ইরান আক্রমণের যৌক্তিকতা কী?-আন্তর্জাতিক by এম আবদুল হাফিজ

কিছু কিছু পর্যবেক্ষক এমনও মত পোষণ করেন যে, ইরান ইতিমধ্যেই কিছু পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। এ কথা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তো সমগ্র অঞ্চলজুড়ে ধ্বংসলীলা শুরু হবে। অন্তত আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে। পর্যটক এবং বিনিয়োগকারীরা সফররত দেশ থেকে প্রথমে পালিয়ে যাবেন।


আরব ভূখণ্ডের রাস্তাঘাটে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়বে_ আরও একটি মুসলিম রাষ্ট্র পশ্চিমাদের পদদলিত হলো। এর থেকে ফায়দা লোটার সুযোগ হবে চরমপন্থি ইসলামী সংগঠনগুলোর, যারা এই যুদ্ধের ডামাডোলে নিজ স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় প্রবৃত্ত হবে। জটিল হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কোনো সমীকরণ


বিগত কিছু দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ পরিচালনা নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। এ বিষয়ে The Haaretz -এর জনমত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী শতকরা প্রায় একচলি্লশ ভাগ ইসরায়েলি এটিকে একটি যুক্তিসঙ্গত উত্তম আইডিয়া আখ্যায়িত করেছে। ইসরায়েলি সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পৃষ্ঠা উত্তেজক হেডলাইনে পূর্ণ, যার মর্মার্থ_ অচিরেই এমন একটি আক্রমণ সম্ভব। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংবাদ এই যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু স্বয়ং তার মন্ত্রিসভার কাছ থেকে ইরান আক্রমণের অনুমোদন লাভে সচেষ্ট। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজও একই রকম উগ্র।
তার কথায়, দেখেশুনে প্রতীয়মান হচ্ছে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতের খুব কাছাকাছি পেঁৗছেছে। কিন্তু তা অস্তিত্বে আসার আগেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, তারা যেন তাদের দায়িত্ব পূর্ণ করতে ব্রতী হয় এবং সেটা কঠোর অবরোধ আরোপ বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হবে, তা তাদের বিবেচ্য। তবে ইসরায়েল বিগত চার বছর ধরে মাঝে মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রপ্রাপ্তির সম্ভাব্যতা এবং বিপদ নিয়ে প্রচুর হৈচৈ করেছে। আসলেই ইসরায়েলের ইরানবিরোধী ভীতি এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে, তা এখন কল্পকথায় বর্ণিত নেকড়ে বাঘ আক্রান্ত রাখাল বালকের চিৎকারের মতো শোনায়। কিন্তু এ পর্যায়ে ইসরায়েলের চিৎকারকে এত সহজে উপেক্ষা করা যাবে না। এমন উপলব্ধি অকারণ নয় এবং তা কিছু পরিপ্রেক্ষিতের বিপরীতে দেখলে স্পষ্ট হয়।
প্রথমেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শপথ ভঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। ওবামার শপথ ছিল, তিনি ইরানি নেতাদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় দেশটিকে এনগেজ করবেন। তিনি তা করেননি। এতে বোঝা যায়, তিনি যে কারণেই হোক তার প্রতিজ্ঞা থেকে সরে এসেছেন। এই সরে আসাটা আরও প্রমাণ করে, ওবামা তার ইতিপূর্বেকার উদার আদর্শ আমেরিকা-ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির যজ্ঞবেদিতে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। যদিবা তাকে কাঙ্ক্ষিত দ্বিতীয় মেয়াদটি হারাতে হয়! তবে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদ হাসিল করতে না পারলেও তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী সম্ভবত ইরান আক্রমণের অনুমোদন দেবেন এবং তিনি হয়তো ওবামার মতো দ্বিধাদ্বন্দ্বে না থেকে খোলামনেই তা করবেন।
টেক্সাসের গভর্নর এবং রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রিক পেরি বলেছেন, উন্মাদ কোনো ব্যক্তির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র যেতে পারে না। রিক পেরি স্পষ্টতই ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেই বুঝিয়েছেন। তেমনটি হওয়ার আগে আমরা সর্বতোভাবে ইসরায়েলকে তা ঠেকাতে সাহায্য করব এবং প্রয়োজনে সামরিকভাবেও সহযোগিতা করব। উতাহ অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর এবং আরেকজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হান্টসম্যান বলেছেন, আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) অবশ্যই একটি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারব না।
আজকের যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল সমর্থক ও ইরানবিরোধী হওয়ার মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এ প্রতিযোগিতায় ইসরায়েল সমর্থকদের পাল্লাই ভারী। আসলে সম্ভবত এক সিরিয়া ছাড়া কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা নাকি পারমাণবিক বোমাসজ্জিত ইরানের আবির্ভাবে খুশি হবে। তবে সবচেয়ে অখুশি হবে গালফ কো-অপারেশন (GCC) কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো। শিয়া ইরান এবং সুনি্ন-GCC দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান স্নায়ুযুদ্ধ কারও অজানা নয়। তা ছাড়া ইরানের পারমাণবিক রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ বড়জোর পারমাণবিক পাকিস্তান বা উত্তর কোরিয়ার চেয়ে বেশি হুমকির কারণ হবে না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ইসরায়েল কিন্তু এমন ধারণার সঙ্গে একমত নয়। তেল আবিব ইরানকে শুধু একটি প্রচণ্ড হুমকির উৎস হিসেবেই ভাবে না; পারমাণবিক ইরান ইসরায়েলিদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি বলে মনে করে। সুতরাং ইসরায়েলি রাজনীতিকরা দল-মত নির্বিশেষে এ বিপদকে রুখতে যে কোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবেন। ইসরায়েল সম্প্রতি জেরিকো-৩ নামে তার প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালাস্টিক মিসাইলের (ICBM)সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। দূরপাল্লার এ মিসাইল সাত হাজার কিলোমিটার দূরত্বের টার্গেটে আঘাত হানতে পারে।
পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রটির অংশগ্রহণে ইসরায়েল ইতিমধ্যেই ইতালির বিমানবাহিনী এবং ন্যাটোর কিছু সদস্যরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে ন্যাটোর সমরশৈলীর আস্বাদ পেতে।
ইসরায়েলের সমর প্রস্তুতির এখানেই শেষ নয়। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেন তার রয়্যাল নেভির কিছু জাহাজ ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিনিদের আক্রমণে সহযোগিতায় প্রস্তুত করে রেখেছে। এসব সংবাদ আসলেই আক্রমণের উদ্দেশ্যেই, না একটি সম্মিলিত ধান্ধা, তা কিন্তু জানা যায়নি। ইসরায়েলি কলামিস্ট এবং পিস অ্যাকটিভিস্ট উরি অ্যাভনারি বিশ্বাস করেন, এটা ধান্ধাই, যা ইরানকে দ্বিধার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখার জন্য করা হয়েছে। অ্যাভনারির ধারণা, ইসরায়েল ইরান আক্রমণ করবে না। বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক মহলের সংখ্যাগরিষ্ঠরাও তাই মনে করেন। কেননা এমন একটি আক্রমণে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় আক্রমণকারীর জন্যও অচিন্তনীয়। ইরানের রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সখ্য গভীর। উভয়েরই ইরানের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্যিক চুক্তি আছে। তারা বসে বসে এ চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত হওয়া দেখতে চাইবে না। যে কোনো পন্থায় সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ঠেকিয়ে তারা একটি কূটনৈতিক নিষ্পত্তির পথ খুঁজবে।
চীন-রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ছাড়া ইরান অবশ্যই কোনো মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণের প্রথম প্রহরেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে এবং তখন হু-হু করে বাড়তে থাকবে জ্বালানির মূল্য, যার দুর্ভোগ পোহাতে হবে মার্কিন জনগণকেও। উপসাগরস্থিত মার্কিন স্বার্থেও আঘাত হানবে ইরান। তবে ইরানের প্রধান টার্গেট হবে ইসরায়েল। খুব সম্ভব ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ এবং হামাসও রকেট-বৃষ্টি বর্ষাতে থাকবে ইসরায়েলি শহর ও জনপদে।
কিছু কিছু পর্যবেক্ষক এমনও মত পোষণ করেন, ইরান ইতিমধ্যে কিছু পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। এ কথা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তো ওই অঞ্চলজুড়ে ধ্বংসলীলা শুরু হবে। অন্তত আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে। পর্যটক এবং বিনিয়োগকারীরা সফররত দেশ থেকে প্রথমে পালিয়ে যাবেন। আরব ভূখণ্ডের রাস্তাঘাটে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়বে_ আরও একটি মুসলিম রাষ্ট্র পশ্চিমাদের পদদলিত হলো। এর থেকে ফায়দা লোটার সুযোগ হবে চরমপন্থি ইসলামী সংগঠনগুলোর, যারা এই যুদ্ধের ডামাডোলে নিজ নিজ স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় প্রবৃত্ত হবে। জটিল হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কোনো সমীকরণ।
সে যা-ই হোক, যতক্ষণ আক্রমণকারীরা বিপুল সংখ্যায় ভূমিভিত্তিক সৈন্য ইরানে না নামাতে পারবে; ইরান আরও দৃঢ়সংকল্প হবে, তার পরমাণু অস্ত্র অস্ত্রাগারে আনার লিপ্সা করবে। সেটাই হবে তার সর্বশেষ অপশন। অর্থ সংকটে নিপতিত মন্দাক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো আর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রাক্কালের অবস্থানে নেই। তাই তারা আর ইরানবিরোধী যুদ্ধে আগের মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে না। তারা আর দীর্ঘমেয়াদি কোনো দখলদারিত্ব সামলাতে অক্ষম। হিংস্র জানোয়ারের খাঁচায় খোঁচাখুঁচি করে শুধু খাঁচায় আবদ্ধ জন্তুটিকে আরও হিংস্রতর করা যায়। তাকে পোষ মানিয়ে কোনো ফায়দা হাসিল করা যায় না।
তবে ইরান কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পেশি প্রদর্শনকে হাল্কাভাবে নিচ্ছে না। ইরানের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান হাসান ফিরোজাদেহ্ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো আক্রমণকারীকে কঠিন মূল্য দিতে বাধ্য করা হবে। আমরা শুধু দেখার অপেক্ষায় আছি, ইসরায়েলের পশ্চিমা স্তাবকরা এ কথা বিবেচনায় রাখে কি-না যে, সেই মূল্য দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত!
ুুুুু
ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ :সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.