বিশেষ সাক্ষাত্কার-ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতিই এসব দুষ্কর্মের কারণ by এমাজউদ্দীন আহমদ

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক সহিংসতায় ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থী হত্যার শিকার হয়েছেন। শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য ও অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।


এ বিষয়ে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের দু’টি বিশেষ সাক্ষাত্কার ছাপা হলো
 সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মশিউল আলম

প্রথম আলো  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, এই ধারার ছাত্ররাজনীতি আর কত দিন চলবে, নিষিদ্ধ করা উচিত কি না। আপনার মত কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ  গত কয়েক দিনের ঘটনা পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব দুঃখবহ ঘটনা ঘটে চলেছে, তা বিশ্লেষণ করলে একটি সত্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলো, এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতি নির্বাসিত হয়েছে।
প্রথম আলো  মানে?
এমাজউদ্দীন আহমদ  ছাত্ররাজনীতি আমরা যা বুঝি তার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, ভর্তি-বাণিজ্য, আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে বাণিজ্য—এগুলোই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রছাত্রীদের একাংশের কাজ হয়ে উঠেছে। যে ছাত্ররাজনীতি জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করত, জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে যে ছাত্ররাজনীতি প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠত, তা নিঃশেষ হয়েছে বলে মনে হয়।
প্রথম আলো  কেন? কী করে নিঃশেষ হলো?
এমাজউদ্দীন আহমদ  এর কারণগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ দেশের শিক্ষকেরা, শিক্ষা সম্পর্কে যাঁরা চিন্তাভাবনা করেন, তাঁদের একত্র হয়ে নতুনভাবে ভেবে দেখা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। বরং অধিকতর রাজনীতির প্রয়োজন অনুভব করছি।
প্রথম আলো  রাজনীতি বেশি হয়ে গেছে বলেই তো এই পরিস্থিতি...
এমাজউদ্দীন আহমদ  যে রাজনীতি প্রচলিত থাকলে ছিনতাই, রাহাজানি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি সচেতন ছাত্রছাত্রীদের কাছে অরুচিকর বলে পরিত্যাজ্য হবে, যে রাজনীতি প্রাণবন্ত থাকলে ভর্তি-বাণিজ্য, আসন-বাণিজ্য বা শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ ঘৃণ্য, জঘন্য কাজ বলে ধিক্কৃত হবে, সেই রাজনীতি আজ বেশি করে প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিশূন্য হওয়ার ফলেই আজকে এই দুর্ঘটনার কবলে গোটা জাতি।
প্রথম আলো  আপনি যে ধরনের রাজনীতির কথা বলছেন, তা কোথায় পাওয়া যাবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ  বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য কর্মকর্তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সরকারি হস্তক্ষেপ অথবা প্রণোদনা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমস্যা সৃষ্টি করে, সমস্যার সমাধান করে না। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে চলে, এমনকি এই দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে চলছে, সরকারকে সেই দিকে দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষকদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ছাত্রসংগঠনগুলো এখন রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নেই; কিন্তু এ তো তত্ত্বকথা।
প্রথম আলো  বাস্তবে কী করা যেতে পারে?
এমাজউদ্দীন আহমদ  ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিভাবকত্বে আসা প্রয়োজন একান্তভাবে ছাত্রদের। ছাত্রসমাজের দাবি-দাওয়া, দেশ-সমাজ নিয়ে সৃজনশীল চিন্তা, জ্ঞান ও সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং জাতীয় স্বার্থগুলো সমুন্নত রাখার জন্য ছাত্রদের সজাগ থাকা—এগুলোই সুস্থ ছাত্ররাজনীতির বিষয়। কেবল ছাত্রদের নেতৃত্বে, তাদের নিজেদের অভিভাবকত্বেই তা সম্ভব। দলীয় প্রভাব এসব ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ন্যক্কারজনক ঘটনার সূচনা হয়েছে, তা দলীয় প্রভাব ও হস্তক্ষেপের কারণেই।
প্রথম আলো  কিন্তু খুন-জখম, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া—এসব তো ফৌজদারি অপরাধও বটে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটে না...
এমাজউদ্দীন আহমদ  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দক্ষভাবে অন্যায়কর্মে লিপ্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে অপরাধবৃত্তি লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেটাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রী মহোদয়ের হালকা প্রতিশ্রুতির বদলে সঠিক পদক্ষেপ গৃহীত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
প্রথম আলো  কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটা হচ্ছে না। যে ধারায় ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা অব্যাহত থাকলে কোনো পরিবর্তন আশা করা কঠিন। আপনার কি মনে হয় না, এই ধারার ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে?
এমাজউদ্দীন আহমদ  ছাত্ররাজনীতি থাকতে হবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্ররাজনীতি অপরিহার্য। ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতিতেই এই দুষ্কর্মগুলো হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির বদলে ছাত্রদের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি চলছে বলেই এসব অরাজকতা হচ্ছে। লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করে ছাত্রদের সংগঠনগুলোকে প্রকৃত অর্থে ছাত্রদের নেতৃত্বেই ফিরিয়ে দিতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.