স্মরণ-শহীদ মশিউর রহমান : একজন বীরের প্রতিকৃতি by মিজানুর রহমান

যশোরের বর্তমান চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ মশিউর রহমানের জন্ম। স্থানীয় বিদ্যালয়ে বাল্যশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যশোর জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।


কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৩৮ সালে আইএ এবং ১৯৪০ সালে বিএ পাস করে ১৯৪৪ সালে রিপন কলেজ থেকে বিএল ডিগ্রি লাভের পর যশোরে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করে অতি অল্পকালের মধ্যে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান ১৯৪৯ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে যশোর জেলা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের সঙ্গে প্রবল মতপার্থক্যের কারণে অসম্ভব আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন মশিউর রহমান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে বাংলার শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তাঁর নতুন রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু। যশোর 'জেলা আওয়ামী লীগ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও নীতির ব্যাপক প্রচারাভিযানে মশিউর রহমানের সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সংঘটিত উত্তাল ভাষা আন্দোলনে তরুণ অ্যাডভোকেট মশিউর রহমানের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে তাঁকে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রবল প্রতিপক্ষ তথা সাক্ষাৎ শক্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক কারণেই তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, যশোর জেলা শাখার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান ১৯৫৪ সালে যশোর জেলার 'ঝিকরগাছা-শার্শা' নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রাদেশিক সরকারের (পূর্ব পাকিস্তান) একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৯২ক ধারা জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ বাতিল ও ১৯৫৮ সালে সেনাপ্রধান আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে তৎকালীন সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখে। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উত্থান প্রক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান অন্যতম সহকর্মী হিসেবে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, বঙ্গবন্ধু লাহোর থেকে ঢাকা ফিরে ছয় দফার পক্ষে দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করলে তাঁর সফল বাস্তবায়নে মশিউর রহমান অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালে দেশব্যাপী উদ্ভূত গণ-অভ্যুত্থানে তিনি যশোরে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই এলাকা থেকে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমএনএ নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে দেশজুড়ে অসহযোগ ও স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হলে তিনি যশোর এলাকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং এক মাস ধরে তাঁর ওপর পৈশাচিক ও নির্মম নির্যাতন চালিয়ে ২৩ এপ্রিল হত্যা করে। ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে পালিয়ে প্রাণে বাঁচার বিস্তর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। এই বীরকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
মিজানুর রহমান

No comments

Powered by Blogger.