কথায় কথায় 'ভাঙ গাড়ি' by এস এম আজাদ


'কী অপরাধ করেছি আমরা? কী অপরাধ করেছে আমার গাড়ি? চোখের সামনে দেখলাম, গাড়িটা ভেঙে চুরমার করেছে তারা।' গত শনিবার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে নিজের ভাঙা গাড়ি থেকে কাচের টুকরো সরাতে সরাতে এভাবেই আক্ষেপ করছিলেন ফজলে রাব্বী। প্রিমিয়াম ব্যাংকের গুলশান শাখার সিনিয়র অফিসার তিনি।


শনিবার বনানীতে প্রাইম এশিয়া ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় তাঁর সাদা রঙের প্রাইভেট কারটি (ঢাকা মেট্রো-গ-১১-০৩৩৩) ভেঙেচুরে দেওয়া হয়। ফজলে রাব্বী তাঁর অফিস ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেই দেখেছেন সেই দৃশ্য। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, 'কিছু করার নেই। একটু পত্রিকায় লিখে দিয়েন, প্লিজ। ফ্যামিলির লোকজন ভাববে আমি সতর্ক ছিলাম না!' শনিবার দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের শিকার হয়ে ফজলে রাব্বীর মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন অর্ধশতাধিক প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের মালিক। ঘটনার সময় ভাঙচুরের শিকার হয়েছে যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলও।
'যত দোষ, নন্দ ঘোষ' বলে যে একটা কথা আছে সেই নন্দ ঘোষ আর ঢাকার রাস্তায় নামা যানবাহন যেন সমার্থক। কিছু হলেই গাড়ি ভাঙা রীতিমতো প্রতিযোগিতামূলক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবারের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের একজন এভাবেই তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান।
ক্ষতিগ্রস্তরা বলেন, যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ আর সংঘর্ষের সময় নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনার বেশি শিকার হচ্ছেন মধ্যবিত্ত প্রাইভেট কারের মালিকরাই। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গাড়ির মালিক ও চালকরা হাতজোড় করে আকুতি জানিয়েও রক্ষা করতে পারছে না শখের ও প্রয়োজনের গাড়িটি। নিমেষে কাচ আর বডি ভেঙে চৌচির করে দেয় হামলাকারীরা। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই লাখ লাখ টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। প্রতিকার নেই বলে আইনের দ্বারস্থ হচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এমন ক্ষতি রোধে এবং প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আইনে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার থাকলেও দণ্ডবিধির দুর্বল ধারায় মামলা হওয়ার কারণে রক্ষা পেয়ে যায় অপরাধীরা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সংঘাতের সময় প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করা যায় না। মামলা করা হয় গণহারে। আবার ভুক্তভোগীরা কেউ বাদী হয়ে মামলা করেন না। এসব কারণেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি পুলিশ কর্মকর্তাদের। তাঁরা গাড়িচালক ও মালিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত শনিবার গুলশান-২-এ ব্যক্তিগত কাজে এসেছিলেন উত্তরার আজমপুরের বাসিন্দা মহিতুল ইসলাম। দুপুর ২টার দিকে বনানী পোস্ট অফিসের কাছে তাঁর ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটির সামনের কাচ ভেঙে ফেলে সংঘর্ষকারীরা। ভাঙা কাচে মহিতুলের গালও কেটে যায়। কাকলী এলাকায় এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, 'এ কেমন নৈরাজ্য? এভাবে রাস্তায় মানুষজনকে মেরে কী শিক্ষা পেল তারা? আর পুলিশও তো ঘটনা চলাকালে আমাদের এ রাস্তা দিয়ে আসতে আটকায়নি।' এমন অভিযোগ অনেক গাড়ি মালিকেরই। তবে বিভিন্ন ধরনের শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর হলেও থানায় গিয়ে অভিযোগ করেননি কোনো ভুক্তভোগী।
জানা গেছে, এসব ঘটনায় থানায় দণ্ডবিধির প্রচলিত কিছু ধারায় মামলা করে পুলিশ। গতকাল গুলশান থানার পুলিশও ওই রকম এক মামলায় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই হাজার শিক্ষার্থীকে আসামি করেছে; যার মাধ্যমে কোনো ক্ষতিগ্রস্তেরই অপরাধী শনাক্ত করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই মামলাটি হয়েছে দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩৩২/৩৩৩/৩৫৩/৩২৩/৩২৫/৩২৬ ধারায়। এসব ধারায় সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, ভবন ভাঙচুর ও জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানান গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'বিভিন্ন অপরাধের কারণে এ মামলা করা হয়েছে। তবে কোনো গাড়ির মালিক অপরাধী শনাক্ত করে ক্ষতিপূরণের জন্য আলাদা মামলা করতে পারেন। এটা হয় কম। এ ঘটনায় একজন মাত্র জিডি করেছেন।'
সূত্র জানায়, এসব ঘটনায় দণ্ডবিধির পরিবর্তে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের হলে আদালতের বিবেচনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। জানা গেছে, দ্রুত বিচার আইনের ৪ নম্বর ধারার ২ উপধারায় বলা আছে, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনকালে সরকার কিংবা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতিসাধন করলে সে জন্য আদালত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ক্ষতিগ্রস্তদের অনুকূলে প্রদান করার জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আদেশ দিতে পারবেন।
পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সচরাচর রাজধানীতে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের সময় শাহবাগ, পল্টন, নয়াপল্টন, মতিঝিল, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট, গাবতলী, বাঙলা কলেজের সামনে, সরকারি তিতুমীর কলেজের সামনে, তেজগাঁও পলিটেকনিকের সামনে, রোকেয়া সরণি এলাকায় সবচেয়ে বেশি গাড়ি ভাঙচুর হয়। বিশেষত ছাত্রদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা বেশি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তিতুমীর কলেজ, নিউ মার্কেট ও মিরপুরের বাঙলা কলেজ এলাকায়। গত বছর বনানীতে সাউথইস্ট ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংঘর্ষের সময়ও বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তিতুমীর কলেজের সামনে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি অন্তত ১০০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। ওই ঘটনায় ১০ জন গাড়ির মালিক গুলশান থানায় পৃথকভাবে জিডি করলেও মামলা করেননি কেউ। ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৪৩/১৪৭/১৪৯/৪২৭ ধারায় একটি মামলা করে। ওই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা নূরে আজম মিয়া বর্তমানে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত)। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ছবি দেখে অনেককেই শনাক্ত করা হয়। শনিবারের ঘটনায়ও ছবি দেখে অপরাধী শনাক্ত করা হবে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার পর এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রায়ই গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সংঘাতে বাদ পড়ে না পুলিশের গাড়িও। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পল্টন এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক গাড়ি। ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় জামায়াত-শিবিরের কিছু নেতা-কর্মীকে। গত বছরের ১০ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে হরতালের সময় ভাঙচুর চালানো হয় অর্ধশত গাড়িতে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির কর্মসূচির দিন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশত গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মতিঝিলে শেয়ারবাজারে বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে অনেক গাড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এমন ঘটনা ঘটে প্রায়ই।
ঘটনার সময় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিজামুল হক মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সংঘাত বা বিক্ষোভ শুরু হলে আমরা ট্রাফিক চ্যানেলে খবর দিই। তখন ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে বিকল্প রাস্তায় চলাচল করতে বলা হয়। তবে এ ব্যবস্থা নেওয়ার আগে এবং ফাঁকা রাস্তা পেয়ে কেউ ঢুকে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।' পরবর্তী ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়ে পুলিশ আহত, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণেই মামলা হয়। শনিবারের ঘটনায় তা-ই হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের কেউ মামলা করেননি।'

No comments

Powered by Blogger.