জামায়াতী ওয়েবসাইটে যুদ্ধাপরাধী বিচার বানচালে প্রচারণা- ৩০ বেতনভুক ব্লগার ফেসবুক, ব্লগে সর্বক্ষণ প্রচারণা চালাচ্ছেন by তৌহিদুর রহমান

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে ইন্টারনেটে প্রচারণা জোরদার করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে গ্রেফতারকৃত জামায়াত নেতাদের মুক্তির লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক ও ব্লগেও চালানো হচ্ছে ব্যাপক প্রচারণা।


জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে ‘ফ্রি জামায়াত লিডার্স’ নামে ওয়েবসাইটে প্রতিদিনই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের মামলা পরিচালনায় জামায়াতের পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে সেখানে। গ্রেফতারকৃত জামায়াত নেতাদের বিপক্ষে দেয়া সাক্ষীদের বক্তব্য খ-ন করা হচ্ছে এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। এ ছাড়া নতুন নতুন ওয়েবসাইটে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
জানা গেছে, জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির লক্ষ্যে প্রচারিত ‘ফ্রি জামায়াত লিডার্স’ ওয়েবসাইটের একটি বাংলা ভার্সনও চালু করা হয়েছে, যার নাম ‘জামায়াত নেতাদের মুক্তি আন্দোলন’। এই ওয়েবসাইটে জামায়াতের পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যের বিবরণী সংযুক্ত করা হচ্ছে। জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও আলী আহসান মুজাহিদ মুক্তি আন্দোলন নামে ফেসবুকেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
জামায়াতের মূল সংগঠনের নামে দুটি ওয়েবসাইট চালু রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নামেও রয়েছে আরেকটি ওয়েবসাইট। জামায়াতের ঢাকা মহানগর কমিটির জন্য পৃথক ওয়েবসাইট রয়েছে। এছাড়া ঢাকা মহানগর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খান ও জামায়াতের সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদের নামেও রয়েছে ওয়েবসাইট। অপরদিকে জামায়াতের অধীনে অনলাইন লাইব্রেরি নামেও একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এসব ওয়েবসাইটে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এসব ওয়েরসাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন নামে ফেসবুক ও ব্লগ খুলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জানা গেছে জামায়াতের বেতনভুক্ত প্রায় ত্রিশ ব্লগার ব্লগ ও ফেসবুকে জামায়াতের পক্ষে এসব প্রচারণা চালাচ্ছেন। অবশ্য এসব ব্লগারদের পাল্টা জবাব দিচ্ছেনও অনেকে।
সূত্রমতে, কয়েক বছর আগেও যোগাযোগের জন্য এমএসএন, ইয়াহূ মেসেঞ্জার, বিডিচ্যাট সাইট ইত্যাদি প্রচন্ড জনপ্রিয় ছিল। এরপর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ফেসবুক আর বাংলা ব্লগ। এই দুটি সামাজিক গণমাধ্যম সাইট এখন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালীরা সহজেই এসব ব্লগ পড়তে পারেন। সেন্সরহীনতা, পাঠকের ফিডব্যাকের দ্রুততা, সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণে ক্রমশ ব্লগের প্রভাবও বাড়ছে। তবে এখন রাজনৈতিকভাবে ব্লগকে প্রচারণার কাজে লাগাতে দলীয়ভাবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে জামায়াত-শিবির। অবশ্য ব্যঙ্গ করে ব্লগে জামায়াত-শিবিরের লোকজনদের ‘ছাগু’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, জামায়াত-শিবিরের লোকজনদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের কারণে দলের পক্ষ থেকে ভাড়া করা হয়েছে ব্লগারদের। জামায়াতের টাকায় পরিচালিত এই ব্লগারদের সংখ্যা এখন প্রায় ত্রিশ। যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে জামায়াতের পক্ষ থেকে এসব ব্লগারকে নিয়োগ করা হয়েছে। এসব ব্লগার সারাদেশ ও বিদেশে জামায়াতের পক্ষে যুদ্ধাপরাধ বিচার বাধাগ্রস্ত ও দলের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য কাজ করে চলেছেন।
জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত ‘ফ্রি জামায়াত লিডার্স’ ওয়েবসাইটে দলের গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিক্ষোভ সমাবেশে তুলে ধরা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াতের গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ-সমাবেশের ছবি ও সংবাদ যুক্ত করা হয়েছে এসব ওয়েবসাইটে। ‘সেভ বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন যুক্তরাজ্যে জামায়াতের পক্ষ হয়ে কাজ করছে। এই সংগঠনের চেয়্যারম্যান ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম যুক্তরাজ্যে কাজ করছেন। তিনি জামায়াত নেতাদের মুক্তির লক্ষ্যে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশন ঘেরাওয়ের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে নিজামী সাঈদী মুজাহিদের মুক্তির দাবিতে ভূমিকা রাখছেন। জামায়াতের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ইংরেজি, বাংলা ও আরবি ভাষায় যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
‘ফ্রি জামায়াত লিডার্স’ ওয়েবসাইটে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১২ মামলার বিষয়বস্ত তুলে ধরে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব মামলা অযৌক্তিক বলে দাবি করেছে জামায়াত। নিজামী-মুজাহিদের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানার ৩৪ (১২) ৭ নম্বর মামলার বিষয়ে ওয়েবসাইটে আল বদর আল শামস বাহিনীর সঙ্গে নিজামী, মুজাহিদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হয়েছে। এই বাহিনীর প্রধান তো দূরের কথা, সদস্যও তারা ছিলেন না বলে দাবি করা হয়েছে তাদের ওয়েবসাইটে। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পল্লবী থানার ৬০ (১) ০৮ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই মামলা হয়রানিমূলক। পল্টন থানার ৩৭ (২) ১০ নম্বর মামলার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীকে পুলিশ গ্রেফতারের পক্ষে যে খোড়া ও হাস্যকর যুক্তি দাঁড় করিয়েছে তা হলো, জামায়াত একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল দল। এ দলের কর্মীরা নেতাদের নির্দেশ ছাড়া কোন কাজ করে না, সুতরাং এ ঘটনাও তারা নেতাদের নির্দেশেও ঘটিয়েছে। এই যুক্তি মেনে নিলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাসের সকল দায়-দায়িত্ব শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের নিতে হবে’।
রমনা থানার ৫৫(৬)১০ নম্বর মামলার বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘এই মামলার এজাহার থেকে পরিষ্কার যে এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত শিবিরের কোন নেতা-কর্মীর দূরতম সম্পর্কও ছিল না। কর্তব্যরত পুলিশের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে মিছিলটি ছিল বিএনপির। তা সত্ত্বেও পরবর্তীতে জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে হুকুমের আসামি বানিয়ে এ মামলায় শোন এরেস্ট দেখানো হয়, যা আইনের শাসনের চরম বরখেলাপ’।
উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পরে বিচার বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিদেশী মিডিয়ায় সংবাদ প্রচারের জন্য বিপুল টাকা খরচ করে চলেছে দলটি। পাশাপাশি তারা এখন ইন্টারনেটকেও বেছে নিয়েছে। দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে বর্তমানে ইন্টারনেটেই চালানো হচ্ছে জোর প্রচারণা।

No comments

Powered by Blogger.