মাধ্যমিক বিদ্যালয় : প্রয়োজন খুঁটিগুলোর পরিমিত সংস্করণ by মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া

আমরা জানি স্কুলের খুঁটি হচ্ছে চারটি। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং স্কুল পরিচালনা কমিটি। সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি খুঁটির একটি হচ্ছে শিক্ষক আর অপরটি স্কুল পরিচালনা কমিটি। আজ মনে হয় দুটো খুঁটিতেই ঘুণপোকা ধরার উপক্রম হয়েছে। একটিতে ঘুণ ধরার অর্থ হচ্ছে মন, মানস আর চরিত্রের পতন,


অপরটিতে ঘুণ ধরার অর্থ হচ্ছে আগের পতনগুলোকে ত্বরান্বিত করা এবং সঙ্গে গুণগতমানের পতন নিশ্চিত করা। তাই এই দুটো খুঁটি নিয়ে কিছু কথা বলব।
আমার প্রশিক্ষণ গুরু ড. সামদানী ফকির প্রায়ই বলতেন, 'তুমি যদি কাউকে এক ছটাক জ্ঞান দিতে চাও, তাহলে তোমার এক সের জ্ঞান মাথায় থাকতে হবে।' আর এই জ্ঞানের রসদ হলো বই। এ বিষয়ে স্টিফেন কোবে বলেছেন, 'একজন পরিপূর্ণ মানুষের সাতটি অভ্যাস থাকা দরকার। তার মধ্যে একটি অভ্যাস হলো Sharpen the Saw অর্থাৎ করাতে ধার দেওয়া। করাতে নিয়মিত ধার না দিলে যেমন জং ধরে; ঠিক তেমনি আমাদের মনের করাতেও জং ধরে যদি নিয়মিত বই না পড়ি। এই জং ধরা মন নিয়ে শিক্ষার্থীর পাসের মাত্রা ঊর্ধ্বগামী করা গেলেও মনুষত্ববোধের মাত্রা ঊর্ধ্বগামী করা যায় না। আর করা যায়নি বিধায় দেশে প্রতিবছর শিক্ষার হার বাড়ে; সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে না আমাদের ভেতরকার সুকুমারবৃত্তিগুলো। শিক্ষার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এখানেই যে গ্রোথিত। শাণিত জ্ঞানই কেবল প্রয়োগের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য জ্ঞানার্জিত ব্যক্তির ভেতরে ভেতরে তাড়নার জন্ম দেয়। তাই বলা হয়, বই দুটোই করে। কিন্তু আমাদের কোনো কোনো শিক্ষক মহোদয়ের বই পড়ার অভ্যাস নেই বললেই চলে। তাই দরকার এই খুঁটিকে শক্তিশালী করা। নচেৎ এই ঘুণেধরা খুঁটিসদৃশ শিক্ষক মহোদয়রা তৈরি করবেন আরেকটি ঘুণেধরা নতুন প্রজন্ম; আর সেসব শিক্ষার্থীরা সামনের দিনগুলোয় উপহার দেবে একটি মেরুদণ্ডহীন বাংলাদেশ। তা থেকে উত্তরণের পথ বই আর বই। আর বই পড়ার জন্য চাই প্রথমে নিজের উদ্যোগ, অতঃপর সরকারি অর্থায়নে প্রতিটি স্কুলে মানসম্পন্ন পাঠাগার স্থাপন। অফিস চলার সময়ও রুটিনমাফিক পাঠ্য এবং কিছু মৌলিক বই পড়া। সপ্তাহে এক দিন পাঠচক্রের আয়োজন করা; যেখানে প্রত্যেক শিক্ষক পঠিত বইয়ের সার অংশটুকু অন্য শিক্ষকদের সামনে উপস্থাপন করবেন।
দ্বিতীয় খুঁটি স্কুল পরিচালনা কমিটি। পরিচালনা কমিটির মৌলিক কাজ হলো স্কুলের গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ প্রদান, তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং স্কুলের সার্বিক উন্নয়নে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনশীল কিছু উদ্যোগ গ্রহণ, যা স্কুলের অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে। এখন দেখতে হবে এই মৌলিক কাজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যাঁরা পরিচালনা কমিটির সদস্য আছেন, তাঁদের সেই যোগ্যতা আছে কি না এবং নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া যথাযথ কি না? আমার জানামতে শুধু সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা লিপিবদ্ধ থাকলেও অন্যদের ক্ষেত্রে যোগ্যতার নির্দিষ্ট কোনো মাপকাঠি নেই। থাকলেও তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। অধিকাংশ সময় দেখা যায় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মেধার ভিত্তিতে নয়, সদস্য হন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। আর তখনই জমে ওঠে লবিং আর টাকার খেলা। লবিং আর টাকা যেখানে মুখ্য হয়, সেখানে মেধা আর নৈতিকতা বিসর্জনে যায়। এই সুযোগে জন্ম নেয় স্বজনপ্রীতি আর ঘুষপ্রীতি। বর্তমানে বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় অধিকাংশ সময় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, হয় আত্মীয়তার যোগ্যতায়, নতুবা টাকার যোগ্যতায়। যে শিক্ষক স্বজনপ্রীতি কিংবা টাকার বিনিময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা পাসের নিশ্চয়তা পেলেও আদর্শ মানুষ হওয়ার নিশ্চয়তা পায় না। দেখা যায় স্কুলের উন্নয়ন তহবিল, স্কুলের নিজস্ব আয় তছরুপ হয়। অধিকাংশ বিল-ভাউচার প্রধান শিক্ষক আর সভাপতি এবং কিছু সদস্যকে বাটোয়ারার লোভ দেখিয়ে আঁতাতের মাধ্যমে সই করিয়ে নেওয়া হয়। এতে স্কুলের অবকাঠামোগত আর শিক্ষকের মনোগঠিত কোনোটারই উন্নয়ন হয় না। এভাবেই কুলষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো।
মাধ্যমিক স্কুল পরিচালনা কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনয়নে কিছু বিষয় নতুন করে ভাবা যেতে পারে। ০১. অভিভাবক প্রতিনিধি পদে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে একটি নূ্যনতম মাপকাঠি নির্ধারণ করা। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাকে অগ্রগণ্য করা। তবে বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো পদের অধিকারী এবং দণ্ডিত অপরাধীদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখা। ০২. শিক্ষক সদস্য নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে একটি মানসম্পন্ন নির্ণায়ক নির্ধারণ করা। ০৩. কোটাভিত্তিক নিয়োগকৃত সদস্যদের জন্য আলাদা শর্তাবলি নির্ধারণ। ০৪. সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন কল্পে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ওই প্রক্রিয়া থেকে বিরত রাখা। সরকারি ও বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া। সব ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের কমিটির সদস্য পদ পাওয়া থেকে বিরত রাখা। এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটিতে সুশাসন অনেকটাই নিশ্চিত হবে তা হলফ করে বলা যায়।
লেখক : প্রশিক্ষক ও সমাজকর্মী

No comments

Powered by Blogger.