ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধ

ফরমালিন মেশানো খাদ্যের কারণে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য বহু আগে থেকেই হুমকির সম্মুখীন। সাধারণত মৃতদেহ সংরক্ষণ কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ফরমালিন ব্যবহৃত হয়; কিন্তু বাংলাদেশে তা অবলীলায় মাছ-মাংস, শাকসবজি ও ফলমূল তরতাজা দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কেমিক্যালটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।


খাদ্যে ভেজালের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা বিষয়টি খুব ভালভাবে জানে; কিন্তু তারা জেনেশুনে দেশের অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই খাদ্যে ফরমালিন ও রাসায়নিক মেশনোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি মানুষের বহুদিনের। কারণ এর ফলে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ নানা ধরনের জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। যাই হোক, দেরিতে হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশে অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সরকারের জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে তার অপেক্ষায় রয়েছে জনগণ। বস্তুত বাংলাদেশে গত দু-তিন দশক ধরে ফরমালিন এমন সহজপ্রাপ্য হয়ে উঠে যে, ছোট-বড় প্রতিটি অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে ফরমালিন মেশানোর বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। রাজধানীর অভিজাত সুপার মার্কেট থেকে শুরু করে গাঁয়ের প্রত্যন্ত হাটবাজারে বিক্রি হতো ফরমালিন মেশানো খাদ্যপণ্য। যদি বাণিজ্যিকভাবে ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধ হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এ বিষয়ে সরকারের বহু আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত ছিল।
জানা গেছে, সরকার এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দিষ্ট সংস্থা বা ইনস্টিটিউট ছাড়া কেউ ফরমালিনের ব্যবহার কিংবা ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। ইতোমধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই এই বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হবে। গোটা বিষয়টি সরকারের জনকল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। কিন্তু ফরমালিনের ক্ষেত্রে সরকারের এ নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছু নেতিবাচক ভাবনারও অবকাশ রয়েছে। কারণ দেশে অনেক ভাল আইন রয়েছে; কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ নেই। এছাড়া এখানে আইন অমান্যের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। মাদকদ্রব্যের আমদানি ও এর ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে কোটি কোটি টাকা মূল্যের মাদক আমদানি করছে। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বহুবার অনেক মাদক চোরাচালানিকে গ্রেফতার করেছে; কিন্তু দেশব্যাপী বেআইনী মাদকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে খুবই ক্ষমতাশালী; রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন ব্যবহারের মাধ্যমে যারা বেশ কয়েকদিনের পুরনো মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা ধরনের খাদ্যকে তরতাজা রাখে তারা অবশ্যই দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। এরা যাতে পরবর্তী পর্যায়ে দেশে চোরাচালানের মাধ্যমে ফরমালিন আনতে না পারে সে বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। বিগত তিন বছরে কী পরিমাণ ফরমালিন আমদানি হয়েছে এবং আমদানিকৃত ফরমালিন কাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে তা জানতে চেয়ে ২০ আমদানিকারককে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সরকার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ফরমালিনের বেআইনী ব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের খোঁজ করবে। এদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এদের কারণেই ফরমালিন মেশানো খাদ্য খেয়ে মানুষ নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগছে। সরকার অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধের যে জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে সবাই স্বাগত জানাবে।

No comments

Powered by Blogger.