অসাম সেলসম্যান by বিশ্বজিৎ দাস

‘আমাকে একটা স্যানিটারি ন্যাপকিন দিন তো।’ ছেলেটি বলল।
ভরদুপুর। খরিদ্দার তেমন একটা নেই বললেই চলে।
‘ফ্যামিলি মেগা শপ’-এর জুনিয়র সেলসম্যান তিলক বসে বসে ঝিমোচ্ছিল। হঠাৎ ঝিমুনি কেটে গেল।
‘দিন না।’ আবার বলল কিশোর।


‘তুমি এ ন্যাপকিন দিয়ে কী করবে?’ তিলক জানতে চাইল।
‘আমার ছোটবোনকে গিফট করব।’
‘তোমার ছোট বোনের বয়স কত?’
‘পাঁচ মাস। টিভিতে অ্যাড দেখায় যে এটা পরলে মেয়েরা হাঁটতে পারবে, দৌড়াতে পারবে। তাই এই ন্যাপকিন কিনে আমি ওকে গিফট করব।’
কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল তিলক।
ম্যানেজারের হাসির শব্দ!
ওদের গল্প শুনে হাসছেন। ইশারায় তিলককে তাঁর রুমে ডাকলেন তিনি। ছেলেটিকে বিদায় করে দিয়ে ম্যানেজারের রুমে এসে ঢুকল তিলক।
‘শোনো, তোমার কাজ হচ্ছে পণ্য বিক্রি করা। কে কেন কোন জিনিসটা কিনছে, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার না।’ হাসিমুখে বললেন ম্যানেজার শফিক হাসান।
‘জি, স্যার।’
‘লজ্জার কিছু নেই! প্রতিদিনই আমরা কিছু না কিছু শিখি। শোনো, তোমাকে একটা গল্প বলি।’
হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল তিলক।
‘আমার এক বন্ধু নয়নের ছিল কনফেকশনারির দোকান। আমি তখন ছাত্র। ওর দোকানে মাঝেমধ্যে বসে আড্ডা মারি। একদিন ওকে একটা টিনের কৌটা দেখিয়ে জানতে চাইলাম, ওটা কী? নয়ন বলল, টুনা মাছ। এটা খেলে দারুণ বুদ্ধি বাড়ে।
সত্যি! বিস্মিত হলাম।
বিশ্বাস না হয় একটা খেয়ে দেখ—তাহলেই বুঝতে পারবি।
দাম কত?
বিক্রি তো করি আড়াই শ টাকায়। তুই দুই শ দে।
বাড়িতে কিনে এনে খাওয়ার পর বুঝলাম টাকাটা জলেই গেল! সন্দেহ হলো—দাম বেশি নেয়নি তো বন্ধু! অন্য একটা দোকানে জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, মাত্র এক শ টাকায় বিক্রি হয় কৌটাটা। তার মানে নয়ন আমাকে এক শ টাকা ঠকিয়েছে। চেপে ধরলাম ওকে।
দেখলি তো টুনা মাছ খেয়ে তোর বুদ্ধি কেমন বেড়েছে! হাসতে হাসতে বলল নয়ন।’
গল্প বলা শেষ করে হো হো করে হাসলেন শফিক।
তারপর বললেন, ‘শোনো, খরিদ্দার এলে যেভাবে পারো পণ্য বিক্রি করবে। তার কাছে পণ্য বিক্রি করাটাই তোমার সাফল্য। ধরো, তোমার কাছে এসে কেউ চাইল ঘুঘু সাবান। অথচ তোমার কাছে আছে ভাক্স সাবান। বুঝিয়েসুজিয়ে ভাক্স সাবান বিক্রি করাটাই তোমার কৃতিত্ব! বুঝেছ?’
‘বুঝেছি!’ ঘাড় কাত করল তিলক।

দুই.
ভদ্রলোক অনেক কিছু কিনলেন—সাবান, শ্যাম্পু, মোজা, কয়েল, মোমবাতি, ক্রিম।
তিলক তাঁকে একটা ক্যালেন্ডার গিফট করল। ‘স্যার, স্পেশালি আপনার জন্য একটা ক্যালেন্ডার। অনেক দিন ধরে আপনি আমাদের দোকানে শপিং করার জন্য শুভেচ্ছাস্বরূপ উপহার।’
‘আমি আপনাদের দোকানে অনেক দিন ধরে শপিং করছি!’ ভদ্রলোকের দুচোখে বিস্ময়।
হাসিমুখে সায় দিল তিলক।
এই পলিসিতে অনেক খরিদ্দারকে সন্তুষ্ট করেছে ও।
‘কী জানি হবে হয় তো! আমি তো গতকালই এই পাড়ায় নতুন ভাড়া বাসায় উঠলাম!’
আরেক দিন এক তরুণী এসে ফেসিয়াল টিস্যু চাইল।
দোকানে ফেসিয়াল টিস্যু নেই।
ম্যানেজারের বুদ্ধি ধার করল তিলক।
‘আপা, ফেসিয়াল টিস্যু তো নেই। আপনি বরং এই টিস্যুটা ব্যবহার করুন। এটি আপনার ত্বককে করবে মসৃণ, কোমল ও নমনীয়।’ বলে টয়লেট টিস্যুর বক্সটা এগিয়ে ধরল তিলক। ঠাস্্ করে ওর গালে চড় বসিয়ে দিয়ে মেয়েটা বের হয়ে চলে গেল।
ভাগ্যিস, ম্যানেজার আজকে নেই!
আর এর চেয়েও খারাপ কিছু ঘটেছে আমার জীবনে—গালে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবল তিলক।
তখন বাসায় বাসায় গিয়ে মার্কেটিং করত ও। ফ্লোর ক্লিনার বিক্রি করাই ছিল ওর উদ্দেশ্য।
ট্রেনিংটা ভালোই পেয়েছিল তিলক। বিক্রিও করেছিল বেশ কয়েকটা। বিপত্তি বাধল একদিন।
নিয়মমতো এক বাসায় ঢুকেই ব্যাগ থেকে বের করে একগাদা গোবর মেঝেতে ছড়িয়ে দিল ও। তারপর বলল, ‘গোবরগুলো যদি আমার এই ম্যাজিক ফ্লোর ক্লিনার মুহূর্তে পরিষ্কার করতে না পারে তাহলে আমি ওগুলো চেটে পরিষ্কার করব।’
‘সাথে কি টমেটো সস দেব?’ মহিলা হাসিমুখে জানতে চাইল।
‘মানে!’
‘বাসায় বিদ্যুৎ নেই তো! তাই গোবরগুলো বোধহয় আপনাকে চেটেই খেতে হবে!’

তিন.
মাইরের মধ্যে ভাইটামিন আছে!
মেয়েটার থাপড় খাওয়ার পর বিক্রিতে দারুণ উন্নতি করল তিলক। ম্যানেজার শফিক হাসান খুশি হয়ে শপের মালিক আশিকুল্যাহ শাহকে রিপোর্ট করলেন। আশিক সাহেব নিজে এই মেগা শপের বিক্রিতে তেমন একটা খুশি ছিলেন না। তিলক নামের এক সামান্য সেলসম্যান দোকানের বিক্রি বাড়িয়েছে শুনে একদিন আগ্রহ সহকারে তাকে দেখতে এলেন।
প্রথমে নিজের পরিচয় না দিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন তিলক কীভাবে বিক্রি করে।
একজন খরিদ্দারকে তিলক প্রথমে বড়শি, তারপর মাছের টোপের খাবার বিক্রি করল। একটু পর একই লোকের কাছে মাছ ধরে ধরে রাখার জন্য একটা ঝুড়িও বিক্রি করল!
আশিকুল্যাহ মুগ্ধ হলেন। একটু পরে তাকে ডেকে পাঠালেন ম্যানেজারের রুমে।
নিজের পরিচয় দিয়ে আশিক বললেন, ‘দেখলাম, তুমি একজনকে অনেক কিছু গছালে! লোকটির কাছে কী বলে বিক্রি শুরু করলে প্রথমে। জাস্ট কৌতূহল!’
তিলক বলল, ‘আসলে স্যার, লোকটি আমার ভায়রা। দুচোখে দেখতে পারি না ওকে। ওর বউ গেছে বাপের বাড়িতে। তাই আমার কাছে এসেছিল গল্প করতে। আমি বললাম, গল্প করতে তো পারব না। আপনি বরং বড়শি কিনে নিয়ে গিয়ে লেকের ধারে বসে মাছ ধরুন। এরপর আমি তার কাছে বড়শি, মাছ ধরার টোপ ও ঝুড়ি বিক্রি করলাম। এরপর স্যার, ওর কাছে বিক্রি করলাম বড় একটা ইলিশ মাছ!’
‘ইলিশ মাছ!’ বিস্ময় যেন বাঁধ মানছে না মেগা শপ মালিকের।
‘হ্যাঁ, স্যার। ওনাকে বললাম, আপা যদি বাপের বাড়ি থেকে এসে আপনার মাছ ধরার গল্প বিশ্বাস না করে তো বলবেন, এই দ্যাখো কত বড় একটা মাছ ধরেছি লেক থেকে। শুধু তা-ই নয়, মাছ যাতে ভেজে খেলে টেস্টি লাগে, সে জন্য বিদেশি একটা সয়াবিন তেলের কনটেইনারও গছিয়ে দিয়েছি, স্যার!’
‘গ্রেট! তুমি তো অসাম সেলসম্যান হে! আজ থেকেই তোমার বেতন পাঁচ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। আর আমার গাড়িতেও একটা বড় ইলিশ মাছ উঠিয়ে দাও’, খুশিতে মাথাটা দুপাশে দোলালেন আশিকুল্যাহ, ‘লেকে বড়শি দিয়ে মাছটা ধরেছি শুনলে তোমাদের ম্যাডাম যা খুশি হবে না! ওর আবার মাছ খুব পছন্দ!’
(বিদেশি গল্প অবলম্বনে)

No comments

Powered by Blogger.