তত্ত্বাবধায়ক : রত্নতিলক, না কলঙ্ক স্মারক? by এস এম আব্রাহাম লিংকন

বিএনপি-জামায়াত চাইলেও দেশের ব্যবসায়ীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে না রাখার দাবি তুলেছেন, যাঁদের অনেকেই বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতের আদর্শের, যাঁদের কেউ কেউ সরাসরি কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির বেআইনি ঘোষণার বিপক্ষে নিশ্চয়ই রাজপথে বেশ শক্ত অবস্থান


নিতেন। কারণ ১৯৯৬ সালে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তিনি জোরদার আন্দোলন গড়ে খালেদা জিয়াকে বাধ্য করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু করতে। খালেদা জিয়া ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী দলবিহীন সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই নিজ স্বার্থ সংরক্ষণে এ পদ্ধতি গ্রহণ করেন, যা সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ৫৮(খ) থেকে ৫৮(ঘ) অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে। ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির তাত্তি্বক স্রষ্টা শেখ হাসিনা। আর খালেদা জিয়া তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ পদ্ধতির জন্মদাত্রী মাত্র।
খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গ্রহণ অনেকটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকারে অবাঞ্ছিত সন্তান জন্মদানের মতো ঘটনা। শেখ হাসিনার সফলতা আজকে তাঁর দাবি খালেদা ও বিএনপি-জামায়াতের মুখে মুখে। পরিস্থিতি এমন যে সংবিধানে 'বিসমিল্লাহ' বা 'রাষ্ট্রধর্ম' না থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকতেই হবে। অথচ এক দিন রাজপথে শেখ হাসিনা যখন চিৎকার করে বলেছেন, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই, উত্তরে খালেদা জিয়া ব্যঙ্গ করে বলেছেন, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। সেই খালেদা জিয়া আজ নিরপেক্ষতার দাবিতে তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে।
বিএনপি বিচারপতি কে এম হাসানের মতো একটি ইস্যু বানাতে চাইছেন। তাঁদের আপত্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দেশের সফলতম বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে নিয়ে। বিষয়টি এখন পতিত। কেননা আদালতের রায়ের মাধ্যমে খায়রুল হক নিজের প্রতি নিজেই বাধা আরোপ করেছেন। শুধু নিজেকে নন, ভবিষ্যতে যাতে কোনো বিচারককে এই মলিন দায়িত্ব পালন করতে না হয়, সেই সিদ্ধান্তও দিয়েছেন। তাহলে খায়রুল হককে মানা-না মানার প্রশ্ন কেন? পৃথিবীর সব দেশের আইন হচ্ছে_আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল না হলে নিম্ন আদালতের রায়ই চূড়ান্ত। দেশের উচ্চ আদালত যখন সিদ্ধান্ত দেন, তা সরকার ও রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান_সবার জন্য বাধ্যতামূলক। আমাদের সংবিধানের প্রথম ভাগের অনুচ্ছেদ ৭(১)-এ বলা আছে, 'কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।' তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আমাদের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী ছিল বলেই উচ্চ আদালতে বেআইনি ঘোষিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতাকে বামফ্রন্ট চুলের মুঠি ধরে মহাকরণ থেকে বের করে দিয়েছিল। মমতার লড়াইয়ের প্রধান প্রতিপক্ষ বামফ্রন্ট। তিনি বিজেপিকে বিশ্বাস করতেন, তবু বামফ্রন্টকে নয়! সেই মমতাই কিন্তু বামফ্রন্টের অধীনে নির্বাচন করেছেন_একবারও টু শব্দ করেননি। এ মূল্যবোধ আমাদের রাজনীতিকদের ধারণ করতেই হবে। পারস্পরিক অবিশ্বাস সব সময়ই শত্রুকে গণতন্ত্র হরণের সুযোগ দিয়েছে। নিজেদের আস্থাহীনতা দূর করতে হবে। দিনকয়েকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের রত্নতিলক নয়, আমাদের কলঙ্কের স্মারক। ভুলে গেলে চলবে না, তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেষ কিস্তিতে রাজনীতিক-ব্যবসা-য়ীদের কী বারোটা বাজিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক ম্যালেরিয়ার কুইনিন হতে পারে, কিন্তু সেই কুইনিন সারাবে কে?
লেখক : আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রনেতা
lincoln_bd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.