নগরজীবন-পরিবেশদূষণ ও নাগরিক স্বাস্থ্য সমস্যা by হোমায়রা আহ্মেদ

চেনাজানা মানুষেরা যখন বায়ুদূষণ, পানি বা শব্দদূষণজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছে, তখন একে নাগরিক জীবনের ঝঞ্ঝাট বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মানসিকতা দূর করতে হয়েছে অনেকটা বাধ্য হয়েই। কিন্তু এই সচেতনতা আমাদের জীবনযাত্রার ধরন কতটুকু পাল্টাতে বাধ্য বা অনুপ্রাণিত করছে? কতখানি মানিয়ে নেওয়াতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি আমরা?


দূষণের যে রূপটি থেকে আমরা নগরবাসীর প্রায় কেউ-ই মুক্ত নই, তা হচ্ছে বায়ুদূষণ। বিশেষত ঢাকা শহরে বায়ুদূষণ তো আমাদের বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি বড় শহরে প্রতি কিউবিক মিলিমিটারে বায়ু দূষণকারী উপাদানের ঘনত্ব হওয়া উচিত ২০ পিপিএম, সেখানে ঢাকা শহরে এর পরিমাণ ৪২০ থেকে ৪৫০ পিপিএম। মেক্সিকো সিটিকে পেছনে ফেলে দিয়েছি আমরা বেশ কয়েক বছর আগেই।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের চলাচল প্রাথমিকভাবে আমাদের ক্ষতিকর বায়ুদূষণ থেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন আগের যান্ত্রিক দক্ষতা হারাচ্ছে। তাই এখন এগুলো যেসব গ্রিন হাউস গ্যাস এবং বায়ু দূষণকারী উপাদান নিঃসরণ করছে, তা পূর্বতন টু-স্ট্রোক ইঞ্জিনচালিত যানবাহনগুলোর চাইতেও বেশি। সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডারের একটি নির্দিষ্ট স্থায়িত্ব রয়েছে। কয়েক বছর পর পর এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু যান্ত্রিক সেবা নিতে হয়, যা সম্পর্কে যানবাহনের মালিক, চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা খুবই কম। তাই যে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব এসব যানবাহন দূষণজনিত অবস্থার ওপর আনবে বলে আশা করা হয়েছিল, তা এখন আর খুব একটা ফলপ্রসূ বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না।
বায়ুদূষণের সঙ্গে যেসব রোগ-ব্যাধির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া, ফুসফুস ও শ্বাসনালির প্রদাহ এবং প্রদাহজনিত ইনফেকশন, হূদরোগ, করোনারি ধমনির সংকোচন, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, রক্তদূষণ, চর্মরোগ ও ক্লান্তি। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত ধারণার তুলনায় দূষিত বায়ু সেবন আরও অনেক বেশিসংখ্যক রোগ-ব্যাধির জন্য দায়ী। যানবাহনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেড়ে যাচ্ছে ক্ষতিকর কার্বন ও সালফার যৌগের নিঃসরণ। ক্যানসার ও টিউমারজাতীয় রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে দেয় এসব দূষিত রাসায়নিক।
যানবাহনজনিত পরিবেশ দূষণের সঙ্গে প্রায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শব্দদূষণের বিষয়টি। শব্দদূষণ নবজাতক, শিশু, নারী, পুরুষ, বয়স্ক—নির্বিশেষে সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে বয়স ও লিঙ্গভেদে এই ক্ষতির প্রকরণগত পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বিকট ও আকস্মিক শব্দদূষণে শিশুদের কর্ণপটহের গঠন বাধাগ্রস্ত করে, কমিয়ে দেয় শ্রবণশক্তি। এর পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে তাদের মস্তিষ্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতার স্থায়ী ক্ষতি হয়। অনেক শিশুর দীর্ঘস্থায়ী আংশিক মনোবৈকল্য দেখা দেয়, সৃষ্টি হয় মানসিক অস্থিরতা। এতে শিশু হয়ে পড়ে অমনোযোগী ও অসহিষ্ণু। এর সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে, তার ভুক্তভোগী কিন্তু সমাজের সর্বস্তরের মানুষ।
আমাদের যানবাহন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে ন্যূনতম খরচ করতে অনীহা যে বায়ুদূষণ ঘটায়; ট্রাফিক আইন মেনে চলাচলের মানসিকতা না থাকাজনিত অসহিষ্ণুতা সজোরে হর্ন বাজানোর মাধ্যমে যে শব্দদূষণ ঘটায়, তার দায় যে বহন করে চলেছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তা নিয়ে আর কত দিন আমরা অজ্ঞ থাকব? শুধু শিশু ও নবজাতক নয়, প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক নাগরিকের হাইপারটেনশন, অনিদ্রা, বিরক্তি, রক্তনালির প্রদাহ ও সংকোচন, হূদরোগ ও সন্তান উৎপাদনশীল ক্ষমতা হ্রাসের পেছনে রয়েছে শব্দদূষণের প্রত্যক্ষ অবদান।
শব্দদূষণের মূল কারণ যে শুধু যানবাহন, তা নয়। যানবাহনের উচ্চ হর্ন এবং জোরে গান বাজানোর পাশাপাশি আরেক ধরনের শব্দদূষণ প্রায় আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে। তা হলো আবাসিক এলাকায় সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ। পৃথিবীর প্রতিটি উন্নত দেশে এই উচ্চ শব্দদূষণকারী নির্মাণপদ্ধতি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দিনের কোন সময়ে এই নির্মাণকাজ চালানো যাবে, তা-ও সরকারিভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই আইনগুলো কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ বা তদারকি নেই। ফলে আবাসিক এলাকায় বয়স্ক, নারী ও শিশুরা অনেকেই শ্রবণশক্তি হ্রাসের শিকার হচ্ছে। তাদের পড়াশোনা, ঘুম ও দৈনন্দিন কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে এ ধরনের নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোধকল্পে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, তাদের যাবতীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার খরচ বহন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তদুপরি অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্ষতির পরিমাণ প্রাকনির্ণয় করে প্রকল্পের অনুমোদন পর্যন্ত দেওয়া হয় না।
পানিদূষণ নিয়ে শুধু ছোট্ট একটি উদাহরণ দেব। আজ থেকে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর আগেও পানি শোধনকারী পাতনযন্ত্র উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত বাড়ি ছাড়া দেখা যেত না। অথচ এখন খাওয়ার পানি ফোটানোর পরও তা পিউরিফাইয়ার ব্যবহার করে দুর্গন্ধ আর জীবাণু দূর করতে হয়। শোধনকারী এই যন্ত্রের দেখা কেবল নিম্ন-মধ্যবিত্তই নয়, অনেক নিম্নবিত্তের ঘরেও মিলবে। তাহলে মাত্র এক দশকে এমন কী হলো, যা আমাদের ফোটানো পানি খাওয়ার পরও বাধ্য করল এই পানি পরিশোধনকারী যন্ত্রের শরণ নিতে? উত্তরটা হলো: নাগরিক সু-অভ্যাসের অভাব, যা কিনা আমাদের দিয়ে অযথা পানি দূষিত করিয়েছে এবং সুপেয় পানির অপচয় ঘটিয়েছে। অনেক বাড়ির মালিক শুধু সাপ্লাইয়ের লাইনের ওপর নির্ভর না করে নিজেরা অবৈধভাবে গভীর নলকূপ বা পানির পাম্প বসিয়েছেন। ফলে স্বভাবতই এসব বাড়ির বাসিন্দারা বেশি পানি পাচ্ছে, অন্য এলাকার গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। আবার যেহেতু এসব অবৈধ লাইন নেওয়া হচ্ছে এক ধরনের অসাধু লাইনম্যানদের সঙ্গে যোগসাজশে এবং পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে, সে কারণে দেখা গেছে যে অনেক ক্ষেত্রেই এসব পানির লাইন পয়োনালার চেয়েও গভীরে স্থাপিত হচ্ছে। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করার ফলে সৃষ্ট লিকেজের কারণে পয়োনালার নোংরা পানি মিশে যাচ্ছে ব্যবহার্য পানির লইনের সঙ্গে। ফলাফল হিসেবে দুর্গন্ধযুক্ত, দূষিত পানি পাচ্ছি আমরা।
পরিবেশদূষণ ও দূষণজাত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই, সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার অভাব এর জন্য যেমন দায়ী, তেমনি এগুলোকে পাশ কাটিয়ে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে আমাদের সেবা গ্রহণ করা, আইন না মানা এবং সামগ্রিক স্বার্থ চিন্তা না করার মানসিকতাও কম দায়ী নয়। এ কথা ঠিক যে সরকারি ব্যবস্থাপনা, জোগান ও তদারকি যথাযথভাবে হলে চাহিদার দিক থেকে এই অনিয়ম তৈরি হতো না। তবে এটিও প্রমাণিত সত্য যে সরকার বা কর্তৃপক্ষের পক্ষে এককভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়, তা যত বিদেশি সাহায্য বা ঋণই আসুক না কেন। কিন্তু আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠী যদি শুধু সচেতনতা এবং আইন নিজেরা মানার মানসিকতার মাধ্যমে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে আশাবাদী হতে কোনো দোষ নেই। কেননা, দূষিত বায়ুতে প্রশ্বাস গ্রহণ আর বিষাক্ত পানি পান করে দিনাতিপাত সব সময় আমাদেরই করতে হচ্ছে, নীতিনির্ধারকদের নয়। প্রয়োজন যেহেতু আমাদের, তাই তা মেটানোর প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই।
হোমায়রা আহেমদ: গবেষক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।

No comments

Powered by Blogger.