আমার একুশ-বাংলা ভাষা: উচ্চশিক্ষায় প্রয়োগ ও সমস্যা by সৌরভ সিকদার

আমার ভাষাবাংলা ভাষার অনেক অর্জন, এ কথা যেমন সত্য, তেমনই বড় সত্য হচ্ছে, এ ভাষা এখনো পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাহন হতে পারেনি। প্রথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলা ভাষা মোটামুটি দাপটে তার কর্তৃত্ব বজায় রাখলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ জ্ঞান-শাখায় সে দুর্বল। দুর্বল এ জন্য নয় যে তার বল বা শক্তি নেই।


আসলে আমরা এবং আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র তার সে শক্তি প্রয়োগ করার সাহস এবং উদ্যোগ কোনোটাই নেয়নি। অথচ মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যের যত গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব অন্য ভাষায় তা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের মাতৃভাষার এ দুর্বলতার জন্য দুই শ বছরের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন যেমন দায়ী, তেমনি পরিভাষা আর পাঠ্যবইয়ের অভাবের অজুহাতও কম দায়ী নয়। অবিভক্ত ভারতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতবর্ষীয় উপাচার্য। ১৮৯১ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে তিনি বলেছিলেন, আমাদের নিজস্ব চিন্তা এবং সংস্কৃতির বিকাশ ততক্ষণ পর্যন্ত ঘটবে না, যতক্ষণ না জ্ঞানার্জন মাতৃভাষার মাধ্যমে হবে।
ইউরোপ তো বটেই, জাপান পর্যন্ত মাতৃভাষার ওপর ভর করে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে বিদ্যায় ও অর্থে আজ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাই অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের প্রকৃত আলো ছড়াতে মাতৃভাষার বিকল্প নেই। ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে লিখলেন— ‘উচ্চশিক্ষাকে আমাদের দেশের জিনিস করিয়া লইতে হইবে। পশ্চিম হইতে যা কিছু শিখিবার আছে জাপান তা দেখিতে দেখিতে সমস্ত দেশে ছড়াইয়া দিল, তার প্রধান কারণ, এই শিক্ষাকে তার দেশী ভাষার আধারে বাঁধাই করিতে পারিয়াছে। অথচ জাপানি ভাষার ধারণা শক্তি আমাদের ভাষার চেয়ে বেশি নয়। নতুন কথা সৃষ্টি করিবার শক্তি আমাদের ভাষায় অপরিসীম।... বাংলা ভাষাতেই আমরা উচ্চশিক্ষা দিব এবং দেয়া যায়, এবং দিলে তবেই বিদ্যার ফসল দেশ জুড়িয়া ফলিবে।’ এরপর প্রায় এক শ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের উচ্চ শিক্ষায়তনে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা হয়নি; না বাংলাদেশে না পশ্চিমবঙ্গে। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিভাগে আমি পাঠদান করি, সেখানে পাঠ্যক্রমটি পর্যন্ত ইংরেজিতে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের দুর্বল ইংরেজিজ্ঞান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে, প্রায় এক শ পৃষ্ঠার একটি আগাগোড়া ইংরেজি পাঠ্যক্রম হাতে নিয়েই অন্তত অর্ধেক শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের উত্সাহ-উদ্দীপনা পরিণত হয় উত্কণ্ঠা এবং ভীতিতে। সব মিলিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কথা, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে টেনেটুনে দ্বিতীয় শ্রেণী অর্জনের সংগ্রাম।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষা প্রচলনের সংগ্রাম শুরু করেছিলেন যুবক বয়সে, সফল হননি, পরে উপাচার্য হয়ে ১৯২১ সালে আবার উদ্যোগ নেন। নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে শেষে ১৯৩৪ সালে সরকার অনুমোদন দিলে শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রথম পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান ১৯৪০ সালে। সেই থেকে এখনো মাতৃভাষায় পরীক্ষাদানের সুযোগ থাকলেও পাঠদান, বইপত্র, গবেষণার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাই বহাল আছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা-ইংরেজি মিশ্র ভাষায় পাঠদান শুরু হয়। তবে বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞানশাখায় ইংরেজির আধিপত্য থেকেই যায়। আমাদের উচ্চশিক্ষার যে জায়গায় মাতৃভাষার প্রয়োগ নেই বললেই চলে তা হচ্ছে প্রকৌশল, কৃষি, চিকিত্সা প্রভৃতি। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষার কিছুটা হলেও প্রবেশাধিকার রয়েছে। অথচ প্রকৌশল, কৃষি বা চিকিত্সা এমন কোন শাস্ত্র নয়, যা বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাদান অসম্ভব। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কখনো বাংলাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সেখানে করেনি। বিগত এক দশকে দেশে যে অর্ধশত ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের অনুমোদন নিয়ে শিক্ষা-ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো পর্যায়ে কি বাংলা ভাষার প্রয়োগ আছে? শিক্ষার্থীরা সেখানে কী শিখছে বা আদৌ শিখছে কী না সেটা তাদের অনেকের কাছেই বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে রোমান হরফ দিয়ে সে লিখতে পারে কি না, ইংরেজি ভাষার সুমধুর(?) ধ্বনি শব্দ বাক্য তার দুটি ঠোঁটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কি না। ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ’ করার সময় সরকারের বাংলা ভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরির দিকটা বিবেচনা করা উচিত ছিল।
১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষার ব্যবহার: ব্যবহারিক জীবনে উচ্চশিক্ষা’ শিরোনামে যে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে এ বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় এবং ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, গণিত, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে বাংলা ভাষা প্রয়োগ করা যে সম্ভব সে বিষয়ে অধিকাংশ খ্যাতিমান অধ্যাপক ও গবেষক মন্তব্য করেন। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধের সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন—‘স্বাধীন দেশে শিক্ষার উচ্চতম স্তর পর্যন্ত মাতৃভাষাকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। মাতৃভাষা বাংলা হবে সে শিক্ষার মাধ্যম—এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। তবে সহযোগী দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে আমাদের দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। উচ্চপর্যায়ে বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে, গবেষণার ক্ষেত্রে, নতুন জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাজ্ঞান আমাদের প্রভূত পরিমাণে সহায়তা করবে। অতএব কোনো এক পর্যায় থেকে বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে করে উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে শিক্ষার্থী এই ভাষাজ্ঞানের বলে লাভবান হতে পারেন।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের কলেজ-বিদ্যালয়ে উপযুক্ত ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা ও পরিবেশ নেই।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন—‘বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পর থেকে আমরা শিক্ষার মাধ্যমরূপে বাংলা প্রচলনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মাধ্যমরূপে বাংলা ভাষা আজও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এর একটি কারণ, এ পর্যায়ে উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তকের অভাব। দ্বিতীয় কারণ, আমাদের মুখস্থ করার প্রবণতা। তৃতীয় কারণ, দ্বিতীয় একটি ভাষায়—আমাদের ক্ষেত্রে ইংরেজিতে—আমাদের অদক্ষতা। ফলে বাংলা পাঠ্যপুস্তকের অভাব যে ইংরেজিতে পাঠ্যপুস্তক পড়ে এবং তা আত্মস্থ করে আমরা শিক্ষাদান ও গ্রহণ করব, সে অবস্থাও সৃষ্টি করতে পারছি না। নানা বিষয়ের যাঁরা বিশেষজ্ঞ, পাঠ্যপুস্তক তো তাঁরাই লিখবেন, তাঁরা এ কাজে এগিয়ে আসছেন না। শুধু অনুবাদ করে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন মেটানো যাবে না। সে অনুবাদকার্যও হচ্ছে না। নিজেরা মৌলিক বই লিখব—এমন আশাও পূর্ণ হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরো বিষয় সম্পর্কে আমাদের সন্দেহ ও দ্বিধা—বাংলা ভাষা কি সত্যি সত্যি উচ্চশিক্ষার বাহন হতে পারবে? এই বিশ্বায়নের যুগে বাংলা মাধ্যমে বিদ্যাশিক্ষা করে আমরা পিছিয়ে পড়ব না তো? প্রথমে আমাদের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে হবে। তারপর উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় বইপত্র রচনায় ও প্রকাশে মনোযোগ দিতে হবে। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় ভাষাটিও ভালো করে শিখতে হবে।’
বর্তমানে প্রস্তাবিত আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলার প্রচলন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া আশু কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.