ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজারঃ আশ্বাস আর বাস্তবতা দুই মেরুর বাসিন্দা


আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং চীন এখন বিশ্বের দুই দ্রুত সম্প্রসারমান অর্থনৈতিক শক্তি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিচারে ভারত চীন থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে বটে, অনেক দেশের তুলনায় কিন্তু ভারতের এগিয়ে চলা রীতিমত চোখ ধাঁধানো। ভলিউমের দিক থেকে ভারতের জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির কোনো তুলনাই হয় না।
তাই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে বছরের পর বছর বিপুল ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত যদি উদারতা দেখিয়ে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে সব বাংলাদেশী পণ্যকে ভারতীয় বাজারে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের সুযোগ দেয়, তারপরও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতের উদ্বৃত্ত থেকেই যাবে। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা হ্রাস পাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু ইতরবিশেষ ঘটবে না। অথচ এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ছাড় দিতেও ‘বন্ধুত্ব প্রত্যাশী’ ভারত অনিচ্ছুক।

কথা উঠতে পারে, কেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দিল্লি তো বলেই দিয়েছে তারা নতুন করে ৪৭টি বাংলাদেশী পণ্যকে ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেবে। এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ভারত ৪০টি বাংলাদেশী পণ্যকে শূন্য শুল্কে সেদেশে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। এসব তথ্য একনজরে দেখতে ভালোই লাগে। কিন্তু গভীরভাবে নজর দিলে ধরা পড়ে শুভঙ্করের ফাঁকি। এর আগে যেসব পণ্যের ওপর ভারত শুল্ক ছাড় দিয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশ বাংলাদেশে তৈরিই হয় না। আগে দেয়া শুল্ক ছাড়ের তালিকায় রয়েছে কৃত্রিম দাঁত, উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, হেয়ার ডাই ইত্যাদি। এসব পণ্য বাংলাদেশ নিজেই আমদানি করে থাকে। অপরদিকে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, ইলিশ, জামদানি শাড়ি, সিমেন্ট, লোহার রডসহ যেসব পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ সক্ষম, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেয়া দূরে থাকুক, বরং পদে পদে বাধার প্রাচীর গড়ে তুলেছে ভারত। নির্ধারিত শুল্ক ছাড়াও যোগ করা হচ্ছে অতিরিক্ত শুল্ক। ভারতে পণ্য রফতানি করতে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের অন্তত ৭ দফা শুল্কের বাধা টপকাতে হয়। এর ওপর অশুল্ক বাধা তো রয়েছেই। ভারতে সাধারণত যে কোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেসিক ডিউটি বা নির্ধারিত শুল্ক ৯ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু এর সঙ্গে যোগ করা হয় ৫ থেকে ৭ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ৩ থেকে ৪ শতাংশ স্পেশাল সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১৫ থেকে ২০ ভাগ কাউন্টারভেলিং ডিউটি, ৯ থেকে ১৫ শতাংশ স্পেশাল কাউন্টারভেলিং ডিউটি, ১ শতাংশ এডুকেশন ডিউটি এবং ১ শতাংশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডিউটি। এতেও না কুলালে চাপানো হয় অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি। এরপর আছে অশুল্ক বাধা। মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারতীয় কাস্টমসের গড়িমসির শেষ নেই। বিএসটিআই থেকে মান উত্তীর্ণের সার্টিফিকেট দিলেও তারা তা মানতে চায় না। মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার সার্টিফিকেট আনতে হয় দিল্লি থেকে। মূল্য যাচাইয়ের নাম করেও পণ্য ফেলে রাখা হয় স্থলবন্দরগুলোতে। ফলে একটি চালান খালাস করতে কয়েক মাস লেগে যায়।
ভারতে বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে কাগজে-কলমে কোনো বাধা না থাকলেও এসব অদৃশ্য বাধা টপকে বাংলাদেশী পণ্যের ভারতে প্রবেশ কার্যত দুঃসাধ্য। ২০০৭ সালের সাফটা চুক্তির আওতায় ভারত ৮০ লাখ পিস তৈরি পোশাক বাংলাদেশ থেকে বিনা শুল্কে নেয়ার চুক্তি করেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ কোটা পূরণ করা যায়নি ভারতের শুল্ক বিভাগের চাপিয়ে দেয়া বিভিন্ন শর্তের কারণে। বর্তমানে রফতানিকারকরা এ কোটায় ভারতে পোশাক রফতানির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানা গেছে। এভাবে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে ভারত নিজের মুনাফার পাহাড় গড়তে পারবে; কিন্তু এটা ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর অন্তর জয় করার পদ্ধতি হতে পারে না কিছুতেই।

No comments

Powered by Blogger.