ঘুষ লেনদেন ঘৃণিত কাজ by মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার

সুদের পরই নিষিদ্ধ ও অপবিত্র অর্থ ও মাল হিসেবে ঘুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ঘুষ উপরি বখশিশ নামে হাতিয়ে নেওয়া অতিশয় অপবিত্র, চরম ঘৃণিত, দূষণীয় এবং অপছন্দনীয়। কাউকে কোনো কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে চাপ প্রয়োগ করে অন্যায়ভাবে ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে নগদ অর্থ বা কোনো সুবিধা আদায় করাই ঘুষ।


যেমন সরকারি, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত কর্মচারী, অফিসাররা বেতন-ভাতার বিনিময়ে জনসাধারণের কাজ করতে বাধ্য সেসব কাজ করে দিতে চাপে ফেলে সাধারণের কাছ থেকে বখশিশ নামে কিছু আদায় করলেই তা ঘুষে পরিণত হয়। ঘুষ গ্রহণ ও প্রদানের মতো জঘন্য ও ঘৃণিত দুর্নীতি আর নেই। ঘুষের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবে সমাজের লোকজন তাদের নৈতিক চরিত্র যেন প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। দেশে ঘুষ, দুর্নীতির প্রভাবে মানুষ যে কত অধঃপতিত হয়ে নিচে নেমে এসেছে তা বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। আজ ঘুষের গ্রাসে সমাজ ও দেশে সুদূরপ্রসারী কুফল নেমে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, যার দরুন সাধারণ নিরীহ মানুষ আজ পদে পদে বিপদগ্রস্ত। বরাবরই অসাধু মানুষের কাজকর্ম গুটিয়ে আনতে নিজের অন্যায় স্বার্থ উদ্ধারে কমবেশি ঘুষ লেনদেন করে আসছে। যাতে সমাজে, অফিস-আদালতে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, অফিস-আদালত হোক, কোর্ট-কাচারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুষ্টিমেয় অসৎ-অসাধু মানুষ সাধারণ মানুষ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে অবাধে একজনের স্বত্বভূমি-সম্পদ আরেকজনের নামে রেকর্ড করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ জঘন্য ঘুষ প্রথায় খুনের আসামিরা পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায়। পক্ষান্তরে ওই একই ব্যবস্থায় কত নিরীহ মানুষ কারাবন্দি হচ্ছে, এমনকি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলছে। যার ফলে একদিকে যেমন হত্যা, খুন, মারামারি, তথা নৈরাজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে হতাশা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে এমন চিত্রও লক্ষ্য করা যায় যে, ঘুষ-উৎকোচ দিয়ে মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমা সাজিয়ে নিরপরাধ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে বিপন্ন করে দিচ্ছে। অন্যদিকে ঘুষ না দেওয়ায় সমস্যা সংকুল অসহায় মানুষ বিচারের দরজা থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসছে। ফলে ঘুষের দাপটে এখন আমাদের সমাজ থেকে ন্যায়বিচার বিদায় নিতে চলেছে।
ঘুষ লেনদেনে যারা জড়িত উভয়েই সমঅপরাধী। ঘুষদাতা ও গৃহীতা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, 'ঘুষ লেনদেনে যারা সম্পৃক্ত তারা উভয়ই দোজখের আগুনে জ্বলবে।' যেহেতু উভয়েই নিজ নিজ অন্যায় স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঘুষের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ঘুষের অর্থ এবং মালমাত্তা সুদের অর্থ-মালের মতো চরম ঘৃণিত ও অপবিত্র। এ অর্থ-মাল যেমন নিজের ভোগদখল করা জায়েজ নয়, তেমনি এ দ্বারা কোনোরূপ অন্যের ওপর বা কাউকে দান-খয়রাত কিংবা নেক অনুষ্ঠান এবং সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানাদিতে খরচ করে তা দ্বারা পুণ্য বা সওয়াব লাভের আকাঙ্ক্ষা করাও অবান্তর এবং অত্যন্ত পাপের কাজ। এমনকি পীর, আলেম, ওলামা, ইমাম এবং পরহেজগার লোকদেরও উচিত, নিজেরা যেমন ওইসব ঘুষখোরের অনুষ্ঠানাদিতে জোগদান থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও পাপ পথে অর্জিত ঘুষের অর্থে অনুষ্ঠান বর্জন করা। ঘুষখোর ও ঘুষদাতারা যদি তার কৃত অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে চায়, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ঘুষের মাল এবং ঘুষের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেবে তারা ক্ষমা না করলে তাদের অপরাধ ক্ষমা হবে না। এসব কিছু বান্দার হক। কেউ অপর কারও হক নষ্ট করলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার ক্ষতিপূরণ করা হবে, ততক্ষণে আল্লাহ পাক হক নষ্টকারীকে ক্ষমা করেন না। বান্দার হক নষ্ট বা খেয়ানত করলে বান্দার কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে, নতুবা হক পাই পাই করে বুঝিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ কেবল তার নির্দেশিত ইবাদত-বন্দেগিতে কেউ যদি বিরত থাকে সে জন্য বান্দা কায়মনে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। দেশের পীর, আলেম, ওলামা ও ইমামদের ঘুষ-দুর্নীতির মূলোচ্ছেদে যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এ কাজগুলো কতটা ঘৃণিত, অপছন্দনীয় তা সাধারণকে সচেতন করা, দেশের প্রতিটি স্থানে ঘুষখোরদের পরিণাম সম্পর্কে পোস্টার-লিফলেট প্রকাশ করে বিলি করা এবং এও জানিয়ে দেওয়া যে, একথা বলে আল্লাহ ও পরকালে ভয় রাখুন :ঘুষ লেনদেন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি পরিহার করুন।
 

No comments

Powered by Blogger.