পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরিপক্ব কূটনীতি-টিপাইমুখ বাঁধ

প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ভারতীয় পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে যেমন ব্যর্থ হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তেমনি পুরো বিষয়টি মোকাবিলায়ও তারা অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভারতের জাতীয় জলবিদ্যুৎ সংস্থা (এনএইচপিপি), রাষ্ট্রায়ত্ত জলবিদ্যুৎ সংস্থা ও মণিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে ২৩ অক্টোবর যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি হয়।


বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি আটকে যাওয়ার পর ভারতের এই উদ্যোগ আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত মাসে বিনিয়োগ চুক্তি সই হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেনেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর। এটি কি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়? এ ব্যাপারে জনগণকে কিছু না জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শুধু বলা হয়, ‘আমরা তথ্য চেয়েছি।’ এখানে তথ্য চাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে না জানিয়ে ভারত কেন এই পদক্ষেপ নিল। ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো স্থাপনা তারা নির্মাণ করবে না। বাংলাদেশের ক্ষতি হবে কি না, তা নিরূপণ করার জন্য তো যৌথ সমীক্ষার প্রয়োজন।
শুরু থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ঢাক-গুড়গুড় ভাব দেখিয়ে আসছে। প্রথমে পররাষ্ট্রসচিব তথ্য চাওয়ার কথা বলেন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ভারতের আশ্বাসে তিনি আশ্বস্ত’ বলে জানান। কিন্তু ভারতের প্রথামাফিক আশ্বাসে যে দেশের মানুষ আশ্বস্ত হয়নি, তা বিভিন্ন মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে ধারণা করতে অসুবিধা হয় না। এর প্রতিবাদে বিরোধী দল সিলেটে ১ ডিসেম্বর হরতাল ডেকেছে।
যে বিষয়ে গোটা জাতির এককাট্টা হওয়ার কথা, সে বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক দোষারোপ দুর্ভাগ্যজনক। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘চুক্তিটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ পানিসম্পদমন্ত্রী বললেন, ‘টিপাইমুখ বাঁধ হওয়ার আগে যৌথ সমীক্ষা হতে হবে। প্রয়োজনে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাব।’ প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে টিপাইমুখ নিয়ে বিএনপির ব্যর্থতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে দেশবাসী আশ্বস্ত হবে না। তারা দেখতে চাইবে, বর্তমান সরকার কী করছে।
সরকার বা বিরোধী দল টিপাইমুখ নিয়ে যৌথ সমীক্ষার বিষয়টি এমনভাবে সামনে এনেছে, যাতে মনে হবে, আর কিছু করণীয় নেই। যৌথ সমীক্ষার আগে দেশের পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করা জরুরি। ভারতের সঙ্গে যৌথ সমীক্ষার আগে নিজস্ব সমীক্ষা ও গবেষণা থাকতে হবে। এ নিয়ে ঢাক-গুড়গুড় ভাব এবং পারস্পরিক দোষারোপ বন্ধ করতে হবে।
আরেকটি কথা, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনা হবে না কেন? ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখলেই বিরোধী দলের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের উচিত সংসদে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা।
টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা ৩০ নভেম্বর নয়াদিল্লি যাচ্ছেন। আশা করব, ফিরে এসে তাঁরা ভারতীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ফলাফল দেশবাসীকে জানাবেন। কেননা বিষয়টিতে কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত হলেই হবে না, দেশবাসীকেও আশ্বস্ত হতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.