সংসদে সবার সংযত আচরণ কাম্য-সরকারের উদ্দেশ্য কী

এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে ১০ মাস বিরতি দিয়ে বিরোধী দল সংসদে যোগদানের পর ২৫ মিনিটও টিকতে পারল না। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিয়ে সরকারি দলের নেতারা সেই পুরোনো আপত্তিকর বক্তব্য তুলে বিএনপিকে ওয়াকআউটে বাধ্য করলেন। সম্প্রতি বিএনপি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েই সংসদে গেছে।


বিরোধী দল হিসেবে উপযুক্ত ভূমিকা রাখার জন্য তারা সংসদ ও রাজপথ—দুই পদ্ধতিকেই প্রাধান্য দেওয়ার নীতি অনুসরণের কথা বলেছে। সরকারি দলের জন্য এর চেয়ে বড় সুখবর আর কী হতে পারে? কারণ বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদ তার কার্যকারিতা হারায়। সংখ্যায় যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বিরোধী দলকে সংসদে না রাখতে পারলে সরকারি দল রাজনৈতিক বিবেচনায় শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তাই সংসদে বিরোধী দলকে সাড়ম্বরে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু, হা হতোস্মি! সমাদর তো দূরের কথা, উল্টো তারা বিএনপির প্রতি উসকানিমূলক কথা বলা শুরু করল।
মুদ্রার অপর পিঠের মতো প্রয়াত জিয়াউর রহমানের জন্য অসম্মানজনক উক্তির পাল্টা হিসেবে রোববার সংসদে বিএনপির নেতারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কেও আপত্তিকর কথা বলতে শুরু করেন। সরকারি দলকে উত্তেজিত করার জন্য সেটাই ছিল যথেষ্ট। ফলে আবার বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এখন কি তাহলে প্রতিদিনই ওয়াকআউট চলতে থাকবে? সরকারি দল কি এটাই চায়?
দেশে সমস্যার অন্ত নেই। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। ছিনতাই, ডাকাতি, খুন বেড়ে চলেছে। বিদ্যুত্ ও গ্যাসসংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিত্যদিনের ব্যাপার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রহত্যা ও নৃশংসতায় মানুষ আতঙ্কিত। বসবাসের অযোগ্যতার তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয় নিকৃষ্ট নগর হিসেবে বিশ্বের দরবারে চিহ্নিত হয়েছে। এসব জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয় না কেন? সংসদ তাহলে কার জন্য? দুই দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি ও দুই প্রধান নেতার বিরুদ্ধে দুই বিরোধী পক্ষের কটূক্তি ও বিষোদ্গারের জন্য তো সংসদ নয়।
সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের কাছে দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সরকারি হিসাব ও মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ ৪৮টি কমিটি গঠিত হয়, যা একটি বড় সাফল্য। তিনটি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হয় বিরোধী দলকে। এটাও এবারই প্রথম। কিন্তু সামনের সারিতে আসনসংখ্যা নিয়ে বিরোধের জের ধরে বিএনপি প্রথম থেকেই ওয়াকআউট শুরু করে। এরপর বিগত এক বছরে সংসদের কাছ থেকে খুব ভালো কিছু আর পাওয়া গেল না। গত জুলাই মাসে নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনের ওপর পরিচালিত টিআইবির এক জরিপে দেখা গেছে, কোরামসংকট ও দেরিতে অধিবেশন শুরুর কারণে নবম সংসদের শুধু প্রথম অধিবেশনেই মোট ২৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট নষ্ট হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই অপচয়ের বোঝা দেশবাসী বহন করবে কেন?
সংসদে দেশের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি দলকেই এ উদ্যোগ নিতে হবে। বিরোধী দলের দায়িত্বও কোনো অংশে কম নয়।

No comments

Powered by Blogger.