উচ্চশিক্ষা-শিংওয়ালা পিএইচডি ও বিধ্বস্ত এক বিশ্ববিদ্যালয় by মনজুরুল আহসান বুলবুল

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সুশোভন সরকারকে নাকি তাঁর ছাত্ররা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তিনি পিএইচডি করেননি। জবাবে তিনি বলেছিলেন: পিএইচডি করলে কি মাথায় শিং গজায়? প্রশ্নটি আমারও। কিন্তু যে পিএইচডির কবলে আমরা পড়েছি, তাতে আমি নিশ্চিত, তাঁর মাথায় শিং গজিয়েছে।

এই শিংয়ের গুঁতোয় তছনছ হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উপযোগী একটি উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডির শিংটি যে খুব ক্ষুরধার, তেমন নয়। তবে ধার বাড়াতে তিনি ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রীর নাম, কখনো বঙ্গভবনের নাম, কখনো বা বলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নানা পাইক-বরকন্দাজের দাপটের কথা।
এই পিএইচডি আসলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত, সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। রাজনীতির সিঁড়ির সুবাদে সমপ্রতি একটি আধাসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বাসিত হয়েছেন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন, মহাজোট সরকারের ডিজিটাল দর্শন বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো জায়গা এটি, দেশি-বিদেশি আর্থিক অনুদানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থাটাও বেশ মোটাসোটা।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে আসীন পিএইচডির জন্য সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি, যা তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কল্পনাও করতে পারেননি। বিএনপি-জাতীয়তাবাদী জোটের এক পিএইচডি তাঁর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্ব, চূষ্য, লেহ্য—সব খাতেই বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ধারণা করা হয়েছিল, মহাজোটের মহা তোলপাড়ে নয়া যে জিনিসটি আসবে, তা হবে একটু ভিন্নধর্মী। কিন্তু সুযোগসন্ধানীরা সবাই বুঝি এক। মুক্তিযুদ্ধপন্থী এই পিএইচডি এসেই নাক ডোবালেন সেই জাতীয়তাবাদী পিএইচডির ভাগাড়ে। জাতীয়তাবাদী এই পিএইচডি নিজের স্ত্রীর জন্য নিয়েছিলেন গাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে বাড়ির সব চাকরবাকর, বাসভবনে গড়ে তুলেছিলেন গো-শালা, পাখপাখালির আবাস ইত্যাকার নানা কিছু। মুক্তিযুদ্ধবাদী এই পিএইচডি তাঁর কোনো কিছুরই কম নিলেন না, বরং কোনো কোনো বিষয়ে এক কাঠি সরেস। এসব তো নিলেনই, তার সঙ্গে যোগ হলো নিজের জাতীয়তাবাদী স্বজনদের চাকরি দেওয়া, পদোন্নতি দেওয়া। এখানেও মুক্তিযুদ্ধবাদী লোকটির ফর্মুলা খুব স্পষ্ট, যেকোনো নিয়োগের বেলায়: দুজন ছাত্রলীগ + একজন জাতীয়তাবাদী স্বজন; যাতে এ-কাল সে-কাল দুই কালই হাতে থাকে। পুরোপুরি রাজনীতি-আশ্রিত এই পিএইচডিধারী রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েই নিজের ও পরিবারের সুযোগ-সুবিধার জন্য আরও অনেক কিছু করবেন, তাতে বিব্রত হলেও বিস্মিত হইনি।
এত সব বৈধ-অবৈধ, বিত্তবৈভব নিয়েও যদি পিএইচডিধারী তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়টা যদি কিছুটাও এগোত, তাহলে হয়তো এত কথা উঠত না। কিন্তু এই পিএইচডি নিজে চর্ব, চূষ্য, লেহ্য—সবকিছুর স্বাদ নিলেও শুধু পালন করছেন না তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বটি। তাঁর রাজনৈতিক নিয়োগকর্তারা তাঁর ওপর কেন এবং কতটা সন্তুষ্ট জানি না, তবে তাঁকে যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের বারোটা বেজে বিধ্বস্ত ঘড়ির সেই কাঁটাটি যে একটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলছে, সেটিও দেখার বুঝি কেউ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধপন্থী শিক্ষকেরাও এখন আর এই পিএইচডির ভার বহন করতে পারছেন না। তাঁদের যতটা শক্তি, তা দিয়ে যত দূর সম্ভব পৌঁছাতে পেরেছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি তো তাঁদের নেই। দু-দুটি মন্ত্রণালয়ের সচিব (শিক্ষাসচিব স্বয়ং ও তথ্যসচিব) পদাধিকারবলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তাঁদের মেধা বা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরিস্থিতির গভীরতাটা তাঁরাও সম্ভবত বুঝতে পারছেন না। তাহলে নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়গুলো যাবে কী করে?
মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী এই পিএইচডির কীর্তির কিছুটা বর্ণনা দিই:
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি দূর করার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী এই পিএইচডির গাফিলতি ও তাঁর কতিপয় সাগরেদের ব্যর্থতায় বিএনপি-জামায়াত জোট জামানার বিকৃত তথ্য নিয়ে প্রকাশিত হয় পাঠ্যপুস্তক। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়ে। বাতিল করা হয় লাখ লাখ বই। কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কাদের গাফিলতিতে এই অপকর্মটি হলো, তা তদন্তে কমিটি হয় বোর্ডের এক সদস্যের নেতৃত্বে। এই সদস্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ এবং স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ স্নেহভাজন। যথেষ্ট অনুসন্ধান শেষে তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি হয়, বেরিয়ে আসে পিএইচডির গাফিলতি এবং তাঁর সহযোগীদের দায়িত্বহীনতার চিত্রটি। প্রতিবেদন দেখে তো পিএইচডি মহোদয় খুবই বিমর্ষ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নামে লবেজান এই পিএইচডি এক বছরেও সেই প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। কারণ, তাতে ফেঁসে যান তিনি নিজে ও তাঁর সহযোগীরা। কাজেই প্রতিবেদনটি যাতে আলোর মুখ না দেখে, সে জন্য সময় কাটাতে কাটাতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেলেন, যাতে প্রতিবেদনপ্রণেতা এবং বোর্ডে এ বিষয়ে সোচ্চার কণ্ঠ যাঁরা, তাঁদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পিএইচডি এ কাজে অত্যন্ত সফল হয়েছেন। আচার্যের দপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়—সবাই এ ব্যাপারে একেবারে অন্ধকারে।
রাজনীতি-আশ্রিত এই পিএইচডির কাজের সাফল্যের নমুনা দেখুন। তিনি যখন চুক্তির দায়িত্বটি পান, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৯ জন। আর এই কৃতী পিএইচডি এক বছরে সেই শিক্ষার্থী নামিয়ে এনেছেন চার হাজার ৮২১ জনে। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৯৭ ভাগেরও বেশি। এই তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়টির কোষাধ্যক্ষের প্রতিবেদনের। আশা করা যায়, এই পিএইচডি আর ছয় মাস দায়িত্বে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দালানকোঠা, ইট-কাঠ-লোহা আর ভিসির খামারসমেত রাজপ্রাসাদ ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভিসির সহযোগী কোষাধ্যক্ষ চলতি বছর যে প্রতিবেদন সমপ্রতি দিয়েছেন, সেটি বড়ই মজাদার। একজন কোষাধ্যক্ষের প্রতিবেদন যে এ রকম হতে পারে, তা হাতে না নিলে বিশ্বাস হবে না। সেই প্রতিবেদন বলছে: গত বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমে গেছে ২২ শতাংশ। শুনুন কোষাধ্যক্ষ মহোদয় কী বলছেন: বাস্তবে ২০১০-২০১১ অর্থবছরে বাজেট একেবারেই কার্যকর হয়নি।...গত অর্থবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম একেবারে স্থবির ছিল।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি প্রোগ্রামের মধ্যে ১৯টিই এখন বন্ধ। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রোগ্রাম এসএসসিতে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি হতে পারেনি। একই বর্ষে সনাতন প্রোগ্রামেও কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হননি।
দুই দিনে ৩৯১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। মিডিয়া সেন্টারটি বন্ধ হওয়ার পথে। বাউবির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিক্ষা ছুটি বন্ধ। গণহারে বদলির আতঙ্কে রয়েছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গত বছরের ১১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম ১২ দফা প্রস্তাব দিলেও পিএইচডি তা আমলে নেননি।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দেশে একটি শিক্ষা চ্যানেল চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা আজও চালু হয়নি। ২০০৯ সালে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও তা ঝুলে আছে পিএইচডির সিদ্ধান্তহীনতার কারণে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়েই পিএইচডি ঘোষণা দিলেন, গড়ে তুলবেন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। দুই বছর ধরে তিনি এই কুমিরের বাচ্চাটি বারবার দেখাচ্ছেন, কিন্তু কাজের অগ্রগতি অশ্বডিম্ব।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এই পিএইচডি এক বছরে বিদেশে কাটিয়েছেন ১১২ দিন। প্রিয় পাঠক, জেনে রাখুন, তাঁর কোনো প্রো-ভিসি নেই। তাহলে বুঝুন, কেমন চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।
তালিকা আরও দীর্ঘ করা যায়। কিন্তু গোটা হাঁড়ির অবস্থা জানার জন্য এটুকুই বুঝি যথেষ্ট। ধুরন্ধর এই পিএইচডির কোনো সাফল্য নেই কিন্তু তিনি জোরেশোরে ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে রয়েছে তাঁর শিকড়-বাকড়, রাষ্ট্রপতি বা শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরেও নাকি তাঁর খুঁটি খুব শক্ত।
দেশের একটি সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয় তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই, বিশ্ববিদ্যালয়টি বাঁচাতে এই উন্মত্ত শিংওয়ালা পিএইচডিকে কে থামাবে: বিশ্ববিদ্যালয়টির আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির দপ্তর? প্রধানমন্ত্রী বা শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তর? বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন? কে?
বিনয়ের সঙ্গে বলি, আমার রচনাটি সব পিএইচডির বিরুদ্ধে নয়। কিছুকাল আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাজনৈতিক পালাবদলে দায়িত্ব পেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব পিএইচডি তাঁদের শিঙের গুঁতোয় নানা বেসরকারি, আধা সরকারি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিধ্বস্ত করছেন, আবার পালাবদলের পর ঘরে ফিরে আসা সেই গুণধরদের কীভাবে বরণ করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত ক্যাম্পাস। সে প্রশ্নের জবাব দেননি কেউ। ড. জাফর ইকবাল, বিনীতভাবে বলি, আমিও আপনার মতো আরও পিএইচডি চাই, তবে আলোচিত শিংওয়ালা পিএইচডির মতো পিএইচডি নৈবচ নৈবচ।
পাদটীকা: সম্মানীয় লোকের মানহানি করতে নেই বলে রচনাটিতে সরাসরি নাম-পরিচয় উল্লেখ থেকে বিরত রইলাম। তবে আচার্যের দপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষে এই পিএইচডিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। পরেও যদি প্রয়োজন হয়, সব তথ্য-প্রমাণসহ হাজির করতে রাজি আছি।
মনজুরুল আহসান বুলবুল: সাংবাদিক।
bulbulahsan@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.