মে দিবস-অধিকার হরণ নয় প্রদানেই সমাধান by ওয়াজেদুল ইসলাম খান

প্রতিনিধিত্বমূলক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময় শিল্প বিকাশে বৈরী হতে পারে না। কারণ তারা জানে, এ শিল্পের ওপর শ্রমিক বা তার পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই শ্রমিকদের ওপর দোষ চাপিয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পুঁজিপতিদের লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।


সস্তা শ্রমকে পণ্য করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একচেটিয়া পুঁজি শোষণের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং একইভাবে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও দেউলিয়া বানাচ্ছে

মহান মে দিবস শ্রমিকশ্রেণীর জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ দিবস। আজ থেকে ১২৬ বছর আগে খোদ মার্কিন মুলুকে হে মার্কেটে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে বিজয় হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় শ্রমঘণ্টা ৮ ঘণ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী শ্রমিকরা এ দিনটিকে বিজয়, উৎসব এবং অনুপ্রেরণার দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। কিন্তু বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আজ এক ভিন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষভাবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ধস নামার ফলে বিশ্ব-পুঁজিবাদের আগ্রাসনে পৃথিবীব্যাপী শ্রমিকশ্রেণী মারাত্মক আক্রমণের সম্মুখীন। এ দিবসটি এখন প্রকৃতপক্ষে আবার লড়াই-সংগ্রামের দিবসে পরিণত হয়েছে।
বিগত ১২৬ বছরে প্রযুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী ঘটেছে অভূতপূর্ব বিজয়। মানুষ উন্নত থেকে আরও উন্নততর জীবনযাপন করছে। আমাদের দেশে এই চিত্রটা উল্টো। এখনও আমাদের দেশের শ্রমিকরা তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি ও নূ্যনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে সরকার সারাদেশে একের পর এক বৃহৎ কল-কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেওয়ার পরপরই খুলনা শিল্প এলাকায় এশিয়ার বৃহত্তম পেপার মিল খুলনা নিউজপ্রিন্টসহ বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সব ঐতিহ্যবাহী শিল্প এলাকা প্রকৃতপক্ষে আজ মৃত এলাকায় পরিণত হয়েছে।
দেশকে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল করার মানসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে দেশের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক কল-কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণীর লুটেরা পরগাছা, ধনিকশ্রেণী; যারা ঋণখোলাপি সংস্কৃতি সৃষ্টিকারী এবং সাম্রাজ্যবাদী ও বিদেশি প্রভুদের স্বার্থে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে টিঅ্যান্ডটিকে কোম্পানি করা হয়েছে এবং রেলসহ জাতীয় সম্পদ গ্যাস ও বন্দরকে প্রভুদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে প্রায় সব কল-কারখানা একের পর এক বন্ধ করে দেওয়ার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। উন্নত বিশ্বের শ্রমিকরা যেখানে উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিল্পের উন্নতি করছে, সেখানে আমাদের দেশের কল-কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে মেহনতি মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। কারণ বিশ্বায়নের হোতারা হয়তো ভাবছে বিভিন্ন সৃষ্টির নির্মাতা শ্রমজীবী মানুষ যদি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে তাহলে বিভিন্ন দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। শ্রমজীবী মানুষের চিন্তাচেতনা পাল্টে যাবে। পরনির্ভরশীল অর্থনীতির পরিবর্তে গড়ে উঠবে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি।
১৮৮৬ সালের ১ মে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আমেরিকার শ্রমিকরা আত্মত্যাগের মাধ্যমে এ দিনটির সূচনা করে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাদের মৌলিক অধিকার। পৃথিবীব্যাপী স্বৈরতন্ত্র বা স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থা। আধিপত্য এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বেড়াজাল থেকে মানুষ মুক্ত হয়েছিল।
সাম্রাজ্যবাদের হোতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থাবা থেকে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষও রেহাই পাচ্ছে না। এরই মধ্যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা এবং সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার জাঁতাকলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ও শিল্প পরিস্থিতি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় জাতীয় শিল্প বিকাশের পরিবর্তে দেশ ক্রমশ বিশিল্পায়িত হচ্ছে। ফরমাল সেক্টরের পরিবর্তে গড়ে উঠছে অসংখ্য ইনফরমাল সেক্টর। যেখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই; নেই মৌলিক অধিকার। গার্মেন্টসহ এসব অসংগঠিত সেক্টরে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের পরিবর্তে ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। এসব অসংগঠিত সেক্টরের শ্রমিক-কর্মচারীরা এক মানবেতর জীবনযাপন করছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট ও যন্ত্রণা। শোষণের বেড়াজালে শ্রমজীবী মানুষের জীবন জর্জরিত। শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।
এ প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের তার অর্জিত অধিকার রক্ষা এবং আদায়ের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। সে লড়াই মূলত আমাদের দেশের সরকারগুলোর ভ্রান্ত নীতি এবং লুটেরা মালিকের বিরুদ্ধে। আমাদের দেশের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে আইএলও স্বীকৃত ৮৭ এবং ৯৮ ধারা কনভেনশন এবং প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সংগঠন করতে চাইলে মালিক এবং সরকারি প্রশাসন মরিয়া হয়ে ওঠে তা ধ্বংস করতে। অথচ ইতিহাস বলে_ শ্রমজীবী মানুষের অবদানের জন্যই শিল্প এবং কৃষি বিপ্লব হয়েছে। এ শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্ন সৃষ্টির নির্মাতা হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা আমাদের দেশের লুটেরা-ধনিকরা কোনোভাবেই বুঝতে চায় না। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের মালিকদের দৈন্য। একই মনোভাব আমাদের দেশের পরনির্ভরশীল সরকারগুলোর মধ্যেও বিরাজমান। মানুষের বিকল্প রোবট তৈরি করতে হলেও শ্রমিকদের দুটি হাত ও মেধার প্রয়োজন। তাই শ্রমিকদের অনাস্থা নয়, বরং আস্থায় নিয়েই শিল্পের উন্নয়ন এবং বিকাশ সম্ভব।
আমাদের দেশের সাধারণ শ্রমিকরা কাজ, দক্ষতা এবং মেধার দিক থেকে অতুলনীয়। শ্রমিকরা জানে, একটি শিল্প-কারখানার সঙ্গে মানুষের রুটি-রুজির সম্পর্ক এক এবং অভিন্ন। তাই কল-কারখানার ক্ষতি কোনোভাবেই শ্রমিকরা চায় না, বরং কারখানার স্বার্থে শ্রমিকরা জান দিতেও প্রস্তুত। হাজারীবাগ ট্যানারি এবং লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসসহ যেখানে দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন ছিল বা আছে সেখানে সে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত। আমাদের দেশের এক ধরনের লুটেরা মালিক শিল্পে উন্নতমানের পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে জাতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পরিবর্তে যেনতেনভাবে মুনাফা অর্জনে বেশি ব্যস্ত থাকে। অথচ জাতির প্রত্যাশা_ একজন দেশপ্রেমিক শিল্পোদ্যোক্তা অবশ্যই শিল্প, শ্রমিক এবং দেশের স্বার্থ দেখবে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মালিক এ তিনটির একটির কথাও ভাবে না। ভাবে শুধু মুনাফা আর মুনাফা। তাই আমাদের দেশে শিল্প বিকাশের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে বিদেশি পণ্যের বাজার। অবশ্য এজন্য মালিকদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি সরকারের ভ্রান্ত নীতিও সমভাবে দায়ী। এর পাশাপাশি এটাও প্রতীয়মান, দেশে সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে এক ধরনের দলবাজি ট্রেড ইউনিয়ন। বিশেষত দায়ী সরকারি ছত্রছায়ার পাশাপাশি মালিকের মদদপুষ্ট চাঁদাবাজি ও মাস্তান ট্রেড ইউনিয়ন। এরা সবসময় মালিক বা সরকারের ছত্রছায়ায় শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও প্রধান প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়নগুলো শ্রমিক ও দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে অনেক ক্ষেত্রে দল, ব্যক্তিস্বার্থে দলবাজিতে লিপ্ত থাকে। তারা ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থ চরিতার্থ করতে ক্ষমতাসীন দলের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শ্রমিকদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটে। এরা শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত বন্ধু নয়। সাধারণ শ্রমিক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময় শিল্প বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। তাই শ্রমিক-কর্মচারী তথা ট্রেড ইউনিয়নের ওপর দোষ চাপিয়ে লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার এক অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রতিনিধিত্বমূলক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময় শিল্প বিকাশে বৈরী হতে পারে না। কারণ তারা জানে, এ শিল্পের ওপর শ্রমিক বা তার পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই শ্রমিকদের ওপর দোষ চাপিয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পুঁজিপতিদের লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। সস্তা শ্রমকে পণ্য করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একচেটিয়া পুঁজি শোষণের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং একইভাবে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও দেউলিয়া বানাচ্ছে।
এ অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় শিল্প এবং শ্রমশক্তিকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন দেশপ্রেম, যা আমাদের দেশের সরকার ও লুটেরা মালিকগোষ্ঠীর মধ্যে মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। আমাদের দেশে যে জনশক্তি এবং সম্পদ আছে সেটা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। যে উন্নয়নে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে, সে কাজে শ্রমজীবী মানুষ তার সর্বস্ব দিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। বিনিময়ে শ্রমিকরা চায় তার ন্যায্য মজুরি, যার মাধ্যমে একজন শ্রমিক তার পরিবার-পরিজন নিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে। শ্রমিকরা তাদের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি চায়। তাই অভিজ্ঞতা এটাই শিক্ষা দিচ্ছে, অধিকার হরণ করে নয় বরং অধিকার প্রদান এবং শ্রমিকদের সম্পৃৃক্ততার মাধ্যমে তার নূ্যনতম চাহিদা পূরণ করার মধ্য দিয়ে সার্বিক উন্নয়ন তথা শিল্প বিকাশের পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

No comments

Powered by Blogger.