সহজিয়া কড়চা-‘ঘৃণা ভালো’ নয়—ভালোবাসা ভালো by সৈয়দ আবুল মকসুদ

আমাদের দেশেই এত সমস্যা এবং লেখার মতো বিষয় এত বেশি যে, আমি কখনো আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করি না। প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা। একটি সমস্যার সমাধান না হতেই আর দুটি সমস্যা হাজির হয়। তবে আমার মতো অভাজন আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে কিছু না লিখলেও অনেক বিজ্ঞ ও বিদগ্ধজনই সেসব নিয়ে লেখেন।


তাঁদের মধ্যে অভিজ্ঞ বিচক্ষণ পেশাদার কূটনীতিকও রয়েছেন। বিশ্বপরিস্থিতির প্রশ্নে তাঁদের কাছে আমার অবস্থান কুয়োর ব্যাঙের মতো। বিদ্যার বহর দিয়ে নয়, জ্ঞানের ব্যাপ্তি দিয়েও নয়, চোখ দিয়ে তাকিয়ে, কান দিয়ে শুনে যেটুকু জানি বা বুঝি, সেটুকুই আমার সম্বল। আমার যেটুকু অবগতি ও জ্ঞানের পরিধি তা ইন্দ্রিয়লব্ধ, বাঁধাই করা মোটা মোটা বই পড়া নয়। কম্পিউটার থেকে প্রাপ্ত নয়, কারণ, ওই যন্ত্র আমি ব্যবহার করতে পারি না। ই-মেইল জিনিসটি কী, তা জানি; ব্লগ, টুইটার প্রভৃতি শব্দ শুনেছি, কিন্তু তা কী, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। খবরের কাগজ চোখ দিয়ে পড়ি, রেডিও-টিভির সংবাদ সামান্য দেখি। তা থেকে যা বুঝি, তা-ই আমার পুঁজি।
আওরঙ্গজেব বা আলিবর্দীর যুগ এখনকার মতো ছিল না, তা সত্ত্বেও তাঁরা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের ধাক্কা খেয়েছেন। আলিবর্দীর নাতির কাছ থেকে ইংরেজরা দেশটাকেই ছিনতাই করে নেয় মীরজাফর-জগ ৎ শেঠদের সহযোগিতায়। দেশ তো গেলই, এ দেশের মানুষের ধর্মটাও চলে যেত যদি ১৮৫৭-তে মহাবিদ্রোহ না হতো। ১৮৪০ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত সময়ে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, কৃষ্ণনগর এবং খাস কলকাতা মহানগরে যে হারে সব শ্রেণীর হিন্দু ও গরিব মুসলমানকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়, তাতে ১৯০১ নাগাদ গোটা ভারতবর্ষ খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পরিণত হতো, ঠিক যেমনটি হয়েছে ফিলিপিন, আজ ৮৫ শতাংশের বেশি খ্রিষ্টান। সিপাহি বিদ্রোহের ধাক্কায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার এবং ক্যাথলিক মিশনারিরা তাঁদের রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। শুধু শাসন ও শোষণ করব—অন্য কিছু নয়।
আমরা গ্লোবালাইজেশনের যুগে বাস করছি। এক দেশের উ ৎপাদিত জিনিসটি যেমন অন্য দেশে যাচ্ছে, এ দেশের সংকট ও সম্ভাবনাও অন্য দেশকে স্পর্শ করে। এ কালের সংঘাতময় পৃথিবীতে কোনো দেশে বড় রক্তপাত ঘটলে তা আর সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় না। তার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। নরওয়ে ছোট শান্ত দেশ। গত ২২ জুলাই নরওয়ের রাজধানী অসলোয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে ও গোলাগুলিতে ৭ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয় এবং একটি দ্বীপে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এক যুব-সম্মেলনে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হয় ৭৮ জন। নরওয়ের সরকার কিছু না বললেও, বিদেশে নরওয়ের বন্ধুরা মুহূর্তের মধ্যে ধরে নেন, এ কাজ নন্দ ঘোষের। অসলোর পুলিশ ও গোয়েন্দারা কোনো তথ্য জানার আগেই ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের পোর্টিকোর নিচে এক বঙ্গসন্তান দৈবক্রমে অবগত হয়ে আমাকে বললেন, এ কাজ মুসলমান জঙ্গিদের।
নরওয়ে কর্তৃপক্ষ বাঙালি প্রগতিশীলদের হতাশ করে জানালেন, এ কর্ম মুসলমানদের নয়, তাদের নিজেদের মানুষের। সাবলীলভাবে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামক ৩২ বছর বয়স্ক এক অজ্ঞাত ব্যক্তি। তিনি পালাননি বা আত্মহত্যা করেননি, ধরা পড়েছেন। সুতরাং ওই হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল। ব্রেইভিক বলেছেন, ‘ঘটনাটি নির্মম, তবে এর প্রয়োজন ছিল।’ যেখানে প্রয়োজনটাই প্রধান, নির্মমতা সেখানে গৌণ।
শ খানেক নরওয়েজিয়ান তরুণ-তরুণীর নিহত হওয়া বর্তমান সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর অন্যতম। নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা জানাই গভীর শোক ও সমবেদনা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উত্তপ্ত মস্তিষ্কের বন্দুকধারীদের গুলিতে প্রায়ই বহু মানুষ হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুলিতে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু নরওয়ের ঘটনাটি সে রকম কিছু নয়। কোনো হতাশাগ্রস্ত মানুষের পাগলামো নয়। এই ঘটনার যিনি নায়ক, তাঁর রয়েছে একটি সুদূর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কঠিন সংকল্প। তিনি একাও নন, তাঁর পেছনে রয়েছে তাঁর মতাদর্শী সংখ্যাহীন। শুধু তাঁর দেশে নয়—অন্য দেশেও। তাঁর রাজনীতি যদি তাঁর নিজের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ছিল না। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ওই নিরপরাধ তরুণ-তরুণীরা নয়, তারা তাঁর লক্ষ্য অর্জনের উপায় মাত্র। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু পৃথিবীর একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়। ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই ধর্মাবলম্বী। ওই ধর্মের অনুসারী ৩০ কোটি মানুষের বসবাস ভারত ও পাকিস্তানে। ওই ধর্মের কয়েক কোটি মানুষ বাস করে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একটি উগ্র ইসলামি দেশ, এখানে অমুসলমানদের কোনো স্থান নেই—এ কথা বহু অর্থ ব্যয় করে, অগণিত সাংবাদিককে দিয়ে লিখিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচার করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে অসংখ্য সেমিনার হয়েছে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, স্পেন ও আমেরিকায়। কিন্তু ইউরোপের বা আমেরিকার খ্রিষ্টান জঙ্গিবাদ ও বর্ণবাদ নিয়ে আমাদের প্রেসক্লাব, সিরডাপ বা ব্র্যাক সেন্টারে বা কোনো পাঁচতারায় কোনো আলোচনা হতে দেখিনি।
সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থীও অস্বীকার করতে পারবেন না, বাংলাদেশে বহু মধ্যযুগপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী রয়েছে। উগ্র ইসলামি মৌলবাদীদের উপদ্রবও অসহ্য। ছোটখাটো জঙ্গিপনাও তাঁরা করছেন বহুদিন থেকে। প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক চারদলীয় জোটের সরকার তাঁদের ব্যবহার করেছে। বিদেশি শক্তিও তাঁদের টাকাকড়ি দেয় ও ব্যবহার করে। বঙ্গীয় মধ্যযুগপন্থীরা নারীর অধিকার এক শ ভাগ হরণ করার পক্ষপাতী। নারীকে পায়ের তলা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে ঢেকে দিতে চাইছেন তাঁরা। গত ১৫ বছরে অনেকটা সফলও হয়েছেন। শুধু মধ্যযুগপন্থী নয়, আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি নেটওয়ার্কের স্থানীয় শাখাও কিছু কম নেই। বাংলাদেশের বিপুল অধিকাংশ সাধারণ মানুষ রক্ষণশীল, কিন্তু তারা মধ্যযুগ ও মধ্যপ্রাচ্যপন্থীদের পছন্দ করে না। বড় দুই দলের আনুকূল্য ছাড়া তারা কোনো দিনই রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ পাবে না। সাঈদী-আমিনীদের অনুসারীরা হপ্তায় হপ্তায় স্টেডিয়াম গেট থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত যতই কুচকাওয়াজ করুন না কেন, বাংলাদেশের মধ্যযুগপন্থীদের নিয়ে বিপদ অমুসলমানদের চেয়ে প্রগতিশীল মুসলমানদেরই বেশি।
মুসলমানমুক্ত ইউরোপ গড়ার লক্ষ্যে নরওয়ের ঘাতক তাঁর আইনজীবীকে জানিয়েছেন, তিনি এখন যুদ্ধে রয়েছেন। তাঁর আইনজীবীর অভিমত, কেউ এ ধরনের আদর্শগত যুদ্ধে থাকলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়। আমাদের মরহুম বাংলা ভাইয়েরা যদি এ ধরনের একজন আইনজীবী পেতেন, তাহলে তাঁদের মরতে হতো না।
গণহত্যা ঘটানোর আগে ইন্টারনেটে ঘাতক এক হাজার ৫১৮ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন। তার শিরোনাম: ‘2080: A Eu ৎopean Decla ৎation of Independence’। তাতে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতনকামী আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রশংসা করেছেন। ইশতেহারে বলা হয়, তাঁর সংগঠন জাস্টিসিয়ার নাইটস সাধারণভাবে ভারতীয় হিন্দুদের সনাতন ধর্ম আন্দোলন ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন করে। তিনি বলেন, ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতীয় সাংস্কৃতিক ‘মার্ক্সিস্টদের’ হাতে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদীদের মতো একই যন্ত্রণা ভোগ করছেন।
ব্রেইভিক তাঁর ভবিষ্য ৎ সংগঠন জাস্টিসিয়ার নাইটসের রোডম্যাপ ঘোষণা করে বলেছেন: কালচারাল মার্ক্সিস্টদের ধ্বংস করতে সংগঠনটি সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের সূচনা করবে। ভারতের ক্ষমতাসীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) সমালোচনা করে ব্রেইভিক বলেন, এ সরকার মুসলমানদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত রয়েছে। খ্রিষ্টান মিশনারিরা নিচু জাতের হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছে, অন্যদিকে কমিউনিস্টরা হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করতে চাইছে। মুসলমানদের ওপর হামলাকারী হিন্দু সংগঠনগুলোর প্রশংসাও করেছেন ব্রেইভিক। সংগঠনের ব্যাজও ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে তৈরি করিয়েছিলেন ব্রেইভিক। [সমকাল, ২৭ জুলাই]
এই প্রসঙ্গে পোপ দ্বিতীয় জন পলের একটি কথা স্মরণ করা যায়। তিনি ভারত সফরকালে কেরালায় পৌঁছে বলেছিলেন, খ্রিষ্ট-পরবর্তী প্রথম সহস্রাব্দে খ্রিষ্টধর্ম ইউরোপে প্রতিষ্ঠা পায়, দ্বিতীয় সহস্রাব্দে আফ্রিকা ও আমেরিকায় এবং আগামী তৃতীয় সহস্রাব্দে তা এশিয়ায় প্রতিষ্ঠা পাবে। তাঁর ওই বক্তব্য ভারতে সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পরে তিনি তা থেকে সরে আসেন। ভারতে দরিদ্র হিন্দুদের, মুসলমানদেরও ব্যাপকভাবে ধর্মান্তর করা হচ্ছে। সে ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ক্ষোভ রয়েছে। তা সত্ত্বেও ওডিশায় খ্রিষ্টান যাজককে সপরিবারে পুড়িয়ে মারা হলে সেখানকার প্রগতিশীল হিন্দুরা তীব্র নিন্দা জানান। কিন্তু ধর্মান্তর থেমে নেই। বাংলাদেশেও চলছে।
একটি কথা বলা দরকার। খ্রিষ্টধর্মকে মুসলমানেরা খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। যিশুখ্রিষ্টকে মুসলমানেরা হজরত ঈশা আলাইহিস সালাম বলে সম্বোধন করেন। যার অর্থ হলো—যিশুখ্রিষ্টের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের দেশে সাধারণত মিলাদ মাহফিলেও আমি বহু আলেমকে মোনাজাতের সময় হজরত ঈশার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করতে দেখেছি। বাঙালি মুসলমানেরা এ কাজ করেন, অন্য দেশের মুসলমানদের কথা জানি না।
আজ ইউরোপের দেশে দেশে ইতালি থেকে স্পেন পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসীবিরোধী এক চরম ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। তাদের বক্তব্য: ইসলাম কোনো ধর্মই নয় এবং মুসলমানেরা গত ৫০ বছরে আমাদের অনেক খেয়েছে, এখন তাদের কাছ থেকে সেসব আদায় করে তাদের তাড়িয়ে দিতে হবে। প্যারিসের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেছেন, ‘এই ঘটনা ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী আবহের অংশ। এটি এমন এক দর্শনজগতের অংশ, যা থেকে ব্রেইভিকের মতো মানুষ প্রেরণা পাচ্ছে।’
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইউরোপে যখন শ্রমিকের অভাবে অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তখন এশিয়া থেকে অভিবাসীদের জামাই আদরে ডেকে নেওয়া হয়। তখন ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলো থেকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী ইউরোপে গিয়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিরাট অবদান রাখেন। আজ তাঁদের তাড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে।
পশ্চিমের খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের মূলনীতি হলো: hate is good—ঘৃণা ভালো। এবং সে ঘৃণাটা আর কাউকে নয়, ইসলাম ও মুসলমানকে। মুসলমানদের প্রতি যারা বন্ধুভাবাপন্ন, তাদেরকেও ঘৃণা করতে হবে। তাদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে হবে। সে জন্যই উটোয়া দ্বীপে উদারপন্থী লেবার পার্টির যারা নিহত হয়েছে, তারা সবাই খ্রিষ্টান বা ইহুদি।
ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যাঁরা কাজ করবেন, পশ্চিমে তাঁরা পাবেন রাজা বা সম্রাজ্ঞীর সম্মান। এশিয়া আফ্রিকার জননেতা ও রাষ্ট্রনায়কেরা রাষ্ট্রীয় সফরে গেলেও কাগজে কভার পান না। প্রচার পান তসলিমা নাসরিন। তাঁকে দেওয়া হয় শেক্সপিয়ার ও গ্যেটের চেয়ে বেশি প্রচার। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে পশ্চিমারা যে সম্মান দিয়েছেন, তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ রবীন্দ্রনাথ পেলে বর্তে যেতেন। মানবজাতির ইতিহাসে এত সাহিত্য ও শান্তি পুরস্কার আর কোনো মানুষ বা মানুষী পাননি। নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে তিনি পেয়েছেন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা। ফরাসি দেশ আর এক কাঠি বেশি। সেখানে পেয়েছেন ‘রাষ্ট্রপতির মর্যাদা’র সিকিউরিটি। মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলামকে গালাগালের পুরস্কার।
সাম্রাজ্যবাদীদের নীতি চিরকাল দ্বিমুখী। অর্থনীতিতে তাঁরা বিশ্বায়ন পছন্দ করেন। রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁরা বৈশ্বিক সৌভ্রাতৃত্ব চান না। তাঁরা othe ৎ featu ৎed people বা অন্য রকম চেহারার মানুষদের ঘৃণা করেন। কালো, বাদামি ও অন্য রঙের মানুষের ধর্ম যা-ই হোক—হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান—তারা ঘৃণ্য। যদিও তাদের উ ৎপাদিত তরিতরকারি ফলমূল খাবেন মনের সাধ মিটিয়ে পেট ভরে। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ অপহরণ করবেন অবাধে। তবু তারা ঘৃণার পাত্র।
বৈজ্ঞানিক সাধনা ও যুক্তিবাদিতা পশ্চিমকে আজ উন্নতির এই স্তরে নিয়ে এসেছে। একদিন ভারত, চীন, মিসর, মেসোপটেমিয়া (ইরাক) ছিল আলোকিত ভূখণ্ড। আরবদের থেকে শিখে আলোকিত হয়েছে ইউরোপ। জন্ম দিয়েছে রেনেসাঁর। অষ্টাদশ শতকে জ্ঞানবিভাসিত যুগের—এনলাইটেনমেন্টের। বুদ্ধি ও বল প্রয়োগে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা মধ্যপ্রাচ্য, হিন্দুস্তান, চীন প্রভৃতি ভূখণ্ড দখল করেছিল, যেমন এখন দখল করেছে আফগানিস্তান ও ইরাককে। দখলের পাঁয়তারা চলছে লিবিয়া ও অন্য দেশ। অন্য রকম মানুষদের ঘৃণা করা ও দেশ দখল করা—একই পরিকল্পনার দুই দিক। বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ একই সুতায় গাঁথা। এ পরিস্থিতিতে আমাদের মতো দেশেরও করণীয় রয়েছে। লাখ লাখ বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূূত মানুষ পশ্চিমে বাস করে। তাদের ভবিষ্য ৎ নিয়ে ভাবা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। অসাম্প্রদায়িক মহাজোট সরকারকে এ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে অনুরোধ জানাই।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.