বিচারককে মারধরের ঘটনায় আট পুলিশকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ

নরসিংদী জেলা আদালতের বিচারক মো. ইমান আলী শেখকে মারধর করার মামলায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ মণ্ডলসহ আট পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তে বিচারককে মারধর করার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার এই গ্রেপ্তারি


পরোয়ানা জারি করেন জেলার মুখ্য বিচারিক হাকিম নিতাই চন্দ্র সাহা। এর আগে দুপুরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কমিটির প্রধান জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম শিহাবুল ইসলাম।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া অন্য পুলিশ সদস্যরা হলেন নায়েক আব্দুস সালাম, কনস্টেবল কলিম উদ্দিন,
মোখলেছুর রহমান, মাহবুবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম ও সঞ্জয় কুমার। পরোয়ানাভুক্ত আট পুলিশকে আগামী ২৭ জুনের মধ্যে আদালতে হাজির করার জন্য নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুন নরসিংদী জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকে পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ-২ মো. ইমান আলী শেখ। এ ঘটনায় জেলা নাজির মো. রাকিবুল হাসান বাদী হয়ে বিচার বিভাগীয় হাকিমের আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল, নায়েক আব্দুস সালাম, রুহুল আমিন ও কনস্টেবল কলিমুল্লাহসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো সাত-আটজন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাকিম ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।
জেলা পুলিশ প্রশাসন ওই ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং পাঁচ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোয়েন্দা) মো. মোখলেছুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করে। পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি আরো তিন দিন এবং পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত কমিটি দুই দিন সময় বাড়ায়। গত সোমবার পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত কমিটি জেলা পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।
বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কমিটির প্রধান শিহাবুল ইসলাম ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৯ জন ফরিয়াদি পক্ষের, একজন প্রত্যক্ষদর্শী, সহকারী পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল) আলমগীর হোসেন ও আদালতের পরিদর্শক আবদুল কাইয়ুম রয়েছেন। কমিটি সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে জানতে পারে, ১০ জুন সকাল ৯টার দিকে বিচারক ইমান আলী শেখ রিকশা নিয়ে জজ আদালত ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মূল গেটে আসামাত্র পুলিশ সদস্য সুধীর সামন্ত তাঁর গতিরোধ করেন। তখন বিচারক তাঁকে নিজের পরিচয় দেন। সুধীর বলেন, 'স্যার, আজকে লোকমান হত্যা মামলার তারিখ। আপনি রিকশা থেকে নেমে হেঁটে যান।' বিচারক তখন হেঁটে পূর্ব পাশের পকেট গেট দিয়ে ভেতরে যাওয়ার সময় নায়েক রুহুল আমিন গেটে থাকা পুলিশ সদস্যদের তাঁর ব্যাগ তল্লাশির হুকুম দেন। কনস্টেবল কলিম উদ্দিন বিচারকের হাতে থাকা ব্যাগ টেনে ধরে সেটি চেক করতে চান। তখন বিচারক আবারও তাঁর পরিচয় দেন। তখন কলিম উদ্দিন বিচারক ইমান আলীকে ধমক দিয়ে বলেন, 'আপনিই ব্যাগ খোলেন।' বিচারক এ সময় বলেন, 'পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও আপনারা আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন তা বেয়াদবির শামিল।' এ কথা শুনে কলিম উদ্দিন উত্তেজিত বিচারককে মারতে উদ্যত হন। ঠিক তখন নায়েক আব্দুস সালাম বিচারকের সামনে এগিয়ে আসেন এবং কলিম উদ্দিন, নায়েক আব্দুস ছালামসহ কনস্টেবল মোখলেছুর রহমান, মাহবুবুর রহমান, শহীদুল ইসলাম বিচারককে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেন এবং সামনে ও পেছন থেকে ধাক্কা ও কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম বিচারক ইমান আলীর বুকের ডান পাশে ঘুষি মারেন। তাঁরা বিচারককে ধাক্কাতে ধাক্কাতে পশ্চিম দিকে মূল ফটকের মাঝামাঝি নিয়ে আসেন। তখন কনস্টেবল সঞ্জয় কুমার বিচারকের মাথার ডান পাশে সজোরে হেলমেট দিয়ে আঘাত করেন।
ঘটনাস্থলে থাকা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডলকে এ সময় বিচারক বলেন, 'আমি এখানকার যুগ্ম জেলা জজ পরিচয় দেওয়ার পরও আমার সঙ্গে পুলিশ যে আচরণ করেছে, আমি এর বিচার করব।' তখন ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডল বলেন, 'বিচার যা করতে পারেন, করেন গ্যা। এখন যান।'
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিবির ওসি একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও ঘটনাস্থল থেকে বিচারককে উদ্ধার করে অফিসে নিয়ে আসেননি বরং বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
এদিকে পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান মোখলেছুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'গত সোমবার আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কাছে জমা দিয়েছি। যেহেতু এই বিষয়ে মামলা চলমান এবং বিষয়টি স্পর্শকাতর তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের এই বিষয়ে তথ্য দিতে নিষেধ করেছে।'

No comments

Powered by Blogger.