জন্মদিন-জয়তু কবীর চৌধুরী by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

৯ ফেব্রুয়ারি, অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ৮৮তম জন্মদিন। আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার্ঘ্য কালির আখরে তৈরি করছি। দীর্ঘ আয়ু নিয়ে বেঁচে থাকা তেমন কিছু নয়, কিন্তু সগৌরবে কীর্তিমান থেকে, শুধু তা-ই নয়—সেটা নিরবচ্ছিন্ন থেকে, বেঁচে থাকা আমাদের দেশে বিরল ঘটনা এবং এখানেই তাঁর দীর্ঘায়ুর সার্থকতা। জয়তু, কবীর চৌধুরী।


তাঁর সঙ্গে মেলামেশা আমার বৃদ্ধকালে শুরু হয় নানা আলোচনা সভায় এবং বৈঠকে। সেটা অব্যাহত আছে এবং আমি নিশ্চিত, তেমনটি চিরকাল থাকবে। আমি কৌতূহলী চিত্তে তাঁর স্বরূপকে খুঁজে পেয়েছি এবং সে কাজটিতে আকর হিসেবে ব্যবহার করেছি তাঁর অনূদিত কয়েকটি বিশ্বসাহিত্যের সেরা গ্রন্থ। কাজটি করার আগে কেন এই পদ্ধতি বেছে নিলাম তার কৈফিয়ত দিচ্ছি। মাধ্যমিক বিজ্ঞান শ্রেণীতে পড়ার সময় ইংরেজি বিষয়ে পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল নাইন মডার্ন প্লেজ নামে একটি বই। বইটিতে সংকলিত নাটকগুলোর মধ্যে রাইডারস টু দ্য সি নামে এক-অঙ্ক নাটকটি আমাকে বেদনাতুর-মুগ্ধ করেছিল। কলেজে পড়া অর্ধ শতাব্দীরও এক দশক আগের অন্য বইগুলো হারিয়ে গেছে, কিন্তু ওই বইটি এখনো আমার সংগ্রহে আছে। কবীর চৌধুরীর অনূদিত রূপান্তরিত নাটক পড়তে গিয়ে দেখলাম আমার ওই প্রিয় নাটক সাগরপানে ঘোড়সওয়ার নামে সেখানে অন্তর্ভুক্ত আছে এবং দুজনের ভালোলাগার সাদৃশ্য দেখে এর আগে উল্লিখিত পদ্ধতি বেছে নিলাম।
নাগিব মাহফুজের আখেনাতেন: সত্যে বসবাসকারী অনুবাদ-গ্রন্থটি কবীর চৌধুরী উত্সর্গ করেছেন তাঁর কনিষ্ঠ কন্যাকে। উত্সর্গ-পাতায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি কন্যাকে আশীর্বাদ করেছেন; সেটা তাঁর ব্যক্তিক আদর্শও বটে—‘সত্যের বন্ধন পরো, সে বন্ধন/প্রেম মন্ত্রবলে/করো অলঙ্কার।’
চিনুয়া আচেবের সবকিছু ভেঙে-চুরে যায় অনুবাদ-গ্রন্থটির উত্সর্গ-পাতায় তিনি লিখেছেন: ‘উনিশ শতকের শেষদিকে সংঘটিত সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর নায়ক দুই ভাই সিধু ও কানুর স্মৃতির উদ্দেশে।’ ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ পুরোপুরি চরমে পৌঁছে। যাকে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ বা সিপাহি বিদ্রোহের উত্তরসূরি বলা যায়। এখানে আমরা কবীর চৌধুরীর প্রগাঢ় ইতিহাসমনস্কতার পরিচয় পাই। স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনো নায়ককেই তিনি ভুলতে পারেন না।
“একজন দারোগা অন্যায়ভাবে কতিপয় সাঁওতালকে গ্রেপ্তার করিয়া থানায় লইয়া যাইতেছিল। পথে বিদ্রোহীরা তাহাদিগকে আটক করিয়া তাহাদের নায়ক সিদু ও কানুর নিকট লইয়া যায়। দারোগা ক্রোধে চিত্কার করিয়া উঠিল: ‘কে তুই সরকারি কাজে বাধা দিস!’
একজন বলিল: ‘আমি কানু, এ আমার দেশ।’
দ্বিতীয়জন বলিল: ‘আমি সিদু, এ আমার দেশ।’
কানু চিত্কার করিয়া ঘোষণা দিল: হুল (বিদ্রোহ) আরম্ভ হইয়া গিয়াচে। চারিদিকে শালের ডাল পাঠাইয়া দাও। এখন আর দারোগা নাই হাকিম নাই, সরকার নাই, আমাদের রাজা আসিয়া গিয়াছে।”
(আর. ব্যাট্রিক, সাঁওতাল-বিদ্রোহ, অনুবাদ সুপ্রকাশ রায়)
কবীর চৌধুরী বাঙালিদের, বাংলাদেশের এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঙালিদের, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন। কলকাতার দেশ পত্রিকায় তাঁর অনূদিত উপন্যাসগুলোর বিজ্ঞাপন তার সাক্ষ্য দেয়। বিদেশি লেখকদের লেখা বিশাল সমুদ্র-ভাণ্ডার থেকে তিনি দক্ষ ডুবুরির মতো নানা রঙের গ্রন্থ বেছে নিয়ে পরিবেশন করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়, মূল রচনার সঙ্গে পুরোপুরি মিল রেখে। তাঁর অনূদিত আঁদ্রে জিদের লেখা পাস্টোরাল সিম্ফনি পড়ার আগে কে জানত ‘দিনপঞ্জি-উপন্যাস’-এর কথা? আমার মতো বোধ করি অনেকেই। তাঁর বিচরণক্ষেত্র কেবল বিশ্বসাহিত্যেই নয়, তার অন্তর্ভুক্ত বিশ্বচিত্রকলাও। তাঁর রচিত এ বিষয়ে কয়েকটি বইয়ের মধ্যে আমার সংগ্রহে আছে একটি। সেটা গয়্যা-স্পেনের খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী। গয়্যার আঁকা অনেকগুলো ছবির প্রতিলিপিসহ সে সময়কালের প্রেক্ষাপটে জীবনকথা কবীর চৌধুরীর আরেকটি অনবদ্য কীর্তি। বইটির লেখা পড়ে ও ছবির প্রতিলিপিগুলো দেখে যে নান্দনিক অভিজ্ঞতা ঘটে, তা শুধু অনুভবযোগ্যই—বর্ণনা করা যায় না।
এখানেই শেষ নয়। তিনি একজন সমাজমনস্ক ব্যক্তিও বটে। নানা সামাজিক আন্দোলনের নেতা। তাঁর দেওয়া ‘মিসবাহউদ্দিন খান স্মারক বক্তৃতা’র প্রথম অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যা বাঙালি জাতির আকাঙ্ক্ষা হাজার বছরের: ‘কি রকম দেশ ও সমাজ চাই আমরা? আমরা এমন একটি সমাজ ও দেশ চাই যা হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত এবং বাঙালিত্বের চেতনায় উদ্দীপ্ত। আমরা কিছুতেই তেমন সমাজ চাই না, যেখানে স্বৈরাচারী শাসকরা শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটভাবে বিরাজ করবে, অহিংস অথবা সহিংস মৌলবাদ শিকড় গেড়ে বসবে এবং যেখানে সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনসহ সামগ্রিক জীবনাচরণে বাঙালিত্বের সংস্কৃতি প্রাধান্য পাবে। ...আমরা মৌলবাদমুক্ত একটি সমাজ চাই।’

No comments

Powered by Blogger.