প্রতিক্রিয়া-সাতাত্তরের গণফাঁসি ও ইতিহাসের দায় by জায়েদুল আহসান

কর্নেল তাহের হত্যা দিবস উপলক্ষে মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের একটি বক্তব্য তিন পর্বে প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। অপেক্ষায় ছিলাম এর প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখার জন্য। লিফশুলজ ৩৫ বছর ধরে বলে আসছেন, জেনারেল জিয়া কর্নেল তাহেরকে বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন।


এবার তিনি আরও একটি অভ্যুত্থান নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। বলেছেন, জিয়ার আমলে শত শত সৈনিককে বিচারের নামে হত্যা করা হয়েছিল। মূলত তিনি সাতাত্তরের অক্টোবরের অভ্যুত্থানের কথাই বলেছেন। লিফশুলজ সত্তরের দশকে সেনাবাহিনীর মধ্যকার অন্তর্ধান ও অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ, সত্য ও বিচার কমিশন গঠন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন।
আশা করেছিলাম, কোনো না কোনো মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী, কলাম লেখক বা নাগরিক সমাজের কেউ যাঁরা ন্যায়বিচারের কথা বলেন বা যাঁরা সরকারকে নানা রকম কমিশন গঠনে বাধ্য করে থাকন, তাঁরা লিফশুলজের এই আহ্বানে কোনো না কোনোভাবে সাড়া দেবেন, কোথাও না কোথাও একটা প্রতিধ্বনি তৈরি হবে। কিন্তু আমাকে হতাশ হতে হয়েছে। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি হবে, যত দিন বাঙালি জাতি থাকবে; তাহের হত্যাকাণ্ড নিয়েও লেখালেখি হবে, যত দিন তাঁর অনুসারীরা থাকবেন। কিন্তু সাতাত্তরের সেই অভ্যুত্থান নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে না। এর কারণ বোধ হয় ওই ঘটনায় যে শত শত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, তাঁরা সাধারণ সৈনিক। তাঁরা কেউ জেনারেল ছিলেন না। ইতিহাসের ওই অধ্যায়ের ব্যাপারে আমরা যেন দায়হীন।
সেনাবাহিনীর মধ্যকার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের জন্য নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবিটা সবার আগে এ দেশেরই কারও কাছ থেকে উচ্চারিত হতে পারত অথবা দাবি ওঠার আগেই কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত ছিল, এত দিনে নিজ উদ্যোগে ন্যায়বিচার কমিশন গঠন করে প্রকৃত সত্য বের করে জনসমক্ষে তা প্রকাশ করা। সেই দাবি তুলেছেন একজন বিদেশি সাংবাদিক। তাই বিএনপি অভিযোগ করেছে, জিয়াউর রহমানের চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে সরকার একজন বিদেশি সাংবাদিক ভাড়া করেছে। আর এ কারণেই হয়তো এ দেশের কোনো কলমযোদ্ধা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর রক্তাক্ত অধ্যায় নিয়ে আলোকপাত করেননি। পাছে তাঁরা বিএনপির বিরাগভাজন হন।
এটা সবার মনে রাখা উচিত যে ইতিহাসের সত্য অনন্তকাল চাপা পড়ে থাকে না। কোনো না কোনো পথ বেয়ে সেটা একদিন ওপরে উঠে আসে। এত দিন কেউ ওই দিনগুলোর অবগুণ্ঠন খুলে ফেলার চেষ্টা করেননি বলেই ৩০-৩৫ বছর আগে সেনানিবাসের ভেতরে কী ঘটেছিল, তা এখনো আলোচনা ও গবেষণার বিষয়। যদি সে সময়ের ঘটনাগুলো আড়াল করা না হতো, বিচারে ও তদন্তে স্বচ্ছতা থাকত, তবে আজ এত কথা হতো না। লিফশুলজ তাঁর বক্তব্যে আমার লেখা বই থেকে নানা তথ্য উদ্ধৃত করেছেন। বইয়ের অনেক অধ্যায়ই ১৯৯৭ সালে ভোরের কাগজ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। লিফশুলজ আমার সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপচারিতার কিছু অংশও তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্য যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার জন্য আমার বই রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি থেকে বারবার উদ্ধৃতি টেনেছেন। এই লেখার আগেই লিফশুলজের বাংলাদেশে আগমন ও তাঁর বক্তব্যের সূত্র ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার লিফশুলজের ওপর খেপেছেন, তাঁর বক্তব্যে দুরভিসন্ধির গন্ধ পেয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্ব জানে কি না জানি না, সাতাত্তরের সেই অভ্যুত্থানের কারণেই জেনারেল জিয়া রাজনৈতিক দল গঠনে তৎপর হয়েছিলেন। বিএনপির জন্মের পেছনে সেই অভ্যুত্থানটির ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী। এই লেখায় সেটার বিশদ আলোচনা সম্ভব নয়। তবে তারা এটুকু নিশ্চয়ই মানবে, সত্য উন্মোচনে অথবা ইতিহাসের অন্ধকার দিক উদ্ঘাটনে কাউকে ভাড়া করতে হয় না। আমার লেখা বই কিংবা লরেন্স লিফশুলজের লেখায় বিএনপির নেতাদের সংশয় যদি কিছুতেই না কাটে, তবে তাঁরা পড়ে দেখতে পারেন তাঁদেরই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, একসময়কার আইনমন্ত্রী, জেনারেল জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়ে পরে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা বই ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অবডেভেলপমেন্ট (Democracy and the Challenge of Developmet)। এ বইয়ে মওদুদ আহমদ জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বয়ান তুলে ধরেছেন। বইটিতে সাতাত্তরের অক্টোবরের ঘটনা প্রসঙ্গে বিএনপির প্রথম সারির এই নেতা লিখেছেন, ‘বিদ্রোহের সময় সংঘটিত সংঘর্ষে প্রায় ২০০ লোক নিহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল ১১ জন বিমানবাহিনীর অফিসার ও ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি। এ সময় জিয়া ও তার সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয় এবং সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থিত তার বাসভবনে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। অবশেষে জিয়ার অনুগত সৈন্যরা বিদ্রোহ দমন করে। ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থান দেশের বিমানবাহিনীকে পঙ্গু করে দিয়েছিল, কেননা ভিকটিমদের বেশির ভাগই ছিলেন বিমানবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কয়েকটি ভারতীয় পত্রপত্রিকা ভুলক্রমে এই খবর প্রচার করেছিল যে, অভ্যুত্থানটি অন্যান্য সেনানিবাসেও ছড়িয়ে পড়েছিল, তবে ঢাকার ঘটনার সূত্র ধরে কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল বটে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘তবে এখানেই এর ইতি ঘটেনি। অভ্যুত্থানে যারা অংশ নিয়েছিল, জিয়া তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত এবং নির্দয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানানো হয়েছে, ৪৮৮ জন সেনা কর্মকর্তার সংক্ষিপ্ত বিচার করা হয়েছিল এবং তাদের হয় গুলি করে, নয়তো ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল; প্রায় ৫০০ জন কর্মস্থলে ফিরে আসেনি বা ভয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছিল। আরও সহস্রাধিক লোককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। যাকেই সন্দেহ হয়েছে, সেটা সেনাবাহিনীর লোক হোক বা না হোক, জিয়া তার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। গুজব রটেছিল, সেনাবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন, যা জিয়ার মধ্যে ভীষণ অস্বস্তির জন্ম দেয়।’
বিএনপির নেতৃত্ব কী বলবে, জেনারেল জিয়াউর রহমানকে কালিমালিপ্ত করতে ব্যারিস্টার মওদুদকেও ভাড়া করা হয়েছে? মওদুদ ১৯৯৫ সালে যখন তাঁর বইটি প্রকাশ করেন, তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল।
সত্তরের দশকের মধ্যভাগে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যখন খুনোখুনির ঘটনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছিল, বিনা বিচারে কারাগারগুলোতে প্রতিরাতে ৮-১০ জন করে ফাঁসি দিয়েও যখন তথাকথিত বিদ্রোহীদের শেষ করা যাচ্ছিল না, তখন ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে সৈনিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে রাষ্ট্রের সব কলকবজা ব্যবহার করা হয়েছে। এর ২০ বছর পর কুয়াশাবৃত সেই সময়টার স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে নেমে সে সময়কার প্রায় সব সেনা ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলাম আমি। অনেকেই তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন, আবার অনেকেই মুখ খুলতে রাজি হননি। ঘটনার সময় জেনারেল এরশাদ ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান, পরে যিনি একজন রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন। তাঁর কাছে বারবার ধরনা দিয়েও সে সময়কার কোনো তথ্য পেতে ব্যর্থ হয়েছি। সম্প্রতি তাঁর একটি চিঠি আমার হাতে এসেছে। চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন তাঁর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের উদ্দেশে, জেলে বসে। সদ্য পতিত স্বৈরশাসক হিসেবে তখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁর সামনে। ইংরেজি ভাষায় সেই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘...৫০০ জন সিপাইকে জিয়া ফাঁসি দিয়েছেন...এক একটা ফাঁসির বিচার হয়েছে পাঁচ মিনিটে।’
জেনারেল এরশাদের এই চিঠির কথা উল্লেখ করলাম লিফশুলজের ন্যায়বিচার কমিশন গঠনের আহ্বানের কার্যকরতা রক্ষার সময়সীমা কত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে সেটা বোঝানোর জন্য। সাতাত্তরের সেই বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব ছিল তৎকালীন নবম ডিভিশনের অধিনায়ক জেনারেল মীর শওকত আলীর। তিনি কিছু তথ্য দিয়ে গেছেন। এখন তিনি আর বেঁচে নেই। সেই সময়কার সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো বেঁচে আছেন। অনেক তথ্যই তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হতে পারে। তাঁরা নিজেরা সত্য প্রকাশের দায় বোধ করতে পারেন। কমিশন হোক বা না হোক, স্বপ্রণোদিত হয়েও তাঁরা এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারেন।
সাতাত্তরের নির্মম সেনা হত্যাকাণ্ডের আরও বিশদ অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রয়োজন। সেটা প্রয়োজন শুধু ইতিহাসকে অন্ধকারমুক্ত করতেই নয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেও। আর এই কাজে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারেন সেই সব সামরিক কর্মকর্তা, যাঁরা ঘটনাটি কাছ থেকে দেখেছেন বা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জায়েদুল আহসান: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দেশ টিভি।

No comments

Powered by Blogger.