নারিকেল জিঞ্জিরার-সমুদ্রতলে by ইমরান উজ-জামান

প্রায় ১৪ বছর ধরে ফটোসাংবাদিকতা করছেন শরীফ সারওয়ার। পেশার তাগিদে চষে বেরিয়েছেন জনসভা, মিছিল, রাজপথ থেকে মফস্বল—সবখানে। ছবি তুলেছেন প্রতিবাদী মানুষের, বিক্ষোভের, আকাশ, নদী ও বনের। কিন্তু বিদেশি পত্রপত্রিকায় হরহামেশাই ছাপা হতে দেখেছেন সাগরতলের অসাধারণ সব ছবি।


সেসব ছবির রং-রূপ তাঁকে সব সময়ই বিমোহিত করেছে। তখন থেকেই বুকের ভেতর লুকানো ছিল একটা ইচ্ছে: গুপ্তধন উদ্ধারের মতোই তিনিও বাংলাদেশের সাগরতলে হানা দিতে চান, ক্যামেরাবন্দী করতে চান অজানা ওই জগৎকে। কিন্তু ওই স্বপ্ন বাস্তব হবে কীভাবে? তার জন্য দরকার বিশেষ কিছু যন্ত্রপাতি, শুধু ক্যামেরাই যথেষ্ট নয়। আর ক্যামেরাও হতে হবে পানির তলদেশে ছবি তোলার উপযোগী। এছাড়া পানির তলে কীভাবে ছবি তুলতে হয় তার নিয়মনীতিও তাঁর জানা প্রয়োজন।
২০০৯ সালে পেশাগত কর্মজীবনের সমাপ্তি টেনেছেন শরীফ। কিন্তু সাগরের তলদেশের ছবি তোলার স্বপ্ন তাঁকে তার পরও তাড়িয়ে বেড়ায়: টেলিভিশনে, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলে সমুদ্রের নিচের রহস্যময় জগতের ছবি যখন দেখেন, তখন পুরোনো ইচ্ছেটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে প্রবলভাবে। সাগর হাতছানি দিয়ে যেন ডাকে প্রতিনিয়তই।
শেষে টাকা জমিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করে শরীফ সাগরের নিচে ছবি তোলার উপযোগী একটি ক্যামেরা কিনে ফেললেন। খুব দামি ক্যামেরা কেনা সম্ভব হলো না। কম দামি, তবে কাজ চলবে এমন একটা ক্যামেরা: ক্যানন জি-১২।
ক্যামেরা হলো। এরপর পানির নিচে ছবি তুলতে লাগবে ক্যামেরার কেসিং। কেসিং ছাড়া পানির নিচের ছবি তোলা সম্ভব নয়। এ সময় পূর্বপরিচিত অগ্রজ ফটোসাংবাদিক সৈয়দ জাকির হোসেনের কথা মনে পড়ল। তাঁরও পানির নিচে ফটোগ্রাফি করার স্বপ্ন ছিল। সে জন্য তিনি একটা কেসিংও কিনেছিলেন, নানা ঝঞ্ঝাটে তাঁর আর সমুদ্রে নামা হয়নি। শরীফের স্বপ্নের কথা শুনে জাকির হোসেন তাঁর কেসিংটা দিয়ে দিলেন নির্দ্বিধায়।
এর পরের পর্ব হচ্ছে সাগরের তলদেশে কীভাবে যেতে হবে, অর্থাৎ আন্ডারওয়াটার ডাইভিং সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর করতে হবে তাঁকে।
শুরু হলো খোঁজখবর করা। নানা জনের সঙ্গে কথা বলে, বইপত্র ঘেঁটে জানা গেল পানির নিচের দৃশ্য দেখার জন্য দুই ধরনের পদ্ধতি বেশির ভাগ ফটোগ্রাফার অনুসরণ করে। প্রথমটি হচ্ছে, পানির সমান্তরালে ভেসে ভেসে দেহের পেছনের অংশ পানির ওপরে রেখে, সামনের অংশ পানির নিচে রেখে, পানির নিচের দৃশ্য অবলোকন করা। যাকে বলে স্নোরকেলিং। তবে এ পদ্ধতিতে পানির খুব বেশি গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর পানির নিচে ডুব দিয়ে সাঁতরানোকে বলে স্কুবা ডাইভিং। ছবি তুলতে স্কুবা ডাইভিংয়ের বিকল্প নেই। এখন প্রশ্ন হলো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ—এসব দেশে স্কুবা ডাইভিং ডালভাতের মতো, প্রচুর প্রতিষ্ঠান আছে যারা স্কুবা ডাইভিংয়ের ব্যাপারে যাবতীয় সেবা বিক্রি করে। কিন্তু বাংলাদেশে সে রকম কোনো প্রতিষ্ঠান কি আছে, যারা পর্যটকদের স্কুবা ডাইভিংয়ে নিয়ে যায় সাগরে? অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা প্রতিষ্ঠানের খবর পাওয়া গেল, যারা স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য বিদেশিদের সহযোগিতা করে। তাদের অফিস মতিঝিলেই, নাম ‘ওসানিক স্কুবা ডাইভিং সার্ভিস’।
ওসানিক স্কুবা ডাইভিং সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হলেন শরীফ, নিজের ইচ্ছের কথা জানালেন তাঁকে। আতিকুর রহমান আন্তরিকভাবেই তাঁকে সম্ভব সব রকম সহায়তার আশ্বাস দিলেন।
শুরু হলো শরীফের স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য প্রস্তুতিপর্ব। পেশাদার প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিন দিনের একটা প্রশিক্ষণও নিলেন তিনি। এই ট্রেনিংয়ে শিখলেন কীভাবে পানিতে নামতে হয়, কীভাবে ডুবুরির পোশাক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরতে হয় ও পানির নিচে বহন করতে হয় অক্সিজেন সিলিন্ডার। এবং কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে, জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হয়।
ওসানিক স্কুবা ডাইভিং সার্ভিসের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হলো: গ্যাস সিলিন্ডার, ডুবুরির পোশাক ও গাইড দিয়ে সহযোগিতা করবে এই প্রতিষ্ঠান। আর তিনি ক্যামেরা আর সাহস সম্বল করে নামবেন সাগরে।
সাগরের নিচে বিচরণের জন্য বিশ্বের প্রায় সব ডাইভাররাই সাধারণত ভাটার সময়টা বেছে নেন। কারণ ভাটার সময় সাগরে পানির উচ্চতা জোয়ারের সময়ের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট কম থাকে। আর দিনে দুবার করে সাগরে জোয়ার-ভাটা হয়। ভাটা হয় সকালে আর বিকেলে। ঝকঝকে আকাশ আর নির্মল আবহাওয়ার কারণে শরীফ ও তার গাইড সকালে ভাটার সময়টাকেই ডাইভিংয়ের জন্য বেছে নিলেন।

প্রথম দেখা না-দেখা ভুবন
২৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম ট্রায়াল দেওয়ার জন্য সমুদ্রে নামলেন শরীফ। পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মতো পানিতে কাটিয়ে ওপরে উঠে এলেন প্রথমবারে। তারপর সারা দিনে বেশ কবার এভাবে সাগরে নামলেন তিনি। সেদিন কোনো ছবি তোলা হলো না। এর পরের দিন সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যামেরাসহ ছবি তোলার সব রকম প্রস্তুতি নিয়েই নামবেন সাগরে। মুখে ব্রিদিং টিউব, শরীরে জ্যাকেট, কোমরে ওয়েট বেল্ট, পায়ে স্লিপার, পিঠে গ্যাস সিলিন্ডার, সবশেষে মুখে মাস্ক পরে নিলেন। এই প্রথম কেমন যেন ভয় ভয় লাগতে শুরু করল তাঁর। ঘড়িতে তখন সময় সকাল আটটা। ডাইভিংয়ের পোশাক পরে স্পিডবোটে চেপে হাজির হলেন ছেঁড়াদিয়ার কাছাকাছি। সঙ্গে সমুদ্রতলদেশে ডাইভিংয়ে অভিজ্ঞ গাইড, যাঁর নাম হালিম। শরীফকে কীভাবে কী করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে হালিম উল্টো দিকে ঘুরে, ঝটিতি ডাইভ দিয়ে নেমে গেলেন পানিতে। বোটে বসা শরীফ। কী আর করা! বড় করে দম নিয়ে সঙ্গে শরীফও নেমে পড়লেন পানিতে। হালিম হাতের ইশারায় জানিয়ে দিচ্ছেন কোন দিকে যেতে হবে, কী করতে হবে। পানির নিচে ইশারায় কথাবার্তা সারতে হয়, এটাই নিয়ম। শরীফ টের পাচ্ছিলেন, যত পানির গভীরে যাচ্ছেন তাঁর কানে পানির চাপ তত বাড়ছে। দুই কানেই দুদিক থেকে পানির প্রচণ্ড চাপ অনুভূব করছেন। প্রথমদিকে যে-কারও জন্য এই অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। শুধু কানে পানির চাপ তো নয় পানির নিচে মুখেই নিঃশ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার কাজটিও করতে হয়। এ রকম কঠিন পরিস্থিতিতে প্রথম দিন খুব অল্প কিছু ছবি তুললেন শুধু শরীফ। প্রথম ক্যামেরার শাটার টেপা—অর্থাৎ, প্রথম সাগরে নেমে, সাগরতলের বৈচিত্র্যময় জগতের ছবি তোলার কথা কোনো দিনই ভুলতে পারবেন না তিনি। সেই সময়টার উত্তেজনার কোনো তুলনা হয় না। সামনে একঝাঁক রঙিন মাছের দল হঠাৎ তাঁর সাড়া পেয়ে যেদিকে পারল যেন ছোটাছুটি জুড়ে দিল। অন্যদিকে চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো সারি সারি নানা রঙের কোরাল। কোরালের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজারো রঙের ঝলমলে মাছ। কোরালগুলোর একেকটা শক্ত, কোনোটা আবার একেবারে জেলির মতো নরম। কোনোটায় আবার নানা নকশা আঁকা। কোনটা রেখে কোনটার ছবি তুলবেন শরীফ। একটা মাছের ঝাঁক পাশ কাটাতে না কাটাতেই এগিয়ে আসছে আরেকটা। এদের কোনোটি লাল, কোনোটা নীল, কোনোটা হলদে—কত যে রং তাদের গায়। কিন্তু সব ছোট মাছ। একবার এক ঝলকের জন্য একটা বড় মাছের দেখা পেয়েছিলেন শরীফ। কিন্তু ছবি তোলার আগেই সেটা পালিয়ে গেল দ্রুত।
এ রকম বিস্ময়কর এক জগতে এসে সব কিছু ভুলে যাওয়ার কথা তাঁর। কিন্তু শরীফের হচ্ছিল এর উল্টো। কিছুতেই ভেতর থেকে ভয় তাড়াতে পারছিলেন না তিনি। কিসের ভয়? জানতে চাইলে শরীফ বলেন, ‘অজানা ভয়, কারণ জগৎটা অজানা। এর আগে এ ধরনের জায়গায় কখনো আসা হয়নি।’
এ ছাড়া বারবার গ্যাসমিটারে চোখ রাখতে হচ্ছিল শরীফকে, এই বুঝি গ্যাস শেষ হয়ে যায়! সব মিলিয়ে প্রথম ডাইভে শরীফ পাঁচ থেকে সাত মিনিট ছিলেন পানির নিচে। যদিও এক ঘণ্টা পানির নিচে থাকার মতো গ্যাস থাকে সিলিন্ডারে, কিন্তু এটা শরীফের প্রথম আন্ডার ওয়াটার ফটোগ্রাফি—আর অভ্যাস না থাকায় অল্প কিছুক্ষণ পানির নিচে কাটিয়েই হাঁসফাঁস করে ওপরে উঠে আসছিলেন তিনি।
সর্বোচ্চ ৪৫ ফুট পানির নিচে পর্যন্ত গিয়েছিলেন শরীফ। প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয়বারে পানিতে ছিলেন বেশিক্ষণ, ছবিও তুলেছিলেন বেশি। সব মিলিয়ে সাত দিন নারিকেল জিঞ্জিরার পানির তলদেশে বিচরণ করেছেন শরীফ। দেখেছেন সাগরের তলদেশের সৌন্দর্য আর প্রত্যক্ষ করেছেন সাগরের তলদেশের অমূল্য সম্পদরাজি।
হামিদুল হক আর শহীদুল আলম এ দুজন সাগরতলের ছবি তুলেছেন বলে জানেন শরীফ। তবে তাঁদের সাগরতলে তোলা ছবি দেখেননি কখনো। শুনেছেন তাঁরা বঙ্গোপসাগরের চেয়ে অন্যান্য মহাদেশের সাগরের নিচের ছবিই বেশি তুলেছেন। তবে সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণ করে হামিদুল হক বলেছিলেন, নারিকেল জিঞ্জিরায় (সেন্ট মার্টিন) মানুষের যাওয়া-আসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। শরীফ এর সঙ্গে একমত: তিনি সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে দেখেছেন, কীভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে সমুদ্রের নিচের কোরালপ্রাচীর। ভ্রমণকারীদের নোঙর আর লগি-বৈঠার আঘাতে কোরালপ্রাচীর এখন বিলীন হওয়ার পথে।

No comments

Powered by Blogger.