পদ্মা সেতু-কাশবন ফুলে ফুলে সাদা... by অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে মাওয়া-কাওড়াকান্দি পথে চলেছি বরিশাল। একটু আগেই প্রত্যুষে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে দেখেছি_ বিশ্বব্যাংক ফের পদ্মা সেতুর অর্থায়নে সম্মত হয়েছে। বিবিসির প্রত্যুষের খবরেও পেয়েছি এ সংবাদ।


সেতুর কাজ শুরু হওয়া নিয়ে গত কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা এর ফলে কেটে যাবে, এমন আশায় নতুন করে বুক বাঁধতেই পারি। কিন্তু ফের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাবে না তো?
আমার নিজের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। সাধারণত ঢাকা থেকে বরিশালে বাস কিংবা প্রাইভেটকারে মাওয়া বা আরিচা রুটে ৭ ঘণ্টার মতো সময় প্রয়োজন হয়। আরিচা হয়ে গেলে ফেরিতে সময় লাগে কম, কিন্তু পথের দূরত্ব বেশি। আর মাওয়া-কাওড়াকান্দি হয়ে গেলে ফেরিতে বেশি সময় বসে থাকতে হয়, কিন্তু পথের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার কম। পদ্মায় সেতু নির্মিত হলে এই শেষের পথেই ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়া যাবে এবং পথের দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে মাত্র ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটারের মতো। ভালো গাড়ি হলে ঘণ্টা দুয়েকেই এ পথ পাড়ি দেওয়া যায়, কী বলেন?
দ্রুতগামী ট্রেন চালু হলে এক ঘণ্টাতেই ঢাকা-বরিশাল, এমন স্বপ্নও কি দেখতে পারি না? কেউ কেউ আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ম্যাগনেটিক রেলপথ চালুর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। অনেক উন্নত দেশে এখন প্রতি ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলে। এত গতি না হোক, বাংলাদেশে ১০০ কিলোমিটার গতির ট্রেনের কথা ভাবতেই পারি। এটা কি স্বপ্ন হয়েই থাকবে?
মাওয়ায় পদ্মা নদী অতিক্রমের সময় ফেরির কেবিনে পরিচয় হয় পাট সচিব আশরাফুল মকবুলের সঙ্গে। তার নিজের বাড়ি খুলনা শহরে এবং স্ত্রীর পিত্রালয় গোপালগঞ্জে। পদ্মায় সড়ক-রেল সেতু চালু হলে তারা ছুটির দিনে সকালে 'বাড়ি' গিয়ে সন্ধ্যায় ঢাকা ফিরে আসতে পারবেন। আরেকজন বলছিলেন_ মতিঝিল বা গুলিস্তান কিংবা পলাশী থেকে ফ্লাইওভারে ১০-১২ মিনিটে যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা এবং সেখান থেকে মাওয়া পথে পদ্মা নদী ৬-৭ মিনিটে অতিক্রম করা_ এ যেন স্বপ্ন রাজ্য। এ অবস্থায় গোপালগঞ্জ বা বরিশালে থেকেই প্রতিদিন ঢাকায় আসা-যাওয়া ও অফিস করা সম্ভব হতে পারে। যারা বাসের মতো সাধারণ পরিবহনে যাবেন তাদের জন্যও এ পথ আর দুর্লঙ্ঘ থাকবে না। লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরাও। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের যা দূরত্ব, পদ্মা সেতুর রুটে মংলা বন্দরের দূরত্ব হবে তার তুলনায় কম। বেনাপোল বন্দর এখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার সঙ্গে সেখানকার যাতায়াতও সহজ হয়ে যাবে এ সেতু পথে।
আমরা কেন সময়মতো এসব সুবিধা বুঝলাম না, সেটা প্রশ্ন বটে।
তবে আরও প্রশ্ন আছে এবং সেটাও শঙ্কার।
শুক্রবার মিটফোর্ডের কাছে বুড়িগঙ্গা সেতু অতিক্রম করার পরপরই রাস্তার দুই পাশে চোখ জুড়ানো কাশফুল নজরে এলো। এখন শরৎ ঋতু। ধবধবে সাদা কাশফুল ফোটার সময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোট নদীতে বৈশাখে হাঁটু জল দেখেছিলেন। আর শরতে ফোটে নদীর এক তীরে কাশফুল। মাওয়ার পথের দুই ধারেই যে কাশফুল। মাত্র ৫-৭ বছর আগেও এ পথে চলার সময় বর্ষায় সড়কের দুই পাশে পানি থৈ থৈ করত। কিন্তু এখন বেশিরভাগ স্থানে পানি নেই। দূর-দূরান্ত থেকে বালি এনে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে জলাভূমি। দুই পাশে দেখা গেল শত শত ছোট সাইনবোর্ড, মাঝে মাঝে বড় সাইনবোর্ড_ এতে লেখা বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির নাম। দুই পাশের সব জমি কি তারা কিনে নিয়েছে? নাকি রাজধানী ঢাকার কাছে 'এতটুকু বাসা' করার জন্য নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার জন্য তারা 'জমির আইল ভাড়া নিয়ে' তাতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে? কেউ কি আছে এসব দেখার জন্য?
পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বরিশাল-ফরিদপুর-খুলনা-যশোর অঞ্চলের দৃশ্যপট বদলে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতকে এখন দূর-দূরান্তের পর্যটন কেন্দ্র মনে হয়। কিন্তু পদ্মা সেতুর পথ ধরে ঢাকা থেকে ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই সেখানে পেঁৗছে যেতে পারবেন আপনি। অথচ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সৈকতে যেতেই সময় প্রয়োজন পড়ে ৬ ঘণ্টা! যারা এতদিন দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়টি চিন্তাও করতেন না, তারা সেতুটি নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় নড়েচড়ে বসবেন, তাতে সন্দেহ নেই। এর অর্থ হচ্ছে বরিশাল-মাদারীপুর-গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলের জমির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়া। এ চাপ কতটা ভয়াবহ হবে সেটা টের পাওয়া যাবে সেতুর পিলার তৈরি এবং নদী শাসনের কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে। ফেরিতে প্রমত্ত পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় সহযাত্রীদের একজন বলছিলেন, সেতুর এক একটি পিলার মাথা তুলে দাঁড়াবে, আর সেতু-পথের জমির দাম জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে। সেতুটি নির্মাণ কাজ শেষ করে গাড়ি চলাচলের জন্য যখন খুলে দেওয়া হবে, তখন আশপাশের জমির মালিকানা কয়েক হাত বদল হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কৃষকরা তখন কোথায় যাবেন? শিল্প-কারখানা হলে চাকরির সুযোগ বাড়বে। কিন্তু ভাতের জোগান আসবে কীভাবে? মাছও মিলবে তো? আমাদের নীতিনির্ধারকরা কি এসব বিষয় নিয়ে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা করছেন? এজন্য পরিকল্পনা নেওয়া দরকার এখন থেকেই। নাকি সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আমলে নিতে চাওয়া হয়নি, তেমনি এসব বিষয়ও উপেক্ষিত থাকছে? সেতুটা কোনো দলের নয়। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর অধিবাসীরা এ থেকে যাতায়াত সুবিধা বেশি পাবেন। কিন্তু সার্বিকভাবে লাভবান হবে গোটা বাংলাদেশ।
বরিশাল থেকে একই দিনে ঢাকা ফিরেছি লঞ্চে। রাত ৯টায় ছেড়ে সকাল ৬টার দিকে ঢাকা পেঁৗছানো গেল। এখন বেশ বড় বড় লঞ্চ চলে এ পথে। কেবিন আরামদায়ক_ ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৮০০ টাকা। ডেকের ভাড়া বাসের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু পদ্মায় সেতু চালু হলে একটি প্রশ্ন আসবেই_ সময় মূল্যবান, নাকি টাকার অঙ্কটা গুরুত্ব পাবে। আপনি বাসে নতুন সেতু-পথে বরিশাল থেকে তিন ঘণ্টায় ঢাকা আসবেন, কিন্তু ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, নৌপথে লঞ্চে রাতের বেলায় ডেকে ঘুমিয়ে চলে আসবেন ২০০ টাকায়। কিন্তু সময় ৯-১০ ঘণ্টা। কোনটি বেছে নেবেন? রেলপথ সেতুতে যুক্ত হলে ভাড়া আরও কম। তখন কী করবেন? বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা-ভোলা-ঝালকাঠি-পিরোজপুরের সবাই কি লঞ্চে-স্টিমারে যাতায়াত বন্ধ করে দেবেন? নৌযানের চলাচল নির্বিঘ্ন করার প্রয়োজনে এখন মাঝেমধ্যে নদ-নদী ড্রেজিং করা হয়। কিন্তু লঞ্চ চলাচল কমে গেলে কিংবা কোথাও কোথাও একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে ড্রেজিং করা হবে তো? এটা করা না হলে অনেক নদী মরে যাবে। এটা তো জানা কথা, বাংলাদেশে কেবল লঞ্চ-নৌকা চলাচলের জন্যই নদীর প্রয়োজন হয় না, এটা হচ্ছে আমাদের লাইফলাইন। শত শত নদ-নদী আমাদের খাবারের পানি দেয়, মাছের জোগান দেয়, ফসলের জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করে। সর্বোপরি রক্ষা হয় পরিবেশের ভারসাম্য। আমরা যদি এসব সম্পদের উৎস রক্ষা করতে না পারি তাহলে দুই তীরের কাশফুলই ফুটবে কীভাবে?

অজয় দাশগুপ্ত : সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.