়া পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি সরকারকে ২৩ মাসের মাথায় এভাবে সরিয়ে দেওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য এটি বড় ধাক্কা। নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেকারত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারের ভোট গ্রহণ শেষে দেখা গেছে, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে রেকর্ডসংখ্যক আসন হারিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৪৭টি এখন রিপাবলিকানদের দখলে। পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ২৩৯টিতে জয়ী হয়ে সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এ ছাড়া যে ৩৭টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন হয়েছেন, সেখানেও ২৬টিতে জিতেছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা।
মূলত অর্থনৈতিক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন জনগণ চাকরি হারিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নির্বাচনে। বেকারত্ব, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সরকারের বিপুল অঙ্কের দেনা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত সংস্কারের মতো বড় বড় পরিকল্পনাও জনগণের মত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আর এতে ইন্ধন দিয়েছে টি-পার্টি আন্দোলন।
দলের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের নেতা জন বোয়েনারকে অভিনন্দন জানান। তিনি বোয়েনারকে বলেন, আগামী দিনে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী। বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনে এরূপ ফল হলে বিরোধী দল রাজপথে অবস্থান নিত এবং সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরত না। সরকারও বিরোধী দলকে পুলিশ বাহিনী দিয়ে দমন করতে চাইত। নেতা-কর্মীদের জেলখানায় পাঠাত এবং সদম্ভে ঘোষণা করত, মেয়াদের এক দিন আগেও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। এখানেই আমেরিকা ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পার্থক্য।
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হ্যানসেন হাসিম ক্লার্ক মিশিগান থেকে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই। আশা করি, তিনি অন্তত আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো আচরণ করবেন না।
ওবামা ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর নেওয়া কর্মসূচি জনগণের মধ্যে আশা জাগাতে পারেনি; বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে সক্ষম হয়নি—তার সবই স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীরা কখনো ভুল স্বীকার করেন না। নিজের কৃতকর্মের দায় অন্যের ওপর চাপাতে পছন্দ করেন। একুশ শতকে বসবাস করেও তাঁরা চিন্তা-চেতনায় উনিশ শতকে পড়ে আছেন। সেই কথিত ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘দেশ বিক্রি’র তত্ত্বে আটকে আছেন নেতা-নেত্রীরা। এর থেকে মুক্তির উপায় কী?
রাজনীতি হবে গণমানুষের সমস্যা-সংকট নিয়ে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যানজট সমস্যা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কীভাবে রোধ করা যায়, সেসব নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে, সংসদের বাইরে আলোচনা হবে। অথচ দেশের রাজনীতি আটকে আছে একটি বাড়ি ও দুই পুত্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মধ্যে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, হাইকোর্ট যে রায়ই দিন না কেন, রাজপথেই বাড়ির বিষয়টি ফয়সালা হবে। আইনবিশারদের আইনি কথাই বটে। রাজপথে ফয়সালার অর্থ হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও-ভাঙচুর, লাঠিপেটা, জেলজুলুম—আরও কত কিছু। মনে হচ্ছে দেশে আর কোনো সমস্যা নেই। টিভি খুললে নেতাদের বুলন্দ আওয়াজ শুনি—বাড়ি রক্ষা কিংবা উচ্ছেদ করতে হবে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের রণহুংকারের বিবরণ পড়ি, তাতে লজ্জিত হই, ব্যথিত হই। যদিও তাঁরা নির্বিকার, একে অন্যকে ঘায়েল করেই চলেছেন।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের এক কর্মশালার আয়োজন করেছেন। সেই কর্মশালায় কী শিক্ষা দেওয়া হবে, তার ওপরে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তারা যদি সুস্থ রাজনীতি অনুশীলন করে; চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজির পথ পরিহার করে, তাহলে হয়তো আগামী নির্বাচনে জয়ের মৃদু সম্ভাবনা আছে। আর যদি সেসব পরিহার করতে না পারে, তাহলে তাদের পরিণামও বারাক ওবামার মধ্যবর্তী নির্বাচনের চেয়েও খারাপ হবে।
বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সরকারের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। সেটি হলো ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচন। অনেক আগেই ডিসিসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সেখানে যিনি মেয়র আছেন তিনি বিএনপির লোক। সিটি করপোরেশনের কাজের চেয়ে দলীয় কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তার পরও ডিসিসির নির্বাচন হচ্ছে না। সরকার কি তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সন্দিহান? না হলে ডিসিসির নির্বাচন দিতে বাধা কোথায়? আমরা আশা করব, সরকার বিরোধী দলের অন্তত এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, সেই ব্যবস্থা করবে। নির্বাচন কমিশনের কাজে অযথা নাক গলাবে না। আর সরকার যদি ডিসিসির নির্বাচন দিতে গড়িমসি করে, তাহলে বুঝব, তাদের পায়ের তলায় মাটি নেই। বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে থাকলে কেবল নিচেই নামতে হয়, ওপরে ওঠা যায় না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.