নিজামী-কাদের মোল্লার বিচার শুরু

মানবতাবিরোধী অপরাধের কলঙ্ক-দাগ মুছতেই হবে ১৯৭১ সাল বাঙালির ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে ওই সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন কিংবা বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে পুরো জাতির যে দৃঢ়তা,


আপসহীনতা, আত্মত্যাগ, নারীর সম্ভ্রমহানির কাহিনী বিধৃত, তা বিশ্ব ইতিহাসের আলোচিত অংশ। একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আজও মেনে নিতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং সশস্ত্র যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিষয়টি সারা বিশ্বে স্বীকৃত। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, তখন এ দেশেরই কিছু স্বজাতিদ্রোহী পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখন দেশজুড়ে যে তাণ্ডব ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, সেই মানবতাবিরোধী অপকর্মে এ দেশের এসব বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল এবং তারাও সোল্লাসে নৃশংসতা চালায়। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে এই দেশবিরোধীদের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টিও সবার জানা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শেষ মর্মন্তুদ অধ্যায়।
স্বাধীনতা অর্জনের চার দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর গণদাবি ও শক্ত জনমতের পরিপ্রেক্ষিতে মহাজোট সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে। নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ভিঙিয়ে কলঙ্ক মোচনে সরকারের এই প্রচেষ্টা বিলম্বিত পদক্ষেপ হলেও প্রশংসাযোগ্য। ধাপে ধাপে গণদাবি বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিচার শুরু হয়েছে। নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬টি এবং কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছাড়াও গণহত্যা, নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও উসকানি এবং এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতা করার স্পষ্ট অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এত বড় অপরাধের বিচার দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় রাষ্ট্রশক্তি করতে পারেনি বিধায়ই নানাবিধ নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এই রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। শুধু ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের জন্যই নয়, রাষ্ট্র ও সমাজকে অশুভ শক্তিমুক্ত করতে এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা অতীব জরুরি।
আমরা আশা করি, দীর্ঘদিনের গণপ্রত্যাশার দ্রুত পরিসমাপ্তি ঘটাতে সরকার এ বিচারকার্য স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে এ বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে- যাঁরা এমন বক্তব্য ইতিমধ্যে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। আমাদের অর্জনের যাতে বিসর্জন না ঘটে, সে লক্ষ্যে দেশপ্রেমিক সব প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তদের কোনো কোনো আইনজীবী, এমনকি অভিযুক্তদেরও কেউ কেউ গর্হিত মন্তব্য ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করছেন। তাঁরা কোন বলে বলীয়ান হয়ে এমনটি করেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। মানবতাবিরোধী বিচার কার্যক্রম ব্যাহত করার নানা রকম ষড়যন্ত্র ও অপকৌশল অব্যাহত রয়েছে- এই বাস্তবতাটি সরকারকে আমলে রেখে সতর্কতার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার সব রকম প্রচেষ্টা আরো বেগবান করা দরকার। একই সঙ্গে দরকার সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে যথাযথ সমন্বয়।

No comments

Powered by Blogger.