সবুজ প্রবৃদ্ধির জন্য পাট by ড. আতিউর রহমান

এক অভাবনীয় যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এ বছর পাট দিবস পালন করছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাদেই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে তার এতদিনের স্বল্পোন্নত দেশের শিরোপা থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। নতুন এই পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যদি চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথাটি মনে রেখে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে সবুজায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো পূরণে অনেকটাই সফল হবো। নিঃসন্দেহে বস্ত্রশিল্পই এখন বাংলাদেশের প্রধান শিল্প। এই শিল্পকে সবুজ করার নানা উদ্যোগ এরই মধ্যে উদ্যোক্তারা নিজেদের স্বার্থেই হাতে নিতে শুরু করেছেন। পৃথিবীর দশটি উত্তম সবুজ গার্মেন্ট কারখানার মধ্যে সাতটিই বাংলাদেশে। আরও অসংখ্য কারখানা সবুজায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আশা করি, উপযুক্ত নীতি-কৌশল ও অর্থায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শিল্পের সবুজায়নের পথটি থেকে আমরা বিচ্যুত হবো না। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ রূপান্তর তহবিল গঠন করে বস্ত্র ও চামড়া শিল্প সবুজ করার একটা উদ্যোগ চালু করেছে। তবে বস্ত্র ও চামড়া শিল্পের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখনও বেশ প্রবল। সেই তুলনায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাটের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পায়ন অনেকটা সহজাতভাবেই সবুজ বলা চলে। একটু কৌশুলি হলেই পাটপণ্যের উপযুক্ত বহুমুখীকরণ এবং নয়া অবয়বে সাজাতে পারলে পাটশিল্পকে সবুজ শিল্প হিসেবে সারা পৃথিবীতে তুলে ধরা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া বস্ত্রশিল্পের উপকরণ হিসেবেও পাটতন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাকৃতিক উপকরণ হিসেবে পাটতন্তুর ব্যবহার বাড়লে বস্ত্র খাতের সবুজায়নও ত্বরান্বিত করা যাবে। সম্প্রতি পাটচাষ ও শিল্পায়নের দিকে সরকারের নীতি সহায়তা বেশ বেড়েছে।
২০১১ সালে যে পাটনীতি গ্রহণ করা হয়, তা ২০১৬ সালে সংশোধিত করে পাট খাতের উন্নয়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাটের চাষ আধুনিক করা, কৃষককে উন্নত বীজ প্রদান এবং পাট গবেষণা ও উদ্যোক্তাদের সংযোগ বৃদ্ধির তাগিদ এই নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ওই নীতির বলেই ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি সংরক্ষণ ও পরিবহনে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের নির্দেশনা দেয় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, আলু, আটা, ময়দা, মরিচ, হলুদ, ধনে ও তুষ-খুদকুঁড়ার মতো ১১টি পণ্য এই নির্দেশনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পাট ব্যবসায়ে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু প্রণোদনামূলক নীতি সহায়তা দিতেও এগিয়ে এসেছে। পাটচাষিদের জন্যও উপযুক্ত দাম, ঋণ ও বীজ সরবরাহে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগগুলো বেশ কিছু সহায়ক নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। পাটের মোকামগুলো সেই আগের মতো ফের সরগরম হয়ে উঠেছে। তাছাড়া পাটের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হার ২০১১-এর পর ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক হিসাব মতে, পাটের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১০ সালে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে পাটচাষ হতো। পাট চাষাধীন সেই জমি ২০১৭ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.১৯ লাখ হেক্টর। সাত বছরের ব্যবধানে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ বেড়েছে ৭০-৮০ লাখ বেল থেকে প্রায় ৯২ লাখ বেলে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পাটের উৎপাদন। এর পেছনে নতুন বীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষের জন্য সম্প্রসারণ সহযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পাটের দাম। পাট গবেষণাতেও মনোযোগী হয়েছেন আমাদের গবেষকরা। পাটের 'জিনম' আবিস্কারে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি পাশের দেশ থেকে উন্নত জাতের বীজ আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার পাটচাষিদের বড় রকমের নীতি সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে পাটতন্তু থেকে নানা রকমের ব্যবহারিক পণ্য তৈরিতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসেছেন। সেদিন কাগজে দেখলাম, একদল মেয়ে পাটের শাড়ি পরে বের হয়েছেন।
পোশাক শিল্পে পাটের সুতা ব্যবহারে আমাদের শিল্পোদ্যোক্তারা ভালোভাবেই এগিয়ে এসেছেন। তাছাড়া ঘরের আসবাবপত্র, মেয়েদের ব্যবহূত ব্যাগ, নরম কাপড়ের পোশাক, ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী তৈরি করার সময় ব্যাপকভাবে পাটতন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। ক'দিন আগে 'তরঙ্গ' নামের একটি এনজিওর সদর দপ্তরে গিয়েছিলাম। প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষিত কর্মীরা পাটের পোশাক, ব্যাগ ও খেলনা তৈরি করে 'তরঙ্গ' ইউরোপ ও আমেরিকার বিলাসী বাজারে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে। 'হ্যারডসের' মতো নামিদামি দোকানেও এই পাটপণ্য যাচ্ছে। ব্রিটেন ও ইউরোপের অনেক রাজবাড়িতেও আমাদের দেশের আকর্ষণীয় পাটপণ্য এখন রফতানি করা হচ্ছে। শুধু এসব পণ্য কেন, উড়োজাহাজের বডি, বিএমডব্লিউ বা ভক্সওয়াগন, নিশান ও টয়োটা গাড়ির বডি ও অন্যান্য উপকরণ তৈরিতেও কাঁচামাল হিসেবে আজকাল পাটতন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। পাট থেকে প্রাকৃতিক তন্তু তৈরি করা যায় বলেই আগামী দিনগুলোতে পাটের চাহিদা বিশ্বব্যাপীই বাড়ার লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। যুদ্ধের সময় পাটের বস্তার চাহিদা বাড়ত। কোরীয় যুদ্ধের আগেও দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পাটের চাহিদা বেড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়াও শান্তির সময়েও যে পাটের চাহিদা বাড়তে পারে, তার উদাহরণ হালেই দেখতে পাচ্ছি। সম্প্রতি একটি দৈনিকে তার লেখায় বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ জানিয়েছেন যে, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক লাফে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রাকৃতিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই চাহিদার দশ শতাংশও যদি আমরা ধরতে পারি, তাহলে বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়তি পাটপণ্য রফতানি করতে সক্ষম হবো। সে জন্য আমাদের পাটের পরিবেশগত গুণাগুণ, পাটপণ্যের দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন, যথাযথ অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় আগ্রাসী মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি গুছিয়ে বলতে পারি যে, পাটচাষ শতভাগ পরিবেশবান্ধব, গ্রাহকদের যদি জানাতে পারি যে এক হেক্টর পাট গাছ উৎপাদনের সময় ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং ১১ টন অক্সিজেন ছাড়া হয়, পাট চাষের সময় কোনো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয় না, মাটি বরং উর্বর হয়, তাহলে প্রাকৃতিক সেই পাট গাছের তন্তুর তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য কিনতে বিদেশি ক্রেতারা কেন এগিয়ে আসবেন না? একই সঙ্গে পাটপণ্যের বহুমুখী ব্যবহারে আমাদের আরও উদ্যোগী হতে হবে।
পাটের সোনালি আঁশ সিল্ক্কের সুতার সঙ্গে মিশিয়ে চমৎকার উজ্জ্বল বস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। দেয়ালের কার্টেন, চেয়ারের কভার, কার্পেটের সুতা ও তার তলদেশে বাড়তি ঢাকনি হিসেবে পাট তন্তুর ব্যবহার এরই মধ্যে চোখে পড়ছে। এর সঙ্গে গাব, নীল, কচুরিপানাসহ প্রাকৃতিক অন্যান্য উপাদান যুক্ত করে চোখ ধাঁধানো রঙিন বস্ত্র সামগ্রী উৎপাদন খুবই সম্ভব। বিশেষ করে আমাদের ডেনিম জিনস তৈরির সময় পাট তন্তুর বহুল ব্যবহার এই বস্ত্র উপখাতটিকে নয়া সবুজ ব্রান্ডিং করতে দারুণ সহযোগিতা করতে পারে। শাইখ সিরাজ তাঁর ওই লেখাতেই একটি ব্যক্তি খাতের পাটকল পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কী বিরাট সাফল্য বয়ে এনেছে তার উদাহরণ টেনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নরসিংদীর ঘোড়াশালে অবস্থিত জনতা জুট মিলস পাটপণ্যের আধুনিকীকরণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছে। ৭০ থেকে ৮০ রকমের পাটপণ্য প্রস্তুত করে এই মিলটি। প্রতিদিন গড়ে ১১৫ টন পাটপণ্য রফতানি করে এবং সে জন্য বছরে ১৪ লাখ মণ কাঁচা পাট কেনে তারা। ৬ হাজার লোকবল নিয়োগ দিয়েছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মিলটি। আমার বিশ্বাস, এমন আরও অনেক পাটকল প্রতিদিন আমাদের জন্য রফতানি বাজার বাড়িয়ে চলেছে। সবার কথা হয়তো আমরা জানি না। পরিশ্রমী এই উদ্যোক্তারা নিজেদের সবটুকু ঢেলে বাংলাদেশের সোনালি আঁশের কদর বাড়িয়ে চলেছেন। আমাদের সরকারি মিলগুলোও উপযুক্ত সুশাসন, অর্থায়ন ও নীতি সমর্থন পেলে পাটশিল্পের প্রসারে এ ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা তারাও পালন করতে পারত। আরও আশার কথা এই যে, পাটপণ্যের তালিকা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাটখড়ি পুড়ে যে ছাই হয় তা দিয়ে কম্পিউটার প্রিন্টারের কালি তৈরি করা হচ্ছে। কসমেটিক্‌স উৎপাদনেও পাটের পাতা ও তন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। জামালপুরে 'পাটের চা' উৎপাদন পাটশিল্পে এক নব সংযোজন। কৃষি মন্ত্রণালয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মিলেমিশে পাটপণ্যের প্রচার ও বিপণনে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। তারা বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করছে এবং জনগণকে পাটপণ্যের ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। বিদেশেও আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ইপিবি বিরাট জাতীয় দায়িত্ব পালন করছে। পাট দিবস উপলক্ষে দেশের খ্যাতিমান চারুশিল্পীরা পাটের ক্যানভাসে তাদের শিল্পকর্ম এঁকে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ঢাকার রাস্তায় পাটপণ্যের নজরকাড়া বিলবোর্ড প্রদর্শনী দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাট খাতকে এভাবে আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়ানোর এই উদ্যোগ সত্যি অভিনব এবং ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমাদের ঐতিহ্যের অংশ এবং প্রিয় বাংলাদেশের টেকসই অস্তিত্বের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় কাঙ্ক্ষিত সবুজ প্রবৃদ্ধির আশা-জাগানিয়া এই পাট খাতের উন্নয়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং আমাদের ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা, সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত 'সেলিব্রেটি' মানুষরা সোনালি এই আঁশের প্রসার ও প্রচারে আরও বেশি করে এগিয়ে আসবেন- সেই প্রত্যাশাই করছি। এবারের জাতীয় পাট দিবস আমাদের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার সোনালি স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে, মনেপ্রাণেই তাই চাইছি।
dratiur@gmail.com
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক

No comments

Powered by Blogger.