বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৪৫৫ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন।আবদুল লতিফ, বীর প্রতীক বীর যোদ্ধা সাহসী যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। প্রায় দেড় মাস ধরে যুদ্ধ-উন্মাদনার মধ্যে আছেন আবদুল লতিফ (মজুমদার) ও তাঁর সহযোদ্ধারা।


অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে বৃহত্তর সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক যুদ্ধ করেছেন। ধলই, পাত্রখোলা, চারগ্রাম ও কানাইঘাট। পরিশ্রান্ত তাঁরা। তবে যুদ্ধ করার আগ্রহে ভাটা পড়েনি, বরং আরও বেড়েছে। কারণ, পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে।
কানাইঘাট থেকে তাঁরা রওনা হলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিলেট শহরের প্রতিরক্ষা অবস্থান অভিমুখে। পথিমধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হলেন তাঁরা। ছোটখাটো যুদ্ধের পর ১৪ ডিসেম্বর শেষ রাতে সেখানে পৌঁছালেন। একটু পর সকাল হলো। শীতকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানি সেনাদের। ঘোরাঘুরি করছে। আবদুল লতিফরা আক্রমণ চালালেন।
১৯৭১ সালের ১৫-১৭ ডিসেম্বর সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের বর্ণনা আছে আবদুল লতিফের দলনেতা (কোম্পানি কমান্ডার) লে. এম এ কাইয়ুম চৌধুরীর (পরে মেজর) ১৯৭৩ সালের বয়ানে। তিনি বলেন:
‘আমরা শত্রুঘাঁটির মধ্য দিয়ে অ্যাডভান্স টু কন্টাক্ট শুরু করি। কানাইঘাট থেকে বিকেলে সিলেট অভিমুখে যাত্রা শুরু করে পরদিন বিকেল পাঁচটার সময় আমরা কেওয়াচরা চা-বাগানে ডিফেন্স নিই। আমরা জানতাম, সিলেট শহরের উপকণ্ঠে এমসি কলেজে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিরাট একটা দুর্গে পরিণত করেছে। রাতের বেলা পেট্রোল দল পাঠানো হয়েছিল শত্রুর গতিবিধি ও খোঁজখবর নেওয়ার জন্য।
‘সকালবেলা আমি আমার কোম্পানি নিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলাম। কিন্তু শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কতক্ষণ ডিফেন্সে থাকি। সেদিন সেখানে অবস্থান করার পর সন্ধ্যায় আমরা এমসি কলেজ অভিমুখে যাত্রা করি। পরদিন ভোর চারটার সময় এমসি কলেজের টিলার ওপর এসে আমরা শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করছিলাম। শত্রু কিন্তু আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে একটুও সজাগ ছিল না। তারা ডিফেন্সের মধ্যে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছিল।
‘যথেষ্ট পাঞ্জাবি সেনা একসঙ্গে দেখে নিজেকে আর দাবিয়ে রাখতে পারলাম না। পজিশন না নিয়েই ছয়টা মেশিনগান দিয়ে তিন দিক থেকে ফায়ার শুরু করলাম। শত্রুর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। ১৭ ডিসেম্বর বেলা ১১টা পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধ চলে। তার পরই আসে আত্মসমর্পণের পালা। পাকিস্তানি সেনারা তাদের সমস্ত হাতিয়ার আমাদের কাছে সমর্পণ করে।’
আবদুল লতিফ চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল যশোর সেনানিবাসে। তখন তাঁর পদবি ছিল নায়েব সুবেদার। ৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্ট তাদের আক্রমণ করে। এ সময় তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে প্রথমে ১১ নম্বর সেক্টরে, পরে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষত সিলেট এমসি কলেজের যুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য আবদুল লতিফ মজুমদারকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৬৪। তাঁর প্রকৃত নাম আবদুল লতিফ মজুমদার।
আবদুল লতিফ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি মুখে তেমন কথা বলতে পারেন না। প্রায় বাকরুদ্ধ। শরীরে এক দিক অবশ হয়ে গেছে। এখন বিনা চিকিৎসায় পৈতৃক বাড়িতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা ইউনিয়নের জিরাইল গ্রামে। বাবার নাম তোলফে আলী মজুমদার, মা সখিনা বেগম। স্ত্রী নূরজাহান বেগম। তাঁদের এক ছ
েলে ও তিন মেয়ে।
সূত্র: প্রথম আলোর বরিশালের নিজস্ব প্রতিনিধি সাইফুর রহমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.