আত্মপরিচয়-‘আদিবাসী আছে?...আছে!’ by মাহমুদুল সুমন

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে আলাপচারিতার একটি প্রকাশ্য ও খোলামেলা পরিসর ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। এই পরিসর নির্মাণে বাংলাদেশে ১৯৯০-পরবর্তী গণমাধ্যমের বিকাশ একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর এর পেছনে আরও কাজ করেছে আদিবাসী সংগঠক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নানাবিধ তৎপরতা ও উদ্যোগ।

সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ আরও কিছু দাবিতে এ সংগঠকেরা কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় দেড় দশক বা কিছু বেশি সময় ধরে। তবে নানাবিধ উদ্যোগ ও তৎপরতার পরও এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতি-রাষ্ট্রের একটি অনড় অবস্থা আমরা লক্ষ করছি। বিশেষ করে, নামকরণের প্রশ্নে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে কী নামে চিহ্নিত করা হবে, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটা স্পষ্ট সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে।
১৯৫০-এর দশকে লাতিন আমেরিকায় অসম মজুরির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আদিবাসী প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে (দেখুন বার্শ ১৯৮৬ ইন্ডিজেনাস পিপলস: অ্যান ইমার্জিং অবজেক্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ল)। মধ্য ১৯৮০-র দশকে নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক মনে করেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তখনকার অবস্থান ছিল খানিকটা এ রকম: আদিবাসী বিষয়টি কেবল সেসব দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক, যেখানে একটি জাতিগত ও বর্ণগতভাবে ভিন্ন গোষ্ঠী কোনো স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীকে পরাধীন করেছে। আবার ১৯৯০-পরবর্তী একাধিক ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারপ্রধান বিশ্ব আদিবাসী দিবসে এই আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করে ‘শুভেচ্ছাবাণী’ দিলেও বেশ কিছু নীতিমালায় এ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। রাষ্ট্রের দিক থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। এরই সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০১১ সালে এসেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বলছেন, বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই। এমনকি পার্বত্য চুক্তির সঙ্গেও আদিবাসী বিষয়টির কোনো সম্পর্ক নেই (দ্য ডেইলি স্টার, ২৮ মে ২০১১)। এ কারণেই মনে হয়, আর ১০টি ইস্যুতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা যে সক্রিয়তা, তৎপরতা বা আগ্রহ দেখান (যেমন: বিভিন্ন ইস্যুতে প্রদত্ত জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন, নীতিমালা), আদিবাসী ইস্যুতে সে রকম দেখা যায় না। এই অনড় অবস্থানটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব।
১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে আজ অবধি আন্তর্জাতিক আইনি পরিমণ্ডলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রশ্নে জরুরি কিছু বদলও কিন্তু ঘটে গেছে। আইএলও ১০৭-এর জায়গায় এসেছে ১৬৯, যাকে বলা হয়েছে আগের দলিলগুলোর তুলনায় অনেক অগ্রসর। বদল ঘটেছে সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও। অনেক রাষ্ট্রই ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রশ্নে এই আন্তঃসরকার আলোচনার পরিসরকে (ইন্টার গভর্নমেন্টাল ডিসকোর্স) ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছে। যেমন—ভারত। বাংলাদেশে কেবল আলোচনাটা একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
রাষ্ট্রের দিক থেকে সিদ্ধান্তহীনতা থাকলেও মানুষ কিন্তু বসে নেই। বিকল্প গণমাধ্যম বা নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ আরও নানা পরিসরে আদিবাসী শব্দ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক চোখে পড়ে। এ থেকে অনুমান করা যায়, আদিবাসী নামকরণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে একটা রাজনৈতিকভাবে শুদ্ধতার বোধ। এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো: পূর্বতন শব্দগুলোর (যেমন—উপজাতি বা ট্রাইবাল) একটা অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে শিক্ষিত একটি প্রজন্ম (যাদের একটা বড় অংশই এখন দ্বিভাষিক, অর্থাৎ মাতৃভাষা ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী) তাই অবজ্ঞাসূচক শব্দের পরিবর্তন চায়। সুতরাং, সাংবিধানিক স্বীকৃতির এ দাবিকে বারবার অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে বরং জাতি-রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একটি বৈরী সম্পর্ক (সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলি অ্যান্টাগনিজম) তৈরি করছে বলে আমার মনে হয়। রাষ্ট্র কি তাহলে এ বৈরী সম্পর্কই তৈরি করতে চাইছে?
এ প্রশ্নগুলোই করতে চাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে। তাঁরা কতটুকু জানেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনসমাজগুলো সম্পর্কে? কী ধরনের সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে তাঁরা জীবন যাপন করেন? কতটুকু জানেন দেশের অর্থনীতিতে এ সমাজের মানুষের অর্থনৈতিক অবদান সম্পর্কে? তাঁরা কি এখনো পুরোনো কোনো ঔপনিবেশিক ইমেজ বা ধারণা দিয়ে এ দেশের আদিবাসী সমাজকে দেখছেন?
একসময় ঔপনিবেশিক শাসন-কৌশল আদিবাসীদের দেখত ‘আদিম’ হিসেবে (আদিম শব্দটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ব্রিটেনের একটি পত্রিকায়) বা কখনো আবার ‘বর্বর’ বা ‘হিংস্র’ হিসেবে। প্রায় অভ্যস্ততার মতো, বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেও এ রকম আদিকল্প (আর্কিটাইপ) ব্যবহার করতে দেখা যায়। ইতিহাস গবেষকদের কেউ কেউ দেখিয়েছেন, এই আদিকল্প পুনরুৎপাদনের পেছনে কাজ করেছে উনিশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয় ও ইতিহাস নির্মাণের প্রশ্ন (ব্যানার্জি ২০০৬)। যেমন—এ ভাষায় লিখেছেন অনেকে, উত্তরবঙ্গের পাহাড়িয়া সম্প্রদায়কে ‘পাগান’ হিসেবে উল্লেখ করতে দেখেছি ১৯৮০-র দশকেও, লিখেছেন অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবীও একই ক্ষমতার ভাষায়। এ কারণেই শিক্ষিত ‘আধুনিক’-মনস্ক মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর দিক থেকে প্রান্তিক এ সম্প্রদায়কে, সংস্কৃতিকে বা তার জীবনব্যবস্থাকে চিনতে পারা না-পারার বিষয়টি ঔপনিবেশিক আলোচনার পরিসরের আলোকে দেখা জরুরি। এই ভাষা-ভঙ্গির সমস্যা হলো, এগুলো একেকটা জনগোষ্ঠীকে এমন এক বরফযুগে নিক্ষেপ করে, যা সমাজগুলোকে পরিণত করে স্থানহীন-কালহীন কতক বিচ্ছিন্ন সত্তায়। আর লক্ষ করবেন আশা করি, এই বস্তুনিষ্ঠকরণ চমৎকারভাবে পশ্চিম ইউরোপীয় সমাজ বিবর্তনের মডেল-তত্ত্ব্বগুলোর সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কী চলছে বা তাঁরা কোন পথে হাঁটছেন, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে আমার মনে হয়, এই নতুন আলোচনার পরিসর চিহ্নিত করতে পারা জরুরি কাজ। আর এর জন্যই রাষ্ট্রের দিক থেকে ‘আদিবাসী নাই আদিবাসী নাই’ ভাষাটা পাল্টানো দরকার। উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের একটি সংগঠনের রাজনৈতিক স্লোগান হচ্ছে ‘আদিবাসী আছে? আছে!’
মাহমুদুল সুমন: সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
sumonmahmud@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.