১০০ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে ডেসটিনি by জাহাঙ্গীর শাহ

ডেসটিনি গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো: ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেড ও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড।এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন ৭৩ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছে। এ কারণে গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।


আর ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৩২ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকির তথ্য মিলেছে। এই তথ্য পেয়ে গত বুধবার প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনসহ পাঁচ শীর্ষ শেয়ারধারীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর। এনবিআরে জমা দেওয়া এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বিবরণীর সঙ্গে ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের এই গরমিল খুঁজে পায় এনবিআর। এনবিআর এখন ডেসটিনির অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের বিবরণী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
ইতিমধ্যে ডেসটিনি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের রাজস্বসংক্রান্ত অনিয়ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য এনবিআরের সদস্য (নিরীক্ষা, পরিদর্শন ও তদন্ত) মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের প্রধান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় ইতিমধ্যে ডেসটিনি গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তবে ডেসটিনির সবগুলো প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে আরও সময় লাগবে।
ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড মূলত টেলিভিশন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ল্যাপটপ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, টুথপেস্ট, বিভিন্ন প্রসাধনী, মেডিকেল যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরাসরি বিক্রি (ডিরেক্ট সেল) করে থাকে।
এই প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে এসব পণ্য বিক্রি ও অন্যান্য খাতে ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকা মূসক দিয়েছে। ওই বছর পণ্য বিক্রিবাবদ ৭৫১ কোটি ৩২ লাখ টাকা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা মূসক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্য মূসকের ৩২ কোটি টাকা দেওয়া হয়নি বলে এনবিআরের তদন্তে বেরিয়েছে এসেছে।
অন্যদিকে এ পর্যন্ত ছয় হাজার ২৯৩ একর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৯৪ লাখ গাছ লাগিয়েছে বলে দাবি করছে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেড। প্রতি ১০টি গাছের বিপরীতে ছয় হাজার টাকা করে নিয়েছে গ্রাহকের কাছ থেকে। সেই হিসাবে ৫৬৪ কোটি টাকা আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে সন্দেহজনক বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে—এমন প্রমাণও পাচ্ছেন এনবিআরের তদন্ত কর্মকর্তারা। মূলত যেসব ব্যাংক হিসাব থেকে ডেসটিনির গ্রাহকদের লভ্যাংশ দেওয়ার কথা, সেই সব হিসাবেই লেনদেন বেশি হয়েছে। আর এনবিআরের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এসব ব্যাংক হিসাব থেকে গ্রাহকদের হিসাবে লভ্যাংশ দেওয়ার বাইরে অন্য হিসাবেও বিপুল অর্থ গেছে। এখন এনবিআর তদন্ত করছে—এই অর্থ কোথায় গেছে। প্রতিটি ব্যাংকের হিসাবের লেনদেনের বিপরীতে কত টাকা লেনদেন হয়েছে, তাও পরীক্ষা করছেন কর গোয়েন্দারা।
ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোফরানুল হকসহ ১৪ জন পরিচালক, শেয়ারধারীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এমনকি ডেসটিনির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুই কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করেছে এনবিআর। ১৬ জন পরিচালকের ব্যাংক হিসাব তল্লাশি করা হচ্ছে।
আর ডেসটিনির অনিয়ম তদন্ত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি কমিশন গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.