গাজীপুর নির্বাচনের তাৎপর্য by নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ

সত্যি কথা বলতে কী, গাজীপুরের নির্বাচনটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবারই প্রথম। এদিক থেকে গাজীপুরের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যেহেতু সামনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সর্বশেষ চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি
ভিন্ন ধরনের ফলাফল এসেছে, তাই এ নির্বাচন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে। এই নির্বাচনগুলো প্রকৃতপক্ষে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেল্যুড হিসেবে কাজ করছে। ঢাকার অদূরে গাজীপুরে ভোটারের সংখ্যাও অনেক। সেদিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দল এটি নিয়ে একেবারে আইবল টু আইবল হয়ে আছে। তবে এ নির্বাচনে বিরোধী দল সেনাবাহিনী মোতায়েনের যে দাবি জানিয়ে আসছে তার সঙ্গে আমি একমত নই। শুধু এই নির্বাচন কেন, যেকোনো নির্বাচন থেকে সেনাবাহিনীকে বিযুক্ত রাখতে হবে। সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে জাতিকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা। সেনাবাহিনীর কাজ অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা নয়। যার যার কাজ তাকে তাকে করতে দেওয়া উচিত। সেনাবাহিনীকে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন থেকে সরিয়ে রাখলে দেশের প্রচলিত প্রশাসনের নির্বাচনী দক্ষতা বাড়বে, তাদের কর্তব্যকাজ বিকশিত হবে, নিজেরা নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হলেও প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এটি কিছু ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এই দায়িত্ব তারা পালন করলে বেসামরিক প্রশাসনেরও নানা অসুবিধা দেখা দিতে পারে। সেনাবাহিনী নামিয়ে আনার প্রবণতা পাকিস্তানি ঐতিহ্যপ্রসূত। এটি পাকিস্তানের সময়েও দেখা গেছে, আবার এই ধারা পাকিস্তানে এখনো অব্যাহত রয়েছে। অথচ আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই, তারা কিন্তু এ ধরনের অ্যাডহক সলিউশনে যায়নি। যার ফলে তাদের গণতন্ত্র শক্তিশালী ও সুসংহত হতে পেরেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একই সঙ্গে স্বাধীনতা লাভ করেও ওই জায়গাটি তৈরি করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী ব্যবহার করলেই যে সব কিছুর সমাধান হয়ে যাবে- এমন নয়। আমরা এই নিরিখে যদি দেখি, ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনে সেনাবাহিনী দায়িত্বে ছিল। তখন সেই সময় দেখা গেছে অবলীলায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনেই এক কেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে আরেক কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিচ্ছে এবং সব ধরনের অনিয়মই চলেছে। অন্য কথায়, পেশাদারির একটি বিষয় আছে। সেনাবাহিনী পেশাগতভাবে এ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত নয়। তাদের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করাটা সংগিতপূর্ণ নয়।
হ্যাঁ, চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রভাব কিছুটা পড়বে- এটি বোধগম্য। এটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে মাত্র কয়েক দিন আগে। ফলে সেই নির্বাচনের একটি হাওয়া এসে লাগতেই পারে। দেখা যাচ্ছে, এটি স্থানীয় নির্বাচন হলেও একটি জাতীয় নির্বাচনের মতো রূপ পেয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল যেই হোক, কেউ স্থানীয় সরকারকে স্থানীয় রাখেনি। দল নির্বিশেষে বলা হয়ে থাকে স্থানীয় শাসন, স্থানীয় সরকার নয়। পবিত্র সংবিধানের সংশোধনীতেও স্থানীয় শাসন বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় শাসনকেও দল নির্বিশেষে এককেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে। সব কিছু কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে সরকারের মুঠোয়। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল না। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের ক্রীড়নক বানিয়ে ফেলার প্রবণতা দেশ ও দেশের গণতন্ত্রের জন্য মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। এই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। এটি বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে দেশের গণতন্ত্র বিকশিত হবে।
নির্বাচন কমিশন যতটা শক্তিশালী করা দরকার, অর্থাৎ যতটা শক্তিশালী হলে একটি নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে, ততটা শক্তি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের রয়েছে; যদিও আরো কিছু সংস্কার করলে ভালো হতো। কিন্তু এই নির্বাচন কমিশন দিয়েই তো চারটি সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হলো। তাহলে কেন আগ বাড়িয়ে সেনাবাহিনী ব্যবহারের চেষ্টা আমরা করতে যাব।
আর মাত্র অল্প সময় বাকি। নির্বাচন কমিশন কতটা সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করতে পারে তা দেশের জনগণ দেখতে পাবে।
(অনুলিখন)

লেখক : চেয়ারম্যান, জানিপপ

No comments

Powered by Blogger.