নগর স্বাস্থ্যসেবা : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ by এ এম এম শওকত আলী

সিটি করপোরেশন আইন ২০০৮ এবং পৌরসভা আইন ২০০৮ অনুযায়ী শহরের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অর্থাৎ স্ব স্ব ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার। এসব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এ কারণেই স্থানীয় সরকার,


পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে থাকে। শহরে একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো পরিচালনার দ্বায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। এ মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিতভাবে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোও অত্যন্ত সীমিতভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য কাজ করে। এ ধরনের সেবা কাঠামো ব্রিটিশ আমল থেকেই চালু ছিল। এ কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে ওই আমলে গ্রামাঞ্চলে সরকারি কোনো সেবাকেন্দ্র ছিল না। জেলা বোর্ড বা পরিষদ অবশ্য সীমিতসংখ্যক কিছু ডিসপেনসারির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করত। প্রায় সব জেলা বোর্ডেই একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছিলেন। পদবি জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। সরকারি পর্যায়ে অনুরূপ কর্মকর্তার পদবি ছিল সিভিল সার্জন, যিনি সার্বিকভাবে শহরের সদর বা জেলা হাসপাতালের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তবে গ্রামাঞ্চলেও স্বাস্থ্যবিষয়ক সেবার বিষয়টিও তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারই দায়িত্বপ্রাপ্ত মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৬০ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যয় করার কথা। তবে এর সিংহভাগই দেশব্যাপী সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যয় করা হয়। বর্তমানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। ব্রিটিশ আমলে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকরা শহরকেন্দ্রিক ছিলেন। শহরের জনসংখ্যাও ছিল পল্লী অঞ্চলের জনসংখ্যার তুলনায় কম। এ কারণে বলা সম্ভব যে স্বাস্থ্যসেবা বহুলাংশে নগরমুখী ছিল। ষাট দশক থেকে পল্লী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীভূত করা হয়। ফলে পল্লী অঞ্চলে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে থানা-উপজেলা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত বিশাল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা, এসব অবকাঠামো স্থাপন করেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। কারণ সরকারি চিকিৎসকরা পল্লী অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী নয়। অন্যান্য কারণও হয়তো আছে। শহরে অবশ্য কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়নি। এর ফলে একটি বিরাট শূন্যতা বিরাজ করছে।
শহরভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও প্রয়োজনীয় অর্থসম্পদ ও যোগ্য জনবলের অভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়। ১৯৯৮ সালে এ শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় নগরের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চালু করা হয়। প্রকল্পটি এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে। এর সমাপ্তি হবে জুন ২০১২ সালে। এ প্রকল্পের অর্জন এখন পর্যন্ত সীমিত। ছয়টি সিটি করপোরেশন এবং দুইটি পৌরসভার মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৬ শতাংশ নগরবাসীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকার ও নগরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরো উৎস রয়েছে। এক. বেসরকারি চিকিৎসক ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, অগণিত ক্লিনিকসহ ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলো। এনজিওরাও এ কাজে সম্পৃক্ত। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাই রোগীদের এসব সুবিধাদি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কারণ সরকারি ব্যবস্থাপনা এসব ক্ষেত্রে দুর্বল। এতে দোষের কিছু নেই। যে বিষয়টি আশঙ্কাজনক তা হলো, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই মানসম্পন্ন নয়। এদের মান নির্ধারণ করা হলেও সরকারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাঠামো দুর্বল অথবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে। স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে সরকার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। কিছু কিছু খাতে যেমন_এনার্জি ও টেলিকমের জন্য আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কমিশন রয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের ধারণা, এসব কাঠামো সরকার দ্বারাই প্রভাবিত। স্বাস্থ্যখাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একাধিক। এ সত্ত্বেও এসব সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। এ ধরনের নীতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেও এনজিও ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে স্বাস্থ্যখাতেও সেবা প্রদানের প্রথা ছিল, এখনো আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এনজিও শহরে ও গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে লিপ্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীরা সরাসরি এনজিওর অর্থ সাহায্য দিয়ে থাকেন। এর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সাধারণ নাগরিকদের জানা নেই। সরকারের কাছেও এর কোনো তথ্য রয়েছে কি না তাও জানা নেই। নগরভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধিক্ষেত্রে এ ধরনের দ্বিমুখী সেবা প্রদানের কার্যক্রম বর্তমানে চলছে। ফলে দ্বৈততায় বিষয়টিও অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। এমনকি সরকারের উন্নয়ন-সম্পর্কিত দলিলে এ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে এপ্রিল মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খাতব্যাপী (Sector-wide স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কৌশল পরিকল্পনা (Strategic Plan) প্রণয়ন করেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এ পরিকল্পনায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এনজিওর ভূমিকাও উল্লেখ করা হয়। অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নগর স্বাস্থ্য কৌশল প্রণয়ন। শেষোক্ত বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। প্রস্তাবিত কৌশল প্রণয়নের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে রাজশাহীসহ চট্টগ্রামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময় করে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মতবিনিময় সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে আক্ষেপ করে একটি উক্তি করেন। তা হলো, এনজিওরা কোথায় কি কি কাজে লিপ্ত তা তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা জ্ঞাত নন। সময় সময় কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন। চট্টগ্রামের মেয়র এ বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পূর্ণতার বিষয়টি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বিভিন্ন উৎসের এনজিওর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে দ্বৈততার সমস্যা বলা হয়েছে এ বিষয়েও সম্প্রতি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সম্পর্কিত একটি কর্মশালায় অন্তত একটি উন্নয়ন সহযোগী সিলেটে এ সমস্যা রয়েছে মর্মে উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় যে সিলেটে একাধিক এনজিও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে লিপ্ত। সংশ্লিষ্ট এনজিওরাও একই জায়গায় এবং একই সুবিধাভোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। কথিত উন্নয়ন সহযোগী আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবই এ দ্বৈততার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। উন্নয়ন সহযোগীর সুপারিশ হলো, সব ধরনের এনজিওকে একীভূত কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
উপর্যুক্ত সুপারিশটি সময়োপযোগী হলেও অনেকটা একপেশে। সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগীসহ এনজিওর কি কোনো দায়িত্ব নেই? এ প্রশ্নটিও স্বাভাবিক। এ সমস্যা নিরসনের জন্য বহুমুখী প্রচেষ্টার প্রয়োজন। এক. সেবাসংক্রান্ত বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রকল্পের ভৌগোলিক পরিধি সমন্বয় করতে হবে। দুই. প্রকল্পের বিষয়ে সরকারের মতামত প্রার্থনার সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মেয়রদের মতামত গ্রহণ করবে। তিন. নগরভিত্তিক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়-সম্পর্কিত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সর্বশেষ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে নগরভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর রূপরেখা কি হবে? বলা বাহুল্য যে মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের। নগরভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ দ্বায়িত্ব পালন করতে সক্ষম নয়। কারণ বহুবিধ। যেমন_সম্পদসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অপ্রতুলতা। দক্ষ জনবলের অভাব ইত্যাদি। তবে কিছু কিছু সিটি করপোরেশন ছোট আকারের হলেও নিজস্ব হাসপাতাল রয়েছে। অন্যদিকে বড় জেলায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হওয়ার ফলে আগের সদর (জেলা) হাসপাতালগুলো এসব কলেজের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে; কিন্তু নতুন কোনো জেলা হাসপাতাল সৃষ্টি করা হয়নি। অন্যান্য জেলার মধ্যে একটি উদাহরণ রাজশাহী। এসব ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে নতুন জেলা হাসপাতাল অবিলম্বে প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে পরিপূরক কার্যক্রমও গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হবে। এক. যেসব সিটি করপোরেশনে ছোট আকারের হাসপাতাল রয়েছে, সেগুলো সম্ভব হলে সম্প্রসারণ করা। দুই. প্রয়োজনবোধে নতুন ছোট আকারের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। তিন. বিদ্যমান ডিসপেনসারিগুলোর সম্প্রসারণ এবং নতুন কিছু ডিসপেনসারি স্থাপন করা। এর জন্য প্রয়োজন হবে নিয়মিত অর্থ প্রবাহ (Fund Flow)। এ বিষয়টি জটিল। সাধারণভাবে কিছু সুপারিশ অবশ্যই করা যায়। তবে সব কিছু মিলিয়ে প্রয়োজন এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।
লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
সাবেক উপদেষ্টা

No comments

Powered by Blogger.