হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি-টাকা উদ্ধারে চেষ্টা নেই তদন্তও লোকদেখানো!

দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলেও জালিয়াতির টাকা উদ্ধারে কোনো অগ্রগতি নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চলছে তদন্তের নামে দফায় দফায় সাক্ষাৎকারের মহড়া।


সোনালী ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের জন্য এখনো কাউকে দায়ী করা যায়নি। একটি মামলাও হয়নি কারো বিরুদ্ধে। অর্ধেক টাকা শোধ করার জন্য সোনালী ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ১৫ দিনের সময়সীমার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চললেও ভুঁইফোঁড় হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদের কিছু হয়নি। সবার অভিযোগের আঙুল সোনালী ব্যাংকের যে পরিচালনা পর্ষদের দিকে, সেই পর্ষদের চেয়ারম্যানকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এ ছাড়া পর্ষদের ছয় সদস্যের মেয়াদ শেষ হলেও গতকাল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তাঁদের সবার নাম শোভা পেয়েছে।
নজিরবিহীন জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের তিন হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে হলমার্কসহ ছয়টি ব্যবসায়ী গ্রুপ। হলমার্ক একাই সাবাড় করেছে দুই হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এ ঘটনা দেশের গণমাধ্যমে প্রথম প্রকাশ পায় গত মে মাসের মাঝামাঝি। এরই মধ্যে চার মাস পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কেবল কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ওএসডি করেই ক্ষান্ত সোনালী ব্যাংক। ওদিকে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখন অফুরন্ত সময় চাইছে হলমার্ক।
সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন হোটেল) শাখা থেকে দীর্ঘ দুই-আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে
হলমার্কসহ ছয়টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে অবৈধভাবে ঋণসুবিধা দেওয়ার এ ঘটনায় দেশের সব মহল যেখানে বিস্ময় প্রকাশ করছে, সেখানে আরেক বিস্ময়ের জম্ম দিচ্ছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বর্তমান কার্যক্রম। এত বড় একটি কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কোনো দায় নেই- এ কথা যেমন মানতে রাজি নন, তেমনি বিতর্কিত পর্ষদ সদস্যদের পুনর্নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও খুব একটা সুখকর ঘটনা হবে না বলেই মনে করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়োগের বিধান সরকারের হাতে থাকায় এ নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছেন না তাঁরা।
জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে এখনো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে দুদক। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সংস্থাটি এই কাজ করছে প্রায় দুই মাস ধরে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে সোনালী ব্যাংকও এখন আর মামলার দিকে যেতে চাইছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা দুদকের কাছে সব অভিযোগ পেশ করেছি। এ বিষয়ে মামলা করবে দুদক।'
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ একটি কমিটিও এ বিষয়ে তদন্তে নেমেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত চার সদস্যবিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটি গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করেছে। গতকাল দলটি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করে। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া ওই ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, সোনালী ব্যাংকে সংঘটিত এই জালিয়াতির ঘটনা তাঁরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তদন্ত চলমান রয়েছে। অল্প সময়ে তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁরা সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন। কেউ কেউ অবশ্য দায় স্বীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, রূপসী বাংলা শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে ঋণ দিয়েছেন। তবে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ন কবীর বলেছেন, তিনি এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে তদন্তের স্বার্থে আরো অনেক বিষয়ে কথা বলতে চাননি এই আমলা। হাতছাড়া হয়ে যাওয়া টাকা উদ্ধারের বিষয়ে এই কমিটির কোনো সুপারিশ আছে কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমাদের সুপারিশ ছিল, আছে, থাকবে। প্রয়োজন হলে আমরা হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদের সঙ্গে বসব।' অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হলমার্ককে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা প্রভাব খাটিছেন কি না সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অভিযোগ নেই।
সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা দায় এড়াতে পারেন কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, 'পর্ষদের জড়িত থাকার বিষয় আমরা খতিয়ে দেখব।' তিনি আরো বলেন, 'এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দেশের ব্যাংক খাতের জন্য নতুন করে কোনো আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে কি না তাও আমরা ভেবে দেখছি। এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ থাকলে আমরা তা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাব।'
জালিয়াতি হওয়া টাকা আদায়ের বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, 'আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, টাকা আদায়ের জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আমরা বসে নেই।' হলমার্কের চিঠির ব্যাপারে তিনি বলেন, হলমার্ক যে চিঠি দিয়েছে তাতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কথা তারা উল্লেখ করেনি। তারা বলেছে, আরো সময় প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, গত ৩ সেপ্টেম্বর হলমার্ককে ঋণ হিসেবে দেওয়া অর্থের অর্ধেক নগদ ফেরত দেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে একটি চিঠি দেয় সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ১৮ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত সময় শেষ হলে হলমার্ক সোনালী ব্যাংকের কাছে আরো সময় চেয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু সেই চিঠিতে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা উল্লেখ করেনি হলমার্ক।
সোনালী ব্যাংকের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে কথা হয় ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলমের সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, তদন্তের নামে যা হচ্ছে তা লোক দেখানো। পেছনে সরকারদলীয় রাঘব বোয়ালদের আড়াল করার জন্যই কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, ইউনিপে-টু-ইউকে সামনে রেখে তারাই এসব অপকর্ম চালাচ্ছে।
মামলা করলে টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে এ অজুহাত উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'দুরাত্মার যেমন ছলের অভাব হয় না, তেমনি সরকার বা সোনালী ব্যাংকও নানা অজুহাত খাড়া করছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে, যে যত বড় ঋণখেলাপি সে তত আইনের উর্ধ্বে। টাকার অঙ্ক কম হলে ব্যাংক আপনাকে তাড়া করবে। আর টাকার অঙ্ক বেশি হলে ব্যাংক আপনার পেছন পেছন ঘুরবে। সোনালী ব্যাংক এই শিক্ষাই দিচ্ছে, যে যত বেশি টাকা আত্মসাৎ করবে, সে তত নিরাপদ।'
চলমান প্রক্রিয়ায় সোনালী ব্যাংক থেকে লোপাট করা টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে মোটেই আশাবাদী নন এ আইনজীবী। তিনি বলেন, দর্নীতি দমন কমিশনের ওপর মানুষের কোনো কালেই আস্থা ছিল না। সংস্থাটি যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে চায় তাহলে এর উচিত হবে দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। তা না করে সংস্থাটি দলে দলে লোকের ইন্টারভিউ নিচ্ছে। লোক দেখানো এসব তদন্তে কোনো লাভ হবে না।

No comments

Powered by Blogger.