শিলা আর বৃষ্টি by মাইনুল এইচ সিরাজী

ছোট্ট মেয়ে কুশিয়ারা। তাকে প্রতিদিন ঘুম পাড়াতে হয় নতুন নতুন গল্প বলে। আজও সে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বাবা, গল্প বলো।’ এটা আমার জন্য কিছুটা কষ্টকর ব্যাপার। বই পড়ে না হয় নতুন নতুন গল্প শিখে নেওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কী নিয়ে গল্প বলতে হবে, সেটাও কুশিয়ারা ঠিক করে দেয়।


মাঝেমধ্যে সে এমন সব বিষয় ঠিক করে, গল্প বলতে সত্যিই আমার ঘাম ছুটে যায়। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কিসের গল্প? সে বলল, ‘শিলাবৃষ্টির গল্প বলো।’ যাক বাবা, বাঁচা গেল। বিষয়টা অত কঠিন নয়। তা ছাড়া আজ বিকেলেই শিলাবৃষ্টি হয়েছে। আমরা—বাবা-মা-মেয়ে—তিনজন মিলে জানালার পাশে বসে শিলাবৃষ্টি দেখেছি মজা করে। সেই কাহিনি বর্ণনা করে আজ তাহলে মেয়েকে ঘুম পাড়ানো যাবে।
আমাদের গল্পগুলো শুরু হয় ‘এক দেশে ছিল এক...’ দিয়ে। আমি যথারীতি শুরু করলাম—এক দেশে ছিল একটা বাসা। সে বাসাটায় বাস করত বাবা, মা আর একটা মেয়ে।
‘মেয়েটার নাম কী?’ কুশিয়ারার প্রশ্ন।
আমি বললাম, কুশিয়ারা।
‘না না, হবে না, বাবা। আমাদের গল্প বললে হবে না।’
আমি তো শিলাবৃষ্টির গল্পই বলছি। আজ বিকেলে শিলাবৃষ্টি হয়েছে না? আমরা সবাই মিলে দেখেছি।
‘তা তো দেখেছি। সেটা আবার গল্প হলো নাকি? অন্য শিলাবৃষ্টির গল্প বলো।’
আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম।
‘কী হলো, বলো না।’ মেয়ে তাগাদা দিল।
আমি বললাম, বলছি মা। তুমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করো। আমি তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আবার শুরু করলাম—এক দেশে ছিল এক বাবা। তার দুই মেয়ে। একটার নাম... একটার নাম...। আমি ভাবার চেষ্টা করছি।
‘একটার নাম শিলা, একটার নাম বৃষ্টি।’ কুশিয়ারা আমাকে সাহায্য করল।
আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি ঘুমাও। একটার নাম শিলা, একটার নাম বৃষ্টি। এক বিকেলে বাবা যাচ্ছে বাজারে। ঝড়-বৃষ্টির দিন। ছাতা নিল। ব্যাগ নিল। শিলাকে ডাকল। বলল, কী লাগবে মা? বৃষ্টিকে ডাকল। বলল, কী লাগবে মা? শিলা বলল, ‘আমার জন্য লিচু এনো, বাবা।’ বৃষ্টি বলল, ‘আমার জন্য মিষ্টি এনো, বাবা।’
আচ্ছা আনব। বলে বেরিয়ে গেল বাবা। কিছুদূর যেতেই শুরু হলো ঝড়-বৃষ্টি। এমন ঝড়, ছাতাটা গেল উড়ে। বৃষ্টি পড়ছে...পড়ছে...। তার সঙ্গে পড়ছে শিলাও। থামার নাম নেই। বাবা গিয়ে দাঁড়াল একটা গাছতলায়। ইয়া বড় গোল গোল শিলা পড়ে চারপাশ সাদা হয়ে আছে। এদিকে সন্ধ্যাও হয়ে এসেছে। বাজারে তো আর যাওয়া যাবে না। কিন্তু মেয়েদের লিচু আর মিষ্টির কী হবে? বাবার মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। এক ব্যাগ শিলা নিয়ে ফিরে গেল বাড়ি।
‘বাবা এসেছে, বাবা এসেছে। কী মজা। লিচু এনেছে। মিষ্টি এনেছে। কী মজা।’ শিলা আর বৃষ্টি আনন্দে নেচে উঠল।
ব্যাগ থেকে কয়েকটা শিলা বের করে বাবা বলল, এই নে তোর লিচু।
ব্যাগ থেকে কয়েকটা শিলা বের করে বাবা বলল, এই নে তোর মিষ্টি।
শিলা বলল, ‘লিচু সাদা কেন, বাবা?’
খোসা ছাড়িয়ে এনেছি।
‘লিচু ঠান্ডা কেন, বাবা?’
বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে।
বৃষ্টি বলল, ‘মিষ্টি শক্ত কেন, বাবা?’
দোকানের ফ্রিজ থেকে এনেছি।
‘মিষ্টি পানসে কেন, বাবা?’
বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে।
শিলা আর বৃষ্টি কিন্তু ব্যাপারটা বুঝতে পারল। বুঝতে পেরে মায়ের সঙ্গে একটা গোপন পরামর্শ করে নিল।
বাবা বলল, ভাত খাব, ভাত দাও।
মা এক প্লেট ভাত দিল।
বাবা বলল, ভাত এত ঠান্ডা কেন?
‘ফ্রিজ থেকে দিয়েছি।’
ভাত এত শক্ত কেন?
‘শীতে জমে গিয়েছে।’
ভাত এত পানসে কেন?
‘বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে।’
গল্প শুনতে শুনতে কুশিয়ারা ঘুমিয়ে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে জানতে চাইল, ‘বাবা, গল্পটা কি ওখানে শেষ হয়ে গিয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? সে বলল, ‘ওই যে বাবাকে মা শিলা খেতে দিয়েছিল।’ বললাম, হ্যাঁ। প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, বাবাকে মা শিলা খেতে দিয়েছিল কেন? কুশিয়ারা বলল, ‘বা রে, বাবা যে শিলা আর বৃষ্টিকে ঠকিয়েছে, এ জন্য মা তাকে শাস্তি দিয়েছে।’ আমি তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললাম, বেশ, তুমি তাহলে বুঝতে পেরেছ। লক্ষ্মী মেয়ে। কুশিয়ারা বলল, ‘আচ্ছা বাবা, তুমি কখনো কাউকে ঠকাবে না তো?’ উত্তরের আশায় সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমিও তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর বললাম, না, মা। কাউকে ঠকাব না।

No comments

Powered by Blogger.