সহজ-সরল-ভদ্রলোকের রকমফের কার কার জানা! by কনকচাঁপা

গানের সুবাদে মোটামুটি একজন বাউলের মতো আমার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বাংলার ও পৃথিবীর কোনাকাঞ্চিতে ঘুরতে থাকি- এ কথা আমি অনেকবারই বলেছি। সে সফরগুলোতে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করি। আমরা সব শিল্পীই সেজেগুজে হাসিমুখে গান করি, অনেক সম্মান-ভালোবাস পাই।


কিছু করুণ ও অনভিপ্রেত পাওনাও পেয়ে যাই মুঠি ভরে। কোথাও হয়তো সাউন্ড ভালো থাকে না, কোথাও হয়তো বাকি পারিশ্রমিক নিয়ে উদ্যোক্তা উধাও, কোথাও ঘুমানোর স্থানটি খুবই করুণ ইত্যাদি। সব স্থানেই যে এমন হয় তা নয়। মানুষের সম্মান ও ভালোবাসা ও আদর পেতে পেতেই এই অনভিপ্রেত ঘটনাগুলো আলাদা করে মনে দাগ কাটে। যে গল্পটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, মোটামুটি দূরের কোনো গ্রাম- এ দেশেরই সেখানে এক বিখ্যাত অভিনেতার জন্ম। খুব সুন্দর নামের একটি গ্রাম। সেখানে বিশাল জনসভায় গান গাইতে গেলাম। প্রথমে উড়োজাহাজে, তারপর গাড়িতে। যাচ্ছি তো যাচ্ছি, পথের শেষ নেই। আরো দুজন বড় শিল্পী আছেন। তাঁদের একজনের কথায়ই আমি যাচ্ছি। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য কী, কাদের অনুষ্ঠান, কোথায় থাকব- সবই ভাসা-ভাসা। যাক, গিয়ে উঠলাম উদ্যোক্তার বাড়িতে। প্রাসাদোপম বাড়ি। গাড়ি ঢোকার স্থানেও স্টেডিয়ামের গ্যালারির মতো ব্যবস্থা। উঁচু প্রাচীর। একটা আস্ত গ্রামকে অর্ধেক করলে যত বড় তত বড় সেই বাড়ি। শামিয়ানা টানিয়ে সাত-আট রকম মাছ-মাংস সহযোগে খাবার ব্যবস্থা। চাল না ফুটিয়েই কটকটে ভাত পাতে দেওয়ার প্রচেষ্টায় খাওয়াদাওয়া জলে গেল! অভুক্ত অবস্থায়ই রেস্টে গেলাম। বিশাল রুম, তার ফার্নিচার দেখে দম আটকে আসছিল। ফুলদানি থেকে পাপোশ- সব বিদেশি বাথরুম ফিটিংস দেখে বুঝতে পারিনি প্যারিস না বাংলাদেশে আছি। বাড়িওয়ালা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিলেন দিস ইজ ফ্রম...দিস ইজ ফ্রম...। ওই বাড়ির মাটি ছাড়া বোধ হয় সবই বিদেশি। পেটে খিদে, এগুলো শুনতে মোটেও ভালো লাগছিল না। বিকেলের নাশতায় যা পেলাম তাও মুখে দেওয়ার অযোগ্য। আমি তবু কিছু গলাধঃকরণ করলাম। আমার সঙ্গী? বড়ই অবাধ্য ব্যক্তি তাঁর পছন্দ না হলে কিছুই তিনি খাবেন না। যাক, রাতে অনুষ্ঠানস্থলে গেলাম, গান করলাম। আমার কাজ শেষ। বাড়ির সবাই গেছেন অনুষ্ঠান দেখতে। তবুও ওই খালি বাড়িতে তাদের একজন কেয়ারটেকার সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলাম। অনুষ্ঠানের শাড়ি-গহনা ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে বসে আছি যত শিল্পী (স্থানীয়সহ) ওখানে, সব কিছু শেষ করে বাড়ির লোকজন ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা। ততক্ষণে আমাদেরও পেটের বারোটা বাজবে! আমার সঙ্গী বাড়ির কাজের লোককে ডাকলেন 'বাধ্য হয়ে'। বললেন, 'আমাদের খুব ক্ষুধা লেগেছে, এখানে তো দোকানপাটও নেই যে কিছু কিনে খাব। আপনি একটু চাল ফুটিয়ে আমাদের খেতে দিতে পারবেন?' মহিলা খুবই লজ্জায় পড়লেন। বললেন, 'আমি নিরুপায়।' কেন? জানা গেল ওই বাড়ির মালিকরা যা খান তা কাজের লোকরা পান না। তাদের খাবার আলাদ আর কাজের লোকরা যা খান, তা আমরা মুখেও দিতে পারব না। আর কাজের লোকরাও যে খাবে সে ভাতের চাল তালা দেওয়া। গৃহকর্ত্রীও অনুষ্ঠান উপভোগ করতে গেছেন। তা শেষ করে বাড়ি ফিরলে তালা খুলে দিলে প্রায় ১০-১২ জনের ভাত রান্না হবে। আমার অবাধ্য সঙ্গী তখনো দুমুঠো ভাত খাওয়ার প্রচেষ্টায় কঠিনভাবে রত। তিনি বললেন, 'আমি টাকা দিই, তোমরা একটু চাল কিনে এনে ফুটিয়ে দাও। আমার পেট চোঁ চোঁ করছে। তোমাদের তরকারি দিয়েই না হয়!' ওরা তখন একটা পাতিল এনে ঢাকনা খুলে দেখাল। ডুমো ডুমো করে কাটা মিষ্টি কুমড়া অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হবে- এমন কিছু কুঁচো মাছ আর নাম না জানা শাকের ঘাঁটি। ওটাই প্রধান ব্যঞ্জন। আমি অস্ফুট স্বরে বললাম, দুপুরে যা রাঁধা হয়েছিল তা আপনারা খাননি? এ প্রশ্নে তাদের কারো একজনের চোখে পানি এনে দিল। আমাদের দুজনের খিদে উবে গেল। দুজনই দুজনকে না বলে সুটকেস গুছিয়ে ওদের গাড়িতে করে সেই জেলার সার্কিট হাউসে এসে উঠলাম। পৃথিবীর সর্বোত্তম দেশে ২৫-৩০ বছর থেকে এসে বিদেশি তৈজস, বিদেশি পরিধেয়, বিদেশি চালচলনের খোলসের ভেতর এ কোন ধরনের ভদ্রলোক নামক মানুষ দেখলাম- এমন চিন্তা করতে করতেই বোধ হয় সঙ্গীসহ সেদিন এই বাউল আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সে রাতের ঘুম শেষ হলো পরদিন ভোরে; কিন্তু সে প্রশ্নটা উত্তরহীন হয়েই ঘুরছে মাথায়। প্রশ্নটা হলো 'ভদ্রলোক কত প্রকার ও কী কী? এবং কত ধরনের ভদ্রলোক এই পৃথিবীতে দেখলাম?'

লেখক : সংগীতশিল্পী

No comments

Powered by Blogger.