একটি দলিলে কয়টি হলফনামার প্রয়োজন by সোহেল রানা

বিক্রয়, দান বা বিনিময়, যার মাধ্যমে কোনো স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা চিরতরে হস্তান্তরিত হয়ে যায়, সেগুলো তো বটেই; বন্ধক, ইজারা প্রভৃতি যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি মালিকানা নয়, বরং সাময়িক সময়ের জন্য দখল হস্তান্তরিত হয় মাত্র, সেগুলোও বর্তমানে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়।


আগে ১০০ টাকার কম মূল্যের জমি বিক্রয় বা যেকোনো মূল্যের জমি হেবা (মুসলিম আইনের বিধানমতে দান) বিনা দলিলে করা গেলেও গত ০১-০৭-০৫ তারিখ থেকে সে সুযোগও আর নেই। ফলে সুসম্পন্ন হওয়া কোনো একটি হস্তান্তর যেসব কারণে বাতিল বা অকার্যকর হিসেবে পরিণত হতে পারে তার মধ্যে সর্বাগ্রেই রয়েছে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের অনুপস্থিতি। আবার সম্পন্নকারী দলিলের কতিপয় ত্রুটির কারণেও সমুদয় হস্তান্তরটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে, যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে হস্তান্তর সম্পন্নকারী দলিলটিতে দাতার হলফনামা না থাকা। ক্রেতা সাবধান (ক্যাভিয়েট এম্পটর), অর্থাৎ কোনো সম্পত্তির ক্রেতাই নিজ উদ্যোগে আগেভাগেই ক্রয়তব্য সম্পত্তিতে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নেওয়ার যে আইনি নীতি রয়েছে, তা আমাদের দেশে প্রযোজ্য নয়। এখানে বিক্রয়তব্য সম্পত্তির ত্রুটিগুলো আগেভাগে প্রকাশের দায়িত্ব বিক্রেতা অর্থাৎ যিনি ওই সম্পত্তির মালিক বলে নিজেকে দাবি করছেন তার ওপর। বিক্রেতা যাতে ওই দায়িত্ব পালন করেন তা নিশ্চিত করার জন্যই হস্তান্তর-দলিলে তার হলফনামা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বর্তমানে একাধিক আইনে হস্তান্তর-দলিলে হলফনামা থাকার বিধান বাধ্যতামূলক করায় এবং হলফনামার বক্তব্য কী হবে, তাও অভিন্ন না হওয়ায় একটি হস্তান্তর-দলিলে প্রকৃতপক্ষে কয়টি হলফনামার প্রয়োজন, সে বিষয়ে মতদ্বৈততা বিরাজ করছে। ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে বিক্রয়তব্য সম্পত্তিতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা প্রকাশের দায়িত্ব বিক্রেতাকে দেওয়া হলেও এত দিন সেটিতে আলাদা করে হলফনামা থাকার বিধান ছিল না; কার্যকর হওয়া সংশোধনীর (৫৩ই ধারা সংযোজন) ফলে ২০০৫ সাল থেকে বিক্রয়, দান, হেবা বা বন্ধকি দলিলে দাতা কর্তৃক তার আইনসম্মত মালিকানার সপক্ষে হলফনামা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে হলফনামা না দেওয়ার ফলাফল বা পরিণতি কী হবে, তা অবশ্য বলা নেই। অন্যদিকে ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ ট্রান্সফার অব ইমমোভেবল প্রোপার্টি (টেম্পোরারি প্রভিশনস) অর্ডার’-এ স্থাবর সম্পত্তির যেকোনো হস্তান্তর-দলিলে দাতার হলফনামা থাকা বাধ্যতামূলক তো করা হয়েছেই, সেটি না করার পরিণতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট জমিটি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকৃত হিসেবে গণ্য হবে মর্মেও বিধান রয়েছে। এ আইনটিতে আইন ও তথ্যগত মোট ছয়টি বিষয়ে দাতাকে হলফ করার কথা বলে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মালিকানার (ট্রান্সফারেবল রাইট) বিষয়টিও রয়েছে। তাই ২০০৫ সালে এসে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে হলফনামা থাকার বিধান যুক্ত করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তা করাতে বরং জটিলতা সৃৃষ্টি হয়েছে, কারণ ১৮৮২ সালের আইন অনুযায়ী প্রদেয় হলফনামা কি ১৯৭২ সালের আইন অনুযায়ী প্রদেয় হলফনামার অতিরিক্ত হতে হবে, নাকি একটিতেই চলবে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
এত দিন সনাতনি ভাষায় হস্তান্তর-দলিল লিখিত ও সম্পাদিত হয়ে এলেও রেজিস্ট্রেশন আইনে সংশোধনী (২২এ ধারা) আনয়নের মাধ্যমে ০১-০৯-২০০৫ তারিখ থেকে হস্তান্তর-দলিল একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে লিখিত ও সম্পাদিত হয়ে আসা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার হস্তান্তর-দলিলের যে ফরম্যাট নির্ধারণ করেছে, তার ২৭ নম্বর ভুক্তিতে দাতার হলফনামার বিধান এবং কী কী বিষয়ের ঘোষণা থাকবে, তা বলে দেওয়া হয়েছে এবং হলফনামায় সেসব বিষয়ের ঘোষণা থাকার কথা ওই আইনদ্বয়ে রয়েছে, তার সবগুলো এখানে আছে। ফলে সংগত কারণে একই দলিলে দাতাকে কয়বার হলফ করতে হবে, সে বিষয়ে মতদ্বৈততা সৃষ্টি হচ্ছে। ১৯৭২ সালের আইনটি ওভাররাইটিং ইফেক্ট সম্পন্ন (অন্য কোথাও ব্যতিক্রমী কোনো বিধান থাকলেও এ আইনের বিধান কার্যকর বা প্রতিপালিত হবে) হওয়ায় তখন থেকে তো বটেই, বর্তমানে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে হস্তান্তর-দলিল সম্পাদিত হওয়ার যুগেও ওই আইনে বর্ণিত বিষয়গুলোর ওপর দাতার ঘোষণাসম্পন্ন হলফনামা আলাদা করে (অতিরিক্ত স্ট্যাম্পে) যুক্ত করতে হচ্ছে। এটা না করার কোনো সুযোগ যেহেতু আইনত নেই, সেহেতু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্টকৃত ফরম্যাটেও আবার হলফনামার বিধান করা কেন? যুক্তির বিচারে ১৯৭২ সালের আইনের অধীনে প্রদত্ত হলফনামাই প্রত্যাশা পূরণ করে বিধায় ১৮৮২ সালের আইনের অধীনে অতিরিক্ত কোনো হলফনামা হয়তো দেওয়ার প্রয়োজন বা সুযোগ নেই; কিন্তু সেটি দিয়ে নির্দিষ্ট ফরম্যাটের চাহিদা অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ আছে কি? নির্দিষ্টকৃত ফরম্যাটেও হলফনামার যে বিধান রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয়, অথচ সমস্যা সৃষ্টিকারী বিধায় সার্বিক বিবেচনায় তা আশু বাদ দেওয়াই কার্যকর সমাধান বলে প্রতীয়মান হয়।
লেখক  সিনিয়র সহকারী জজ, গাইবান্ধা

No comments

Powered by Blogger.