নিরাপদ সড়ক-সুদক্ষ চালক চাই by ইলিয়াস কাঞ্চন

গত রোববার রাজধানীর উপকণ্ঠে আমিনবাজারের কাছে প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে একটি বাস রাস্তা থেকে ছিটকে তুরাগ নদে গিয়ে পড়ল। গণমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনা এবং আনফিট গাড়িই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সেতুতে উঠতে গেলে গতি কমাতে হবে।


কিন্তু চালক সেটা করেননি বলেই প্রায় অর্ধশত মানুষ বেঘোরে জীবন দিল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এ ধরনের চালকের সংখ্যাই এ দেশে বেশি।
নিরাপদ সড়কের জন্য আমরা আন্দোলন শুরু করেছিলাম ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর। সড়ক দুর্ঘটনায় আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি এ আন্দোলনে নামি। প্রথম কর্মসূচি দেওয়া হয় ১ ডিসেম্বর। ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন জেলায় জনসমাবেশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, পোস্টারে প্রচার, শোভাযাত্রা কিংবা পাঁচ মিনিট গাড়ি বন্ধ রাখার মতো নানা ধরনের কর্মসূচি আমরা দিয়েছি। কিন্তু এসব করার পর দেখলাম, শুধু প্রচারে কাজ হবে না। আমাদের মূল যে টার্গেট পয়েন্ট অর্থাৎ চালকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। যত দিন পর্যন্ত চালকদের দক্ষ করা না যাবে, তত দিন সড়ক দুর্ঘটনার হার কমবে না। এখন যারা গাড়ি চালাচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই অদক্ষ। আবার তাঁরা ক্লান্ত হলে হেলপারকে দিয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন। চালকদের বড় অংশের শিক্ষাদীক্ষা না থাকার কারণে নিজের জীবনের গুরুত্ব যেমন উপলব্ধি করতে পারেন না, তেমনি অন্যের জীবনের গুরুত্ব দিতে শেখেন না। ফলে তাঁদের মধ্যে বেপরোয়া ভাব দেখা যায়। এ জন্য তাঁদের দক্ষ করা ও মানসিকতার পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি।
এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান স্টেকহোল্ডার হলো সরকার। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের দায় অনেক। কেননা, সরকারের ওপরই থাকে রাস্তাঘাট নির্মাণ, সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণের ভার। পাশাপাশি চালকের লাইসেন্স প্রদান কিংবা সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের কর্তৃত্বও সরকারের হাতে। সরকার এগুলো সঠিকভাবে না করলে যে হারে দুর্ঘটনা ঘটছে, তা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। গত সোমবার একজন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি বললেন, ফিটনেসহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চালালে হাজার হাজার গাড়ি ধরা সম্ভব। কিন্তু এগুলো রাখার মতো জায়গা তাঁদের নেই। তা ছাড়া ভুয়া লাইসেন্স ধরতে গেলে দেখা যাবে, সব রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে যাবে, গাড়ি চালানোর লোক পাওয়া যাবে না। বেশির ভাগ চালকই ভুয়া লাইসেন্সধারী। অনেক চালকের অক্ষরজ্ঞান নেই। তাঁরা লিখিত পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ায় যান না।
বাস্তবতার এটা এক দিক। যাঁদের অক্ষরজ্ঞান নেই, তাঁদের তো গাড়ি চালনার পেশায় আসতে দেওয়াই উচিত নয়। চালককে নানা হিসাব-নিকাশ করে গাড়ি চালাতে হয়। একজন মানুষের যেখানে দুটি চোখ, সেখানে চালকের থাকতে হবে পাঁচটি চোখ। সরকার যদি ফিটনেসহীন গাড়ি কিংবা ভুয়া লাইসেন্স বন্ধ না করে, তাহলে তো দুর্ঘটনা কমবে না। দুর্ঘটনায় মানুষ মরতেই থাকবে। সরকার কী করবে, সে সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে।
আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে আমরা সচেতনতা তৈরির কাজ করে যাব। কিন্তু আমরা তো শাস্তি দিতে পারব না। এটা সরকারের কাজ। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতারা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর আইন করতে দিচ্ছেন না। দুর্ঘটনার উচ্চ হারের পেছনে এসব নেতা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছেন বলে মনে হয়।
চালক মানুষ মেরে পার পেয়ে যাচ্ছেন। বেশির ভাগেরই কোনো বিচার হচ্ছে না। আগে একটি আইনে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকের অজামিনযোগ্য এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশস্ত্র কারাদণ্ডের বিধান ছিল। মালিক-শ্রমিকদের দাবির মুখে এখন যে আইন বলবৎ আছে, তা জামিনযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদণ্ড। এ ধরনের দুর্বল শাস্তির বিধান থাকায় ভুক্তভোগীরা কোনো মামলা করতে উৎসাহিত বোধ করেন না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা আমরা হয়তো নির্মূল করতে পারব না। কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ নিলে তা নিশ্চয়ই সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসতে পারব। এ জন্য দরকার সবার আইন মেনে চলা।
এ জন্য আমরা বহু আগেই সরকারকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এ দেশে এসএসসি পাস করা বহু ছেলেমেয়ে আছেন। তাঁদের জন্য ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে তাঁদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে বিনা মূল্যে লাইসেন্স দেওয়া হলে তাঁরা প্রশিক্ষিত ও ট্রাফিক আইন জানা সচেতন চালক হয়ে গড়ে উঠতেন। চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকতেই হবে।
সড়কে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম নানাভাবে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, বহু চালক টার্মিনালে থাকে, তাঁদের টিভি দেখা বা পত্রিকা পড়ার সময় বা সুযোগ হয় না। এ জন্য টার্মিনালে কিছু টিভি দেওয়া দরকার, যেখানে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে সচেতনতামূলক ভিডিওচিত্র দেখানো হবে। এ ব্যবস্থা করা গেলে চালকের পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতনতা বাড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, চালককে নিয়োগপত্র না দিয়ে দৈনিক ভিত্তিতে গাড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে চালক যেভাবেই হোক, বাড়তি আয়ের জন্য তৎপর হয়। আইনের মাধ্যমে তা নিষিদ্ধ করতে হবে। আবার কিছু কিছু বাসে সময় বেঁধে দেওয়া থাকে কিংবা ট্রিপ-প্রতি অর্থের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এ কারণে চালকেরা বেপরোয়া হচ্ছেন। এসব বিষয়কে সরকারি বিধির আওতায় নিয়ে আসা এবং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। সরকার, মালিক ও চালকদের দায়িত্বশীল হতে হবে; সঠিক কাজটি করতে হবে। চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। যদি তা করতে পারি, তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে।
ইলিয়াস কাঞ্চন: চলচ্চিত্র অভিনেতা, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনের আহ্বায়ক।

No comments

Powered by Blogger.