বড় দেশের অহমিকা আর ছোট দেশের ইগো by মহিউদ্দিন আহমদ
ইরানে ৪৭ বছর ধরে চলে আসছে একধরনের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। এটি অনেকেরই পছন্দ নয়। শাসকদের ওপর জনগোষ্ঠীর কোনো কোনো অংশের ক্ষোভ বাড়ছে। মাঝেমধ্যে এর প্রতিফলন দেখা যায়। এর ওপর ভর করে বিদেশিরা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলানোর সুযোগ পায়। ইরানে এর দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে চায় শাসকবদল। এখানে প্রশ্ন উঠেছে নৈতিকতার। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ কি মেনে নেওয়া যায়?
এ ক্ষেত্রে দুই রকমের মত আছে। একটি মত হলো, একটি জনবিক্ষোভ বা বিদ্রোহ যদি ন্যায়সংগত হয়, তাহলে বাইরের কোনো শক্তি তার সাহায্যে এগিয়ে এলে বিক্ষুব্ধ জনশক্তি তাকে স্বাগত জানায়। অন্যদিকে বিরাজমান ব্যবস্থার প্রতিভূ যাঁরা, তাঁরা বাইরের হস্তক্ষেপকে অনভিপ্রেত মনে করেন। তাঁরা বলেন, এটা আগ্রাসন। দুই মতের পক্ষেই অনেক লোক পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা কিছু নিয়মনীতি মেনে চলার অঙ্গীকার করি। একটি নিয়ম হলো, এক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না। এর ওপর ভিত্তি করেই পঞ্চাশের দশকে গড়ে উঠেছিল জোটনিরপেক্ষতার পঞ্চশীলা নীতি। তখন বিশ্বে ছিল দুই পরাশক্তির শীতল লড়াইয়ের যুগ। সেটি এখন ইতিহাস। জোটনিরপেক্ষতার আবরণ খসে পড়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এখন অনেকগুলো সামরিক জোট। কেউ নিজের প্রভাববলয় বাড়াতে এবং কেউবা নিজেকে নিরাপদ রাখতে নানা রকমের সামরিক সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। তারপরও শেষ রক্ষা হয় না।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের কথায় আসি। একটি দেশের ভেতরে যা-ই ঘটুক না কেন, অন্য দেশ তাতে নাক গলাবে না—কাগজে-কলমে এটিই আন্তর্জাতিক রীতি। এ কারণে একটি দেশের শাসকগোষ্ঠী নিজ দেশের জনগণের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ পায়। এই নিয়ম তাকে আরও গণবিরোধী, আরও স্বৈরাচারী, আরও ঔদ্ধত্য করে তুলতে পারে। তখন ওই দেশের ভুক্তভোগী মানুষ পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় সাহায্য খোঁজেন, দেশে না হলে বিদেশে। এমন উদাহরণ আছে অনেক।
আমরা এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম ১৯৭১ সালে। আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। আমরা তার বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলাম প্রতিরোধ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা সাহায্য না করলে বাংলাদেশ হতো কিনা সন্দেহ। আমরা হয়তো আরেকটা বেলুচিস্তান হয়ে থাকতাম। একাত্তরে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে অসহায় বাঙালি ওই সময় তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। যাঁরা একাত্তর দেখেননি, তাঁরা ভাবতেও পারবেন না, কী তাণ্ডব বয়ে গিয়েছিল বাঙালির ওপর।
এই পটভূমিতে পাকিস্তানের শাসকেরা বরাবরই বলে এসেছে, ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে, এ দেশে বিদ্রোহ উসকে দিচ্ছে। বিদ্রোহীদের কপালে জুটেছে সন্ত্রাসী, দুষ্কৃতকারী আর ভারতীয় এজেন্টের তকমা। একপর্যায়ে ভারতের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মনে আছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উঠলে ভারত তাতে বাদ সাধে। ওই প্রস্তাবে ভারতের পক্ষে ভোট পড়েছিল ১৪টি আর পাকিস্তানের পক্ষে ১১১টি। পরে প্রস্তাবটি যায় নিরাপত্তা পরিষদে।
১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ভোট না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। অন্য সব দেশ ভোট দেয় যুদ্ধবিরতির পক্ষে। ব্যতিক্রম ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ভেটোর কারণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব লাটে ওঠে। এই পটভূমিতে পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। জন্ম হয় বাংলাদেশের। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য একটি দেশ হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে সবাই অটল থাকলে ওই সময় বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।
একাত্তরে ইরান তো নয়ই, একটি মুসলিম দেশও বাংলাদেশের পক্ষ দাঁড়ায়নি। ইরান প্রসঙ্গে এটি মনে পড়ে গেল। ওই সময় ভারত-সোভিয়েত অক্ষশক্তির সমালোচনা করে কেউ কেউ বলেছিলেন, ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব বড় ও শক্তিশালী দেশগুলোর মর্জির ওপর থেকে গেল।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানে শাসকবদল। ইরানের ‘ইসালামি বিপ্লবের’ আগে ছিল রেজা শাহ পাহলভির বংশানুক্রমিক রাজত্ব। তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ইরানের মানুষ ফুঁসে উঠেছিলেন। রেজা শাহর শাসন টিকে ছিলও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সহায়তায়। এমনকি চীনও তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল ইরানের গণবিদ্রোহের পক্ষে।
একসময় এই গণবিক্ষোভের সামনের কাতারে ছিল ইরানের বামপন্থীরা। কিন্তু প্রচণ্ড মার্কিনবিরোধী মনস্তত্ত্ব ইরানে উসকে দিয়েছিল ধর্মীয় পুনর্জাগরণের রাজনীতি, যা পশ্চিমের সবকিছু প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে ভাষা পেয়েছিল।
ইরানে গড়ে উঠেছে একটা কাঠামো, যেখানে প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনব্যবস্থা এবং ধর্মগুরুদের শীর্ষ ফোরামের মিশেলে একধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এটি চলে আসছে ৪৭ বছর ধরে। কেউ কেউ মনে করেন, প্রায় পাঁচ দশকের এই শাসনব্যবস্থা ও জীবনবিধির শিকড় অনেক গভীরে। শিগগিরই তা উপড়ে ফেলা যাবে না। আবার এটাও ঠিক যে ইরানের রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতা ও ঐতিহ্য। সেই তুলনায় ৪৭ বছর কিছুই না।
যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে ইরানের অনেক দূরে। ইরান থেকে ছোড়া গোলা বা মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত করতে পারবে না। সেই সক্ষমতা ইরানের নেই। তাই ইরান বেছে নিয়েছে আশপাশের দেশগুলোয় মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনার ওপর। ফলে ইরান বেশ কয়েকটি দেশে মিসাইল ছুড়েছে। এর অর্থ হলো, ইরান অনেকগুলো ফ্রন্ট খুলে ফেলেছে, যেটি সামাল দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ইরান এখন ‘উম্মাহ পলিটিকস’-এর দ্বারস্থ হয়েছে। দেশটি চায় মুসলিম বিশ্ব তার পক্ষে দাঁড়াক। দেখা যাচ্ছে, ইরানের প্রতিবেশী মুসলমান অনেক দেশ তার পক্ষে নেই। বরং ইরানের মিসাইল হামলার লক্ষ্য হওয়ায় তারা আরও বেশি করে ইরানের বিরুদ্ধে চলে গেছে। যেসব দেশ ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল, তারা বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার সামর্থ্য রাখে না।
চীন আর রাশিয়া ইরানের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে। চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই অস্ত্র রপ্তানিকারকদের তালিকার শীর্ষে। তাদের আছে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশল। তারা এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে জায়গা দিতে চায় না। এটি আরেক ধরনের রাজনীতি। রাশিয়া যে কাজটি করছে ইউক্রেনে, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেটিই করছে ইরানে। আর ইসরায়েলের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সখ্য তো বরাবরের মতোই অটুট আছে।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, ছোট দেশগুলো বড় দেশগুলোর কাছে নিরাপদ নয়। বড় দেশের অহমিকা আর ছোট দেশের ইগো অনেক
সময় গোঁয়ার্তুমির পর্যায়ে চলে যায়। ইরানে তার প্রতিফলন দেখছি।
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় ইরানের একটি স্কুলের শতাধিক শিশু প্রাণ হারায়। শেষকৃত্যে স্বজনদের শোক। রয়টার্স |

No comments