ইন্দিরাকে স্বাধীনতা সম্মাননা-গৌরবান্বিত হলো বাংলাদেশ

ইতিহাসে তাকে অভিহিত করা হয়েছে বহু অভিধায়। কখনও লৌহমানবী, কঠোর শাসক, প্রিয়ভাষিণী, প্রিয়দর্শিনী; কখনওবা ডটার অব ইন্ডিয়া নামে আখ্যায়িত হয়েছেন তিনি। কিন্তু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর কন্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের প্রিয়দর্শিনী, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রিয়পাত্রী ইন্দিরা গান্ধীর গুরুত্ব বাংলাদেশের মানুষের কাছে একেবারেই অন্যরকম।


অগণিত মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জন্মমুহূর্তে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবদানকে যদি এককথায় প্রকাশ করতে হয় তবে বলতে হবে তিনি পালন করেছিলেন ধাত্রীর দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এবং সামগ্রিকভাবে ভারতের আপামর জনগণ যদি সেদিন বাংলাদেশের মানুষের পাশে এসে না দাঁড়াত তবে এ দেশের জন্মপ্রক্রিয়া আরও বেদনাদায়ক, রক্তাক্ত ও দীর্ঘায়িত হতে পারত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল। প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও শরণার্থীদের সেদিন হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিল ভারত। শুধু থাকার জন্য স্থান আর খাবারই নয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকমের সহায়তাও দিয়েছিল তারা। সবচেয়ে বড় কথা, চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র ধারণ করেছিল ভারতের সেনাবাহিনী। রক্ত দিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়ে সেদিন ভারতের অভ্যন্তরে, ভারতের বাইরে সব চাপ হাসিমুখে সামলেছেন ইন্দিরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সব ষড়যন্ত্র, চাপ, হুমকি মোকাবেলা করেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ কর্ণধার হিসেবে মুজিবনগর সরকার গঠন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিজয় এবং সৈন্য প্রত্যাহার পর্যন্ত তিনি যেসব সহায়তা দিয়ে গেছেন সবই আমাদের ইতিহাসের মাইলফলক। তাই ইতিহাসবিদরা বলেন, যদি ইন্দিরা না থাকতেন তবে ইতিহাস অন্যরকমও হতে পারত। আমাদের ইতিহাসের অনিবার্য অংশীদার হয়ে আছেন ইন্দিরা গান্ধী। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মাননা জানানো আমাদের জাতিগত কর্তব্য ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখা বন্ধুদের সম্মান জানানোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রক্রিয়া শুরু হলো। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ঋণ স্বীকার করল, গৌরবান্বিত হলো। ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে সম্মাননা নিলেন তার পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেছেন, এ সম্মাননা শুধু ইন্দিরার নয়, সমগ্র ভারতের। আমরাও মনে করি, ভারতের জনগণের সেদিনের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা সম্মাননা পাওয়ার মতোই প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, শিগগিরই মুুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান ও ব্যক্তিদেরও সম্মাননা জানানো হবে। পাশাপাশি, ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের সভাপতি ও ইউপিএ জোটের কর্ণধার সোনিয়া গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা হলো। কিছুদিন আগে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সামনে আসবেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সোনিয়ার সফরের মধ্য দিয়ে দু'দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও মজবুত হলো বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি সুপ্রতিবেশীর সম্পর্ক চেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতির সর্বস্তরে, সীমান্ত, নদী, রাস্তাঘাটসহ অংশীদারিত্বের সব ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে সেটিই হবে দুটি দেশের জন্য উত্তম অবলম্বন। ইতিহাসে দেশ দুটি যেভাবে পরস্পরের কাছাকাছি থেকেছে ভবিষ্যতে তেমন থাকবে, সেটাই প্রত্যাশিত।
 

No comments

Powered by Blogger.