অভিমত ॥ বিরোধীদলীয় নেত্রীর সত্যকথন by ড. গিয়াসউদ্দিন মোল্যা

অবশেষে আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর মুখে সত্যটি বের হল। ২০০৬ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্ররোচিত ও নির্দেশিত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়েছেন।


তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল তা ২০১২ সালে অকপটে স্বীকার করেছেন; কিন্তু স্বীকার করেননি এই ভুল সিদ্ধান্তের ফলে বাঙালী জাতিকে কি মাসুল দিতে হয়েছে; বাংলাদেশের জনগণের কি পরিমাণে ক্ষতি করেছেন তা স্বীকার করেননি এবং তাঁর এই ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। শুধু তাই নয়, এই ভুলের জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীর পরিবার তছনছ হয়ে গিয়েছে; দুই পুত্রের আর্থিক দুর্নীতির চিত্র বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ভেসে উঠেছে, তাঁর এই ভুলের মাসুল দিতে হয়েছে দেশের সাধারণ জনগণ ও প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদের, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে, বাংলাদেশকে দুই বছরের জন্য সামরিক (প্রচ্ছন্ন) শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে এবং বাংলাদেশ দুই বছর জনপ্রতিনিধিত্বহীনভাবে শাসিত হয়েছে। এ সবই আমাদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি।
বিরোধীদলীয় নেত্রী স্বীকার করেছেন তৎকালীন সময়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসান-এর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হলেও পরবর্তী প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিনকে আওয়ামী লীগ সমর্থক মনে করে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দিতে সম্মত হন নাই। সমগ্র তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি বিএনপি’র অনুকূলে রাখার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীর নির্দেশে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের বিকল্প ধাপগুলো এড়িয়ে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরী অবস্থা জারি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদে ইস্তফা দেন এবং ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তাহলে এটা পরিষ্কার যে, ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বিরোধীদলীয় নেত্রীর নিজের বলয়ে রাখার প্রয়াসের ফলে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সৃষ্টি হয়। একটি দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতির জন্য কি পরিমাণ অনুশোচনার বিষয় হতে পারে ২০০৬ সালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ভুল সিদ্ধান্ত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বিরোধীদলীয় নেত্রীর সত্য কথনের সাথে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, তৎকালীন সময়ে বিএনপি’র নীতি নির্ধারকগণ নেত্রীকে সঠিক পরামর্শ দেননি। বিচারপতি মাহমুদুল আমিনকে বিএনপি’র নীতি নির্ধারকগণ আওয়ামী লীগের লোক বলে নেত্রীর কাছে চিহ্নিত করেছেন। পরিস্থিতির ধূম্রজাল সৃষ্টি করে দু’একজন কপট নীতিনির্ধারক নেত্রীর মাধ্যমে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রতি আবেদন রইল। সন্দেহ হয় বর্তমান সময়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা প্রশ্নে আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর আশপাশের কতক চিহ্নিত নীতি নির্ধারকের ভূমিকার বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রহিত করার মূল স্পিরিট হলো জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারব্যবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনা। নির্বাচনকালীন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ছোট মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমন্বয়ে সরকার পরিচালনা করার সমঝোতামূলক অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন বর্তমান সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের সূত্র ধরে নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র ও প্রকৃতি নির্ধারণে দুইপক্ষ আলোচনায় বসে উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দের প্রজ্ঞার মাধ্যমে অবশ্যই একটি সমঝোতামূলক সমাধানে আসা যায়। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্টিংটনের মতে, আলোচনা ও সমঝোতার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের উক্তি চড়ষরঃরপং রং ঃযব ধৎঃ ড়ভ পড়সঢ়ৎড়সরংবও প্রণিধানযোগ্য। আলোচনায় অবশ্যই আমাদের জন্য সমাধান আসবে।
প্রথাগতভাবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সারা বিশ্বে অধিষ্ঠিত সরকার (ওহপঁসনবহঃ এড়াবৎহসবহঃ) মেয়াদ পূর্তির পরবর্তী অথবা পূর্ববর্তী স্বল্প সময়ের জন্য নিয়মিত রুটিন কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতির ব্যত্যয় ঘটাতে হবে; অংশীদারি ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশ পরিচালনায় নির্বাচিত সরকারের সংস্কৃতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে একটি সম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। আর এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যেকার অনাস্থা ও অবিশ্বাসকে দূরে রেখে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক নামক একটি অপ্রতিনিধিত্ব সরকার দেশের জন্য সম্মানহানিকর। জনগণ সমস্ত ক্ষমতার মালিক হওয়ায় জনগণের প্রতিনিধিগণই কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। তদুপরি একটি নির্বাচিত সরকার মেয়াদ শেষে একটি অনির্বাচিত গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়ভার অর্পিত করার ব্যবস্থা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে। সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। আমরা সারা বিশ্বে প্রচলিত ব্যবস্থায় একীভূত হওয়ার গৌরব অর্জন করতে চাই। আমরা বিশ্বে ‘আত্মমর্যাদাশীল জাতি’ হতে চাই।
লেখক : অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.