প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে ট্রানজিট-দক্ষ ও স্বচ্ছ কমিটি করতে হবে

আন্তদেশ পরিবহন ও যোগাযোগের জন্য, অর্থাৎ ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য ভারত সরকার আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। জানা গেছে, এবার বাংলাদেশের পক্ষেও আন্তদেশ পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্য ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


এই আন্তদেশ পরিবহনে প্রধানত নৌপথ, নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহৃত হবে। এ ক্ষেত্রে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে মুখ্য দায়িত্ব প্রদানের কথা ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কমিটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে মুখ্য মন্ত্রণালয় হিসেবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছে। এ ব্যাপারে এই মন্ত্রণালয়কে ডিও লেটারও প্রেরণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এসব যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য এটাই হবে প্রথম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ নৌযোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৪ সালে ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উভয় দেশই একমত হয়। ১৯৮০ সালে চুক্তিটি নবায়ন করা হয়, যার ৭ নম্বর ধারাটি ছিল ১৯৭২ সালের বাণিজ্য চুক্তির পুনরুল্লেখ মাত্র। ঢাকায় ১৯৯৩ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত সাফটা চুক্তিতেও অনুরূপ কথা ছিল। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারত ২৫ ক্যাটাগরির পণ্য শুল্ক অবমুক্তির ঘোষণা দেয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই বছরের ২৮ জুলাই মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি স্পর্শকাতর। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট প্রশ্নে রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। দেশের প্রধান বিরোধী দল ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে এসেছে, সরকারের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছে। বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট প্রশ্নে বৈষম্য রয়েছে বলেও শক্ত অভিযোগ রয়েছে। সুশীল সমাজের এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এই ট্রানজিটের বিরোধিতা করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে এই ট্রানজিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। বর্তমান বিশ্বের আলোকে ট্রানজিট না দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। কারণ, আধুনিক বিশ্বে জাতীয়তাবাদের ধারণার সঙ্গে ট্রানজিট দেওয়া বা না দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুই দেশের জনগণের স্বার্থটাই মুখ্য। সে কারণে সব কিছুর ঊধর্ে্ব একটি বিষয়ের দিকে দেশের সরকারকে দৃষ্টি রাখতে হবে। সেটা হলো, কোনোক্রমেই বাংলাদেশ এ ট্রানজিট ব্যবস্থায় যেন আর্থিকভাবে যথোপযুক্ত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়। আর সে কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক কমিটিতে অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ ও স্বচ্ছ ব্যক্তিদের নিয়োজিত করতে হবে। এ কমিটি দ্রুত করতে গিয়ে যেন তাড়াহুড়া করা না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বাইরে একাধিক বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত করার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে যেন শুল্ক ব্যবস্থা সমন্বয়ে কোনো ফাঁক না থাকে। এ কমিটির সব ধরনের কার্যক্রম থাকতে হবে জনগণের সামনে উন্মুক্ত। অর্থাৎ এ কমিটির তৎপরতা সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য গণমাধ্যম তথা জনগণের কাছে নিয়মিত প্রদান করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.