ময়নার যদি কিছু হয়ে যায় দায় নেবে কে? by কাজী জামশেদ নাজিম

সময় সকাল ঠিক ১০টা বেজে সাত মিনিট। মিরপুর-১ প্রিন্সবাজার শপিংমলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আসতে হবে রমনা থানার এলাকার মিন্টু রোডের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে। সেখানে সংবাদ সম্মেলনের নিউজ সংগ্রহ করতে হবে।

কিন্তু যাবো কীভাবে? কোথাও একটি যাত্রাবাহী গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। আজ কোনো হরতাল নয়, নেই কেনো কারফিউ, কিংবা বাস পরিবহন মালিক বা শ্রমিকদের কোনো ধর্মঘট। তবে কেন এ দুর্ভোগ? আর এতো গাড়ি কোথায় গেল?

সংবাদ সম্মেললে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে। সময় ফুরিয়ে আসছে। ডিএমপি পাঠানো মেসেজে সংবাদ সম্মেলনের সময় দেয়া হয়েছে বেলা ১১টা। ইতিমধ্যে সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। এ সময়ের মধ্যে গাড়ি বা সিএনজির কোনো দেখা পেলাম না। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দার এক সহকারী পুলিশ কমিশনারের (এসি) ফোন। তিনি জানালে, দুজন মহিলা প্রতারক আটক করেছেন। মহিলা দু’জন ম্যারেজ মিডিয়াতে কথিত প্রবাসীর অভিনয় করেন। ভাবলাম এ নিয়ে একটি ভালো রিপোর্ট লেখা যাবে। গত তিনদিন ছুটিতে ছিলাম। সম্পাদক আমার ওপর একটু মনোক্ষুণ্ণ। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটাই উপায় ভালো একটি রিপোর্ট। আমার ধারণা, যেকোনো সম্পাদকের কাছে একজন রিপোর্টারের অপরাধ মার্জনার প্রধান মাধ্যম ভালো একটা রিপোর্ট।

মিরপুর এলাকাতে বসবাস করে আসছি প্রায় পাঁচ বছর। কখনো এমন পরিবহণশূন্য নগরী আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। হাজার হাজার মানুষ পরিবহনের প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। হঠাৎ মতিঝিল মিরপুরগামী ‘বাহন’ কোম্পানির একটি বাস এসে মিরপুর ও ভারব্রিজের নিচে দাঁড়ালো। হুমড়ি খেয়ে সবাই গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে। যাত্রীরা রীতিমতো বাহুযুদ্ধ শুরু করলেন। নারীরাও পিছিয়ে নেই। তারা বাসটির সিট দখলে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন। কে কার পায়ের নিচে পড়ছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। লক্ষ্য একটাই, কে আগে উঠতে পারে। চিত্রটি দেখতে দেখতে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। এসেই শুনলাম গাড়িটি মতিঝিল নয়, যাবে টেকনিক্যাল পর্যন্ত। কথাটা শুনে ভাবলাম, হায়রে আমার দেশ, হায়রে জনগণ। না জেনেশুনেই কিনা কষ্ট করে গাড়িতে উঠলো, আবার মন খারাপ করে নেমে যাচ্ছে।

নিরুপায় হয়ে আমি রিকশাচালকদের কাছে গেলাম। কিন্তু শাহবাগ বা মিন্টুরোডে কেউ যেতে চায় না। প্রায় ১০-১২টি রিকশাচালকের মুখে না শব্দ শোনার পরে একজনের সম্মতি পেলাম। কিন্তু মিন্টু রোডে যেতে হলে তাকে ভাড়া দিতে হবে আড়াইশ টাকা। সাধ থাকলেও এ টাকা পরিশোধ করে রিকশায় যাওয়ার সাধ্য আমার নেই। শূন্য পকেট আর গরমে বেশ খারাপ লাগছিল। অবশেষে ১২০ টাকায় এক যুবক রিকশাচালককে নিয়ে শাহবাগের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম।

বাঙলা কলেজের সামনে আসতেই অবাক। মিরপুর এক নম্বর একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে জনগণের জ্যাম সব সময় লেগে থাকে। কিন্তু মিরপুর এক নম্বর থেকে বাঙলা কলেজ হয়ে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ। রাজপথে যেন জনতার মৌন মিছিল হচ্ছে। ফুটপাত ধরে সব শ্রেণীর মানুষ হাঁটছে। রিকশাচালক নিজের গতিতে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে। শ্যামলী হয়ে গণভবন ও আসাদগেট হয়ে সংসদ ভবন এলাকা রিকশায় যাচ্ছি। পুরো রাস্তায় দুটি বিষয় চোখে পড়ার মতো। এক, নারী-পুরুষ নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পায়ে হাঁটছেন। দুই. রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। কিন্তু কেউ জানেন না, কেন আজ পরিবহন বন্ধ? কোটি মানুষ বসবাসকারী এ নগরীতে কার কথামতো পরিবহন বন্ধ করে রাখা হলো, তাও কেউ জানেন না। এমনকি জনগণকে কোনো এ দুর্ভোগ পোহাতে হলে- এ জন্য পরিবহল মালিক বা কোনো চালককে জবাবদিহিতা করতে হবে না।

জাতীয় সংসদ ভবন পিচে রেখে খামারবাড়ীর পৌঁছাতেই রিকশাটি থামিয়ে দিলেন এক আনসার সদস্য। সামনের দিকে যাওয়া যাবে না। পুরো রাস্তা ফাঁকা। কোনো গাড়ি নেই, তারপরও রিকশাটি যেতে দেয়া হলো না। কিন্তু কেন জানতে চাইলে- আনসার সদস্য বললেন, আমি জবাব দিতে বাধ্য নই। যাওয়া যাবে না, তাই যাবেন না। আনসার সদস্য ফুসকে ওঠার আগেই রিকশাচালক রিকশা নিয়ে পালিয়ে গেল।

ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সাড়ে ১২টায় পৌঁছালাম। রিপোর্টাররা সংবাদ সম্মেলন শেষ করে অফিসের দিকে রওয়ানা হচ্ছেন। মহিলা দুজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ডিবি অফিসের ভেতরে। তাদের দেখা হলো না। আরো তথ্য নেয়ার আর সুযোগও পেলাম না। ব্যর্থ হয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আশ্রয় নিলাম। ডিআরইউ’র বাগান রিপোর্টারদের নিরাপদে নিঃশ্বাস গ্রহণের একটি বিশেষ স্থান। সিনিয়র সাংবাদিক মান্নান মারুফের রোপণ করা গাছের ছায়ায় বসে সোলায়মানের তৈরি চা পান করতে করতে সাংবাদিকদের আড্ডা বেশ জমে উঠছিল। আড্ডার আলোচ্য বিষয় ছিল পরিবহণশূন্যতা ও নগরবাসীর দুর্ভোগ। কোনো কোনো সাংবাদিক বলে উঠছেন, এক দলের সমাবেশ আর অন্য দলের হরতালে ঢাকা অচল। সরকারি দলের সমর্থক ও এসব কর্মপরিকল্পনাকারীদের রীতিমতো আলোচনায় তুলোধুনো করা হলো।

বিবিসি রিপোর্টার সাইদুল ইসলাম তালাতের সঙ্গে কথা বলতে না বলতেই মায়ের ফোন এলো। মায়ের কথা শুনে বেশ কষ্ট পেলাম। আমার ছোট্ট বোন জহুরা আক্তার ময়না শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকায় এনে চিকিৎসা করাতে বলছেন। বাবা ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হচ্ছেন। বাসে ভালো দুটি সিটের জন্য আমাদের বাড়ির পাশের প্রধান সড়কের বাসস্ট্যান্ডে (টেকেরহাট) এক কাউন্টারে যোগাযোগ করে একবারে হতাশ হলাম। কোনো গাড়ি ঢাকা আসছে না। এরই মধ্যে মোবাইলে ইউএনবি’র সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার জাহাঙ্গীর আলমের ফোন। তিনি মিরপুরের বাসা থেকে অফিসে যাবেন, কিন্তু রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। এর জন্য তিনি আমাকে তথা গোপালগঞ্জবাসীকে বকাবকি করলেন। তিনি মনে করছেন, সরকার সমর্থকরা পরিকল্পিতভাবে আজ জনগণকে এ দুর্ভোগে ফেলেছে। তার কষ্টের বর্ণনার ইতি টানতেই আরেক সিনিয়র রিপোর্টার ওমর ফারুক সামনে হাজির হলেন। পুরো শরীর ঘামে ভেজা। রাগে ফুঁসে উঠছেন। পোস্তগোলা থেকে গুলিস্তান আসতে তাকে দুইশ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হয়েছে। গুলিস্তান থেকে সেগুনবাগিচা আসতে হয়েছে হেঁটে। তার কষ্টে উপার্জিত এ টাকা খরচের জন্য দায়ী কে? তার প্রশ্ন, জনগণ আর কতোদিন কষ্ট করবে? আজ দেশের এ অবস্থা কেন? এর সমাধান কি?

ছোট বোনকে যেকোনোভাবে একটি অ্যাম্বুলেন্সে আনা যায় কিনা সে জন্য বিভিন্ন স্থানে ফোন করছি। কিন্তু মাওয়া ঘাটে ফোন করে জানতে পারলাম, লঞ্চ, স্পিডবোর্ড, ফেরি কিছুই চলাচল করছে না। কেন চলছে না- সে প্রশ্নর উত্তরও কেউ দেয়নি। এদিকে ছোট বোন ব্যথায় চিৎকার করছে।

অজানা ভাবনা নিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়ালাম। পল্টনস্থ সমাবেশে যোগ দিতে আমার পাশ দিয়ে বিএনপির একটি মিছিল যাচ্ছে। নিজের অজান্তে নিজের সামনে কিছু প্রশ্ন ভেসে উঠলো- আজ বিএনপির সমাবেশ, তাই কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় ঢাকার সঙ্গে জেলা শহরগুলোর যোগাযোগ বন্ধ। জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেন সমাবেশে যোগ না দিতে পারেন। ধারাবাহিক ক্ষমতার পালাবদলে দুটি প্রধান দলই রাজনীতি করে আসছে। যেকোনো একটি দলই ক্ষমতায় আসবে। একজন সরকার প্রধান হলে, অন্যজন নিশ্চিত প্রধান বিরোধী দলের নেতা হবেন। কিন্তু আমার ছোট বোন ময়না রাজনৈতিক কোনো সুবিধা পায় না। সরকারি বা বিরোধী দলীয় কোনো সুবিধা পাবে না। ও স্বাধীন দেশের সচেতন নাগরিক। ওর অপরাধ কি? চিকিৎসার অভাবে ওর যদি কিছু হয়ে যায় তার দায় নেবে কে?

কাজী জামশেদ নাজিম: সাংবাদিক
kjn_nazim@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.