বাংলাদেশ-ভারত বিশেষজ্ঞ মতামত নিরাপত্তা-নিরাপত্তা সহযোগিতার বাস্তবসম্মত ভিত্তি রয়েছে by এম শাহীদুজ্জামান

বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক গত বছরগুলোয় অনির্দিষ্ট অবস্থায় ছিল। একটা পর্যায়ে উভয় দেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে চলে আসে যে, বাংলাদেশের ছিটকে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ভারতের গ্যাসের পাইপলাইন সংযোগের সুবিধার প্রস্তাব বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করাই ছিল এর কারণ।


তবে অতীতের জের ধরেও ভারত-বাংলাদেশের অবিশ্বাসের ধারাবাহিকতা ছিল। ইতিপূর্বে কোনো সরকার এ প্রসঙ্গটি উপলব্ধি করেনি।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো মিত্র দেশ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে যেকোনো মূল্যে হোক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রক্রিয়া রুখে দাঁড়ানো ছিল বাংলাদেশের জন্য জরুরি। কেননা বাংলাদেশকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একেবারেই অসহায় পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল এবং আরো পড়তে হতো। সমুদ্রসীমা প্রশ্নেও বলা যায়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রয়াসকে যেকোনো মূল্যে হোক না কেন, একটা সম্মানজনক অবস্থায় আনা অপরিহার্য ছিল। নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের অবস্থা ছিল কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী। সে ক্ষেত্রে ভারতের ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্যকে যথাযথভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে এবং মিত্রতার মানসিকতায় সমর্থন দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা চুক্তির প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর কার্যকলাপে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়ে আসছিল। সে প্রক্রিয়ায় সফল পরিসমাপ্তি ঘটাতে বর্তমান সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। এ পদক্ষেপ ভারতের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। ফলে ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের নিরাপত্তাজনিত চিন্তাভাবনা পুনর্বিবেচনা করবে। ভারত যে একটা বৃহত্ শক্তি এবং ভারতকে সমীহ করেই অগ্রসর হতে হবে—এটা বাংলাদেশকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে। এ কারণে নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও ধৈর্যশীল হতে হবে। এখানে কোনো তাত্ক্ষণিক অর্জন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এটুকু আশা করা যায়, অন্তত সীমান্ত সীমারেখা প্রশ্নে ভারতীয় আচরণে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য কিছুটা হলেও কমবে।
যে নিরাপত্তা সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে, সেখানে তথ্য বিনিময় ও অপরাধীদের হস্তান্তরের বিষয়গুলো তেমন কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত বলা যায় না। নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রশ্নে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিতান্তই একটি আপেক্ষিক কর্মপ্রক্রিয়া। এর প্রয়োগ জাতীয় স্বার্থ দ্বারাই নিরূপিত হবে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান বাধাগ্রস্ত করবে—এ কথা বলা ঠিক হবে না। অপরদিকে জঙ্গি উত্থান মোকাবিলায় পরস্পরকে সাহায্য করা উভয়েরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। এটা অর্জিত হলে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত হবে। বর্তমান সময় বাংলাদেশে-ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতা শুরু হয়েছে একটি বাস্তবসম্মত প্রেক্ষাপটে। এমন কোনো চুক্তি হয়নি, যার ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন ধারণা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকবে।
এটুকু বলা যায়, আগামী দিনগুলোতে ভারত-চীন, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে যেসব নতুনত্ব সৃষ্টি হবে তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অবশ্যই নতুন আঞ্চলিক শক্তি-নিরাপত্তা ধারণা গড়ে তুলবে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাবেন। তখন যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হবে এবং যে কূটনীতি প্রয়োগ করা হবে, এর প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা প্রসঙ্গ আরও জরুরি হয়ে উঠবে।
তবে ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করার বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে বিরোধী দল ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এ বিষয়ে অনেক ধারণা পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়বে এবং জনমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ উপাদানগুলো সামনে চলে আসবে। একটা গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে—এটা আশা করা যায়। যদিও বিরোধী দলের সঙ্গে বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা প্রশ্নে জটিল বিভেদ রয়েছে, তার পরও চলমান বিতর্কের সুষ্ঠু সুরাহা ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে দুটি দলের বিভেদ কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রয়াসকে এমন কোনো পথে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না, যা কি না বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশ্নে ভারতের বৈরী মনোভাব স্থায়ি হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থসমন্বিত বিষয়গুলোর ইতিবাচক পরিণতি সম্বন্ধে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। কেননা অতীতের অভিজ্ঞতা এটাই প্রমাণ করে যে নিরাপত্তার প্রশ্নে তাত্ক্ষণিক অন্য কোনো দেশ এগিয়ে আসবে না। ভারতের কূটনীতি অনেক শক্তিশালী। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল ও কার্যক্রম শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমালোচনা যত সহজ, সে তুলনায় ভারতকে আলোচনার টেবিলে আনা কঠিন। নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা যতই তিক্ত হোক না কেন, বর্তমান সরকার দিল্লিতে যতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তার পূর্ণ সুযোগ বাংলাদেশের নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি।
ভারতের সমকালীন কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারতের অবস্থান সুদৃঢ় ছিল। এ কারণে মার্কিনিরা অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও শ্রদ্ধাশীল ছিল। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে অনেক কার্যকরভাবে তথ্য উপস্থাপন ও তা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে আচরণগত সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেবে। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশে জনমত সৃষ্টিতে ভারতেরও আচরণগত কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সীমান্তে ভারতের বিএসএফের আচরণ কোনোভাবেই ভারতের ইতিবাচক ভাবমূর্তির পক্ষে যায় না। প্রায়ই বিএসএফের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। ভারতের জন্য বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের পাবলিক কূটনীতি অপ্রতুল।
বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে দেখার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রেও ভারতের আচরণ পরিবর্তন জরুরি। ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল দেখালে বরং ভারতেরই লাভ হবে বেশি। ভারতে যত বাংলাদেশী পর্যটক যায় তার তুলনায় বাংলাদেশে ভারতীয় পর্যটক কম। সে ক্ষেত্রে ভারত তার পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উত্সাহিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
আমেরিকা-ভারত, ভারত-চীন, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সব সময় শক্তিশালী রাখতে হবে। উভয় দেশের সড়ক যোগাযোগ পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবে। ভারতকে বাংলাদেশের জনগণের ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে উভয় দেশের সম্পর্ক আরও উন্নতি হতে পারে। তবে উভয় দেশের অপরাধীদের প্রশ্নে আরও তীক্ষ দৃষ্টি রাখা জরুরি। অপরাধীদের পদচারণ মোকাবিলা করতে উভয় দেশকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
এম শাহীদুজ্জামান: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.