মাদকদ্রব্য প্রসঙ্গে ইসলাম by মুফতি মাহফূযুল হক

কাইস বিন আসিম মক্কা শহরের সুশীল অভিজাত ব্যক্তি। গোটা আরব উপদ্বীপে যার মার্জিত আচরণের সুখ্যাতি আকাশচুম্বী। ছেলে-বুড়ো সবাই তাকে ভদ্রতার কারণে সমীহ করে। বন্ধুদের আসরে তাদের উষ্ণ অনুরোধে একদিন তিনি মদপান করেন। তিনি বেসামাল হয়ে পড়েন। আত্মনিয়ন্ত্রণ পূর্ণমাত্রায় হারিয়ে ফেলেন।

এ অবস্থায় বাড়ি ফিরে সামনে পান নিজের মেয়েকে। মেয়ের পেটের ভাঁজের দিকে অশোভন ইঙ্গিত করে কুরুচিপূর্ণ কথা বলা শুরু করে। পিতা এগিয়ে এলে তাকে গালি দিতে থাকেন পথ থেকে লোক ধরে ধরে এনে হাত ভরে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দেন। মাতলামি শেষ হয়ে স্বাভাবিক বিবেক ফিরে পেলে শুভাকাঙ্ক্ষীরা সব ঘটনা তাকে জানায়। চমকে ওঠেন তিনি। অনুতপ্ত হয়ে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আর কখনও মদপান করবেন না।
মদ এভাবে মানুষের বিবেককে সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নেয়। মাতাল মানুষের কাছে অন্যায় বলতে কোনো অভিধান থাকে না। তাই তো আল্লাহ রাসূল (সা.) বলেছেন, 'মদ বর্জন কর। তা সকল অন্যায়ের জননী।' বিবেক বিলোপের কারণে মাতাল মানুষ নিজের অজ্ঞাতসারেই অপর মানুষকে গালি দেয়, গোপন কথা ফাঁস করে দেয়। ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটতে পারে। যদি রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি মদের প্রতি দুর্বল থাকেন। অন্য দেশের গুপ্তচর তাকে মাতাল করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য তার কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তির কাছে গোটা দেশ ও জাতি অনিরাপদ।
মাতাল ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্বকে ধরে রাখতে পারে না। দেখা যায়, সমাজের প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিও যদি মাতাল হয়ে পথে হাঁটতে থাকে, সমাজের যে কেউ এমনকি কিশোর পর্যন্ত তাকে বিদ্রূপ করে। যে কোনো নেশাদ্রব্যই চেহারার সৌন্দর্যকে নষ্ট করে। ত্বকে এক ধরনের রুক্ষতা ফুটে ওঠে, যা মানুষের ভেতরে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে।
মদ প্রতিরোধ ও মাদকাসক্তকে নিরাময় করার গ্যারান্টিযুক্ত একমাত্র কৌশল হলো ইসলাম। পৃথিবীর ইতিহাসে এ অসম্ভব কাজটি একমাত্র করতে পেরেছে ইসলাম। সূরা মায়েদার ৯০নং আয়াতে আল্লাহ মদ পানকে নোংরা কাজ ও শয়তানের কাজ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, শয়তান মদের দ্বারা তোমাদের মাঝে ঝগড়া ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে চায়। আল্লাহর রাসূল (সা.) মদকে অভিশাপ দিয়েছেন। মদ সংশ্লিষ্ট ১০ শ্রেণীর মানুষকেও অভিশাপ দিয়েছেন। যথা_ ১. মদ উৎপাদনের শ্রমিক; ২. উৎপাদনের উদ্যোক্তা; ৩. বহনের শ্রমিক; ৪. সরবরাহ কর্তৃপক্ষ; ৫. বিক্রেতা; ৬. ক্রেতা; ৭. ক্রয়ের আদেশদাতা; ৮. মদপানের আসরের পরিবেশক; ৯. পানকারী; ১০. বিক্রিমূল্য ভোগকারী। রাসূল (সা.) বলেছেন, মদ ও ইমান একত্র হয় না। এ দুটির প্রত্যেকটিই অন্যটিকে ভেতর থেকে বের করে দেয়।
ইমাম কুরতুবী উম্মাহর ইজমা উল্লেখ করেছেন, 'যা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে মানুষ মাতাল হয়ে যায় তা সামান্য পরিমাণে গ্রহণ করাও হারাম।' তিনি হজরত উমর ফারুকের (রা.) উদৃব্দতি দিয়ে মদের পরিচয় দিয়েছেন, যা মানুষের বিবেককে বিলুপ্ত করে তা-ই মদ। মদের বহুমুখী ক্ষতি প্রত্যক্ষ করে যুগে যুগে সব সমাজের সচেতন সৎ মানুষ মদকে না বলেছেন। মহান আল্লাহ স্পষ্ট শব্দে আদেশ করেছেন_ মদ বর্জন কর। তাহলে উপকৃত হবে।
mrmahfuz45@gmai.com

No comments

Powered by Blogger.