গর্জনকারী ধোঁয়া by অচিন সেন

আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোনো এক ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়া রাজ্যের একটি ছোট শিল্পশহর চিংগোলায় যাইÑ অভিজিৎ ছেলের কংকোলা কপার মাইনস প্রাইভেট লিমিটেডে চাকরি সূত্রে অবস্থানকালে আমরা জাম্বিয়ার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখার সুযোগ পাই। সেই দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে জাম্বিয়ার লিভিংস্টোন প্রদেশের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আমার দেখা দেশ-বিদেশের প্রাকৃতিক সৃষ্টি সম্ভারের এক অন্যতম আশ্চর্য। সেই অর্থে এটি কোনো পরিকল্পনামাফিক ভ্রমণ নয়।

ভিক্টোরিয়া ফলস চিংগোলা থেকে সাতশত কিলোমিটার দূরে লিভিং স্টোন প্রদেশের দক্ষিণ প্রান্তে। যাত্রাপথ মসৃণ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত সাউথ আফ্রিকা থেকে উত্তরে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হাইওয়ে- আফ্রিকার বিভিন্ন রাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সূত্রে সংযোগকারী রাজপথ। হাইওয়ের দু’পাশের জনপদগুলো দূরে দূরে এবং জনবিরল। ফলে রাস্তাঘাট অতিমাত্রায় ভিড়ে আক্রান্ত নয়। তাই কোথাও যানজট দেখা যায়নি। পাশের লেনগুলো দিয়ে মালাবোঝাই ট্রাক কন্টেনারগুলো ছুটে চলেছে অন্তত একশ’ কিলোমিটার বেগে আপনাপন গন্তব্যভিমুখে। আমাদের পক্ষে সাতশত কিলোমিটার পথ একদিনে অতিক্রম করা অসম্ভব কিছু ছিল নাÑ আবার অনায়াসলদ্ধও নয়। তাই অসচ্ছন্দ ভেবে যাত্রাপথে বিরতি ঘটাই। জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায় এক রাত্রি হোটেল বাস নিই।
পরের দিন সকাল সকাল প্রাতঃরাশ সেরে হোটেল থেকে লিভিং স্টোন অভিমুখে যাত্রা করি। এখনো বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সফর লম্বা হলেও রাস্তার ধকল অনুভূত হয়নি। ফেব্রুয়ারি মাস ওখানে বর্ষাকাল। যাত্রাপথে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমার ধারণার বিপরীতে রাস্তার দু’ধারে সবুজ পত্রপল্লবে শোভিত বৃক্ষসারি। আমার ধারণা ছিল গোটা আফ্রিকা মহাদেশটাই রুক্ষ্ম, শুষ্ক।
কিন্তু একটা জিনিসের অভাব চোখে পড়ার মতো। রাস্তার ধারে আমাদের দেশের মতো চায়ের দোকান মেলা ভার। চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে যেখানে হোটেল কিংবা মোটেল পাওয়া যায় সেখানে যাত্রাবিরতি নিতে হয়। তবে বাক্যবিনিময়ে ভাষা সমস্যা হয় না। স্থানীয় লোকজন শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলেই ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত- কারণ ইংলিশ জাম্বিয়ায় সরকারি ভাষা হিসেবে বিবেচিত ১৯৬৪ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরেও। যাই হোক, লোকজন, জলবায়ু, ভূপ্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই জাম্বিয়ার সাউদার্ন প্রদেশ লিভিং স্টোনে পৌঁছে গেলাম। বেলা থাকতে থাকতে পূর্ব নির্দিষ্ট হোটেলে আশ্রয় পেলেও বহু আকাক্সিক্ষত ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আর শরীর নিতে চাইলো না। এখানে সূর্যাস্ত যায় সন্ধ্যা আটটায়। আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে নিঝুম সন্ধ্যায় দূর থেকে ভেসে আসা রাগাশ্রয়ী গর্জন- কখনো বিস্ফারিত, কখনো স্তিমিত, শুনতে শুনতে কখন যে হোটেলের সুসজ্জিত বিছানায় নিদ্রায় ঢলে পড়েছি বুঝতে পারিনি- চোখের পাতা যখন নির্মিলিত হয়, তখন পরদিন সকাল সাতটা। তখনো শুনতে পাচ্ছি- সমুদ্রের পাড় ভাঙা ঢেউয়ের মতো অবিরাম নিরলস গর্জন জানান দিচ্ছে।
ভিক্টোরিয়ার এই আহ্বান উপেক্ষা করা আমাদের আর তর সইছিল না। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিলাম ভিক্টোরিয়া অভিমুখে। হোটেলের অনতিদূরে ভিক্টোরিয়ার আবিষ্কর্তা ডেভিট লিভিং স্টোনের খোদাই করা মর্মর মূর্তি। স্কটল্যান্ড অধিবাসী ডেভিড লিভিং স্টোন একজন খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মিশনারি এবং অনুসন্ধানকারী যিনি ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সুরিয়া এথনিক গ্রুপের প্রধান ঝবশবষরঃঁ-র সহায়তায় দুর্ভেদ্য জলজঙ্গলে ঘেরা গ্রহের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত ভিক্টোরিয়া ফলস আবিষ্কার করেন। সেই থেকে বিশ্বের এক ভয়ংকর সুন্দর প্রাকৃতিক সম্ভারের দরজা খুলে যায় বিশ্ববাসীর কাছে। ভিক্টোরিয়া ফলস কেবলমাত্র ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে না- দলে দলে আসতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে।
অভিজিৎ চাকরি সূত্রে জাম্বিয়ায় দশ/বার বছর প্রবাসী থাকায় বেশ কয়েকবার লিভিং স্টোনে ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আসে- তাই আমাদের পথ প্রদর্শন এবং ফলস দর্শনে আর গাইড নেয়ার দরকার পরে না। তার কথামতো মস্তক আবরণ এবং বর্ষাতী পরিহিত হয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। যত অগ্রসর হতে থাকি ভিক্টোরিয়ার গর্জন ক্রমশ বাড়ছেÑ শুনতে পাই। এইবার বুঝতে পারলাম, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের নাম স্থানীয় ভাষায় গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কেন বলা হয়। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কথার অর্থ ঞযব ধসড়ৎব ঃযধঃ ঞযঁহফরৎং. যতই এগোই জলীয় বাষ্পের ধোঁয়া ঊর্ধ্বপানে উঠতে দেখতে পাই। ১.৭ কিলোমিটারব্যাপী জলরাশি ১০০ মিটার নিচে গিরিসংকটে ভয়ঙ্কর গর্জনে আছড়ে পড়ছেÑ ফলে জলানু বাষ্পে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে পুনরায় তরলায়িত হয়ে বৃষ্টি আকারে নিচে পতিত হচ্ছে। সেই বিনা মেঘে বৃষ্টির বহর এমনই যে, সামনের যা কিছু দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
উচ্চতায় ও ব্যপ্তিতে যথাক্রমে ৩৫৪ ফুট এবং ৫৬০৪ আকারের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম প্রাকৃতিক ওয়াটার ফলস হিসেবে বিশ্বকোষে স্বীকৃত। ভিক্টোরিয়ার উচ্চতা উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা ফলসের দ্বিগুণ। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ-’র জল গর্জে পতিত হয়ে আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম নদী জাম্বেজি নদীতে মিশে প্রবাহিত হচ্ছে। জাম্বেজি জিম্বাবুয়ে এবং জাম্বিয়া রাজ্যের সীমারেখা এবং এই দু’টি দেশ ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দ্বারা পর্যটকদের অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। হেলিকপ্টারে উড়ে যাওয়ার সময় আমাদেরও উপর থেকে জলপ্রপাত, নেবানাল পার্ক, জাম্বেজি নদী এবং আরও অনেক কিছু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে লিভিং স্টোন দ্বারা ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আবিষ্কার হওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলের পরিচিতি অনেকগুণ বেড়ে যায়- শুধু পর্যটনকে ঘিরে নয়, খনিজ-বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল হয়ে ওঠে সম্পদ আহরণকারীদের কাছে এক লোভনীয় কেন্দ্র- উল্লেখ্য ডাইমন্ড, তাম্র, এমনকি সোনার খনিজ আকর, বহুমূল্য বনজ গাছপালা এবং গাছদণ্ড ও প্রাণীজ চর্ম এর বিশাল ভাণ্ডার। ১৮৯০ সালে এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আহরণ করতে এগিয়ে আসে এক দুঃসাহসিক বৃটিশ নাগরিক সিসিল রোডস তিনি জাম্বেজি নদীর উত্তরাশেং তার কর্মকাণ্ডের সূচনাপর্বে স্থাপন করেন ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানি। ঠিক আমাদের দেশে যেমন বৃটিশ ধুরন্ধররা বাণিজ্যকল্পে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
সিসিল রোডস তার কাজের সুবিধার্থে ঐ ছোট ভূখণ্ডকে দুই ভাগে ভাগ করে জাম্বেজির উত্তর ভাগের নাম দেন উত্তর রোডেশিয়া এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণাংশের নামকরণ করেন দক্ষিণ রোডেশিয়া। বৃটিশ রুল চলাকালীন উপরোক্ত দেশ দু’টি বিশ্বে উত্তর রোডেশিয়া এবং দক্ষিণ রোডেশিয়া নামেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে ডেভিড কেনেথ কাউন্ডার নেতৃত্বে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর উত্তর রোডেশিয়ার নাম সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত হয় জাম্বিয়া এবং ১৯৮০ সালে রবার্ট মোগাবের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ রোডেশিয়া পৃথিবীর মানচিত্রে জিম্বাবুয়ে নামে পরিচিতি লাভ করে।
আর ডেভিড লিভিং স্টোনই বৃটিশ সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার নামেই জলপ্রপাতটির নামকরণ করেন ‘ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত’। 

গর্জনকারী ধোঁয়া

No comments

Powered by Blogger.