কাঁটা ছাড়া গোলাপ by অমিত বসু

১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড খুশির ঝড়ে লণ্ডভণ্ড। ফ্রান্সের পাঠানো উপহারে হতবাক। দেখছেন আর দেখছেন। দেখা ফুরোচ্ছে না। হালকা সবুজ বিশাল পাথরের মূর্তি। আশপাশে যাকে পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করছেন, এটা প্রস্তরের না রক্ত-মাংসের। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে তখনই ঘোষণা- এটাই হবে আমেরিকার


স্বাধীনতার প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টি। বিশেষজ্ঞরা বললেন, তা কী করে হয়। ফ্রান্সের ভাস্করের তৈরি মূর্তি আমেরিকার প্রতীক হয় কিভাবে ক্লিভল্যান্ড জানতে চান। জবাব এল, শিল্পী, ভাস্করের কোনো দেশ নেই, তারা বিশ্বের। সূর্য-চন্দ্রের মতো গোটা পৃথিবীটাকে আলো দেয়। ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কুরসিতে বসার প্রাক মুহূর্তে অবিস্মরণীয় উপহার পেয়ে তেমনই অভিভূত। আনন্দে উদ্দীপ্ত। উপহারটা পাথরের নয়, কাগজের। মূর্তি নয়, পুস্তক। সেই বই থেকেই উঠে এসেছে এক অপূর্ব অবয়ব। যাঁর নাম বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান। মুজিবের লেখা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী।' বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঠিয়েছেন পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের হাতে। তাতে লেখা শুভেচ্ছা বাণীতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে সম্বোধন করেছেন 'স্নেহের দাদা' বলে। পৃথিবীর কোথাও দুটি দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কী এমন হৃদ্যিক ভাববিনিময় সম্ভব। এ রকম আন্তরিক উচ্চারণও কী কল্পনা করা যায়।
সম্পর্কের উষ্ণতায় প্রটোকলের সব কাঁটা উৎপাটিত। প্রস্ফুটিত সৌহার্দ্যের রক্ত গোলাপ। যার প্রতিটি পাপড়িতে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের অঙ্গীকার। আগের মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের সঙ্গে এই ভাবের বিকাশ সম্ভব হয়নি, হতে পারত। প্রতিভা-হাসিনা দুজনেই নারী। সে কারণে আরো কাছাকাছি আসা অসম্ভব ছিল না। সেটা হলো না। বাংলাদেশ-ভারতের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতায় ভেস্তে যাওয়ার পরও পাতিল নীরব। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আর কিছু না হোক তাঁর মতামত জানাতে পারতেন। দ্বিপক্ষীয় মৈত্রীকে প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল।
সমস্যাটা নারী-পুরুষের না, সংস্কৃতির। বাঙালির কথা বাঙালি বোঝে। বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশ হতে পারে, তাই বলে দুই জায়গায় বাঙালির হৃৎস্পন্দন ভিন্ন হবে কেন। একে অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়াটাও স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরামের বাঙালিরাও চুপ করে বসে থাকেনি। যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আবার সেই বাঙালিই পাঁচিল তুলেছেন নিপুণ হাতে। সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বিষিয়েছেন সম্পর্কের সৌরভ। দ্বিপক্ষীয় সেতুবন্ধের স্তম্ভগুলো ভেঙেছেন নিষ্ঠুর তৎপরতায়। তবে কী তিনি বাংলাদেশবিদ্বেষী। না, কখনো নয়। স্বদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছেন যাঁর হাত ধরে, তাঁকেও রুখতে চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার রাস্তায়। বাঙালি অগ্রজকে অস্বীকার করে ছুড়ে দিয়েছেন পুরনো রাষ্ট্রপতির নাম। উদ্দেশ্য একটাই, যেভাবে হোক পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় বাঙালি নেতাকে রাষ্ট্রপতি হতে না দেওয়া। এতে তাঁর নিজের জনপ্রিয়তা কমেছে। বাঙালি বাঙালির ক্ষতি করলে বাঙালি সইবে কেন? নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে বোধ হয় একমাত্র বাঙালিই পারে।
এ কাজটা যিনি করতে চেয়েছিলেন তিনি কিন্তু পারেননি। জনতার চাপে আত্মসমর্পণ করেছেন। শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছেন, উত্তাল ঢেউয়ের উল্টো দিকে সাঁতার কাটা অসম্ভব। হার মেনেও পার পাননি। কেন্দ্রীয় সরকারের মন ফেরাতে দিশেহারা। ভরসা সেই নবতম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। যাঁর সাফল্যের রাস্তায় কাঁটা বিছিয়েছেন, যাঁর একান্ত স্নেহভাজন হওয়া সত্ত্বেও শত্রুতাকে হাতিয়ার করেছেন, এবার তাঁকেই পরম সমাদরে বরণ করতে চাইছেন। এভাবে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার মানে? সেই স্বার্থ। তাঁর সাহায্য ছাড়া বাঁচার পথ নেই। মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ জোট সরকার চলতে পারবে তাঁকে ছাড়াই। নতুন শরিক খুঁজে পেয়েছেন মনমোহন।
রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকেও মমতার জন্য কম যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় সাময়িকভাবে নরম হয়ে মমতাকে ছোট বোন বলে সম্বোধন করেছিলেন। এখন সুর বদলেছেন। নিজের অপমানের ক্ষত নিরাময়ে তৎপর তিনি। সে কারণেই তিস্তা চুক্তি, ছিটমহল নিয়ে ব্যস্ততা। সরাসরি নয়, নেপথ্য থেকে কাজগুলো সুসম্পন্ন করতে চাইছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণর কলকাতা সফর সুনিশ্চিত, মমতার সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানের দায়িত্ব তাঁর। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সব প্রস্তাবে না বলাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছিল মমতার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে আবার হ্যাঁ বলতে শুরু করেছেন। কোনো কিছুতেই না বলার শক্তি কী তাঁর আছে। হাসিনাকে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষার এটাই সুবর্ণ সুযোগ প্রণবের। তিনি কী সেটা হাতছাড়া করবেন। দাদা হয়ে বোন হাসিনার সম্মান বাঁচাতে না পারলে রাষ্ট্রপতি হয়ে লাভ?
লেখক : কলকাতার সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.