জলিলের আত্মজীবনী-'ট্রাম্পকার্ড' ও এক-এগারো প্রাধান্য পাবে by পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য

রাতভর নির্যাতন এবং স্ত্রী-সন্তানকে গ্রেপ্তার করার হুমকির মুখে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জলিল ২০০৭ সালের ২ জুলাই বন্দি অবস্থায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সই করেছিলেন। আবদুল জলিল তখন ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।


ওই চিঠিতে তিনি প্রয়োজনে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে তাঁর দাবি, চিঠিতে যা লেখা ছিল তা না পড়েই চাপের মুখে সই করেছিলেন তিনি। আর গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ওই চিঠি বিলি করা হয়েছিল। এসব তথ্য ও ঘটনা নিয়ে আত্মজীবনী লিখছেন আবদুল জলিল। জানা গেছে, এ বইয়ে 'ট্রাম্প কার্ড' প্রসঙ্গেও খোলাসা করে বলবেন তিনি। ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে 'ট্রাম্প কার্ড' ছাড়ার অর্থাৎ তখনকার সরকার ফেলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জলিল।
জানা গেছে, আবদুল জলিলের বইয়ে এক-এগারো পরবর্তী পরিস্থিতির বিশদ বর্ণনা থাকবে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলা উপলক্ষে এই আত্মজীবনী প্রকাশ করা হবে। তবে বইয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে ৩০ এপ্রিলের ডেডলাইন প্রসঙ্গ। কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ডেডলাইন দিয়েছিলেন আর কেন ডেডলাইন সফল হয়নি- এসবের বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। এ ছাড়া বইয়ে জলিলের রাজনীতিতে যোগদান, রাজনৈতিক জীবন, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেষ মুহূর্তে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে বঞ্চনা এবং জরুরি অবস্থার সময় নির্যাতনের বর্ণনা থাকবে। কারান্তরীণ অবস্থায় সারা রাত তাঁকে ঘুমাতে না দিয়ে কিভাবে নির্যাতন করা হয়েছে সেসব বর্ণনাও প্রকাশ করবেন তিনি।
আত্মজীবনী লেখার কথা স্বীকার করে আবদুল জলিল কালের কণ্ঠকে জানান, বইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকবে 'ডেডলাইন' নিয়ে তাঁর অবস্থানের ব্যাখ্যা। বইটি আগামী বইমেলায় প্রকাশ হবে বলেও জানান তিনি।
বইয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেষ সময় তাঁকে দলের কার্যক্রমে অংশ না নিতে দেওয়াকে অসাংবিধানিক বলে ব্যাখ্যা করছেন এই প্রবীণ নেতা।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালের ২৪ মার্চ জলিল ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারকে ফেলে দেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, '৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই করা হবে। ট্রাম্প কার্ড ইজ ইন মাই ওন হ্যান্ড।' পরে ২৬ এপ্রিল পুনরায় সময়মতো ট্রাম্প কার্ড ছাড়া হবে এবং ৩০ এপ্রিল বিজয়োল্লাস হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন আবদুল জলিল।
এ ছাড়া এক-এগারোর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের অনেক প্রবীণ নেতা যখন শেখ হাসিনাকে 'মাইনাস' করে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তখন আবদুল জলিল শেখ হাসিনার পক্ষে প্রায় দিনই বিবৃতি দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়। কিন্তু পরে তিনি দলের মূলধারায় আসতে পারেননি। আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক তাঁর ভূমিকা কী ছিল, কোন পরিস্থিতিতে তিনি চিঠির মাধ্যমে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং জেলে তাঁর ওপর কী ধরনের নির্যাতন করা হয়েছিল সেসবের বিস্তারিত বর্ণনা দেবেন আত্মজীবনীতে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর ২৮ মে জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালের ২ মার্চ শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান তিনি। ছয় মাস পর ৩১ আগস্ট দেশে ফেরেন। এরপর অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় ২০ অক্টোবর হাইকোর্ট জলিলকে জামিন দেন।
জামিন পাওয়ার পর আদালত চত্বরে বসেই জলিল সাধারণ সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালনের ঘোষণা দিলে এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ গ্রেপ্তার অবস্থায় নিজের সই করা একটি চিঠিতে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জলিল। তখন দলে গণতন্ত্র নেই বলে অভিযোগ করে এর জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকেও দায়ী করেছিলেন তিনি।
পরে দলের কাউন্সিলে তাঁকে সম্পৃক্ত না করার ক্ষোভ থেকে ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলের তিন দিন আগে পদত্যাগ করেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.