কালের যাত্রা by পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

গণ-অনশন পালন করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সার্বক্ষণিক মিত্ররা ছাড়াও এই গণ-অনশনে সহমর্মিতা জানিয়েছে যারা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের কথা এখন আর বলার অপেক্ষা করে না। দলগুলোতে কর্মীর সংখ্যা হাতে গোনা। সমর্থকদের তো বেড়জাল দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরামদের গর্জন কিন্তু তাই বলে কম নয়।


তাঁদের ভেতর একজন গত নির্বাচনে অখ্যাত এক আওয়ামী লীগারের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। একজন আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর ও ভরসা রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন। শেখ হাসিনা এই নেতার আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করেননি। অর্থাৎ মহাজোট সরকারের মন্ত্রী বানাননি। এককালের কট্টর আওয়ামীবিরোধী এই নেতা আড়াই বছর প্রতীক্ষা করে বুঝে গেছেন ভাগ্যে শিকা ছিঁড়বে না। তাই তাঁর এখনকার হম্বিতম্বিটা হয়েছে দৃষ্টিকটু এবং শ্রুতিকটু। বিএনপি-জামায়াত জোটের যেখানে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল সফল করতেই কাছাখোলা অবস্থা, সেখানে তিনি মাসব্যাপী হরতাল দিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর হুংকার ছাড়েন। কিসের জোরে তিনি এই হুংকার ছাড়েন আল্লা মালুম। ডিসেম্বরের ভেতর সরকার পতনের আগাম ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। সরকার পতনের আগাম ঘোষণা এ দেশে নতুন ঘটনা নয়। চারদলীয় জোট আমলে আওয়ামী লীগের জলিল সাহেবও এ রকম দিনক্ষণ ঠিক করে আগাম ঘোষণা দিয়ে হাস্যকর অবস্থার অবতারণা করেছিলেন। গণ-অনশন পালন শেষে বিরোধী নেত্রী আর হরতাল না করার কথা বলেছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তাঁর এই ঘোষণা প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি তিনি যে বলেছেন ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেবেন তা অশোভন ও রাজনৈতিক রুচিহীনতার পরিচয় দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এ কথার যথার্থ জবাব দিয়েছেন। বিরোধী নেত্রীর বক্তব্যে সংবিধানের প্রতি যে অশ্রদ্ধার ভাব প্রকাশ পেয়েছে তা কেউই পছন্দ করেনি। আসলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট ঘটনার চার্জশিট ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আরাফাত রহমানের দুর্নীতির শাস্তিতে তাঁর মাথা ঠিক নেই। বিরোধী নেত্রী হরতাল না করার ব্যাপারে যে কথা বলেছেন তা বাস্তবতার নিরিখেই বলেছেন। এ মাসের ৬ ও ৭ তারিখের হরতালে জনসমর্থন ছিল না। নিজ দলের নেতা-কর্মীরাও হাত গুটিয়ে থেকেছেন। মিডিয়াকর্মীদের কাছে কেউ কেউ বলেছেন, পুশিলে মারে। পুলিশ নাকি দলীয় কার্যালয়ের বাইরে আসতে বাধা দেয়। এ দেশে অতীতেও হরতাল হয়েছে, পুলিশ সেখানেও বাধা দিয়েছে। পুলিশের কর্তাকে তোয়াক্কা না করে রাজপথে নেমেছেন দলের কর্মীরা। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো দৃপ্ত তাঁদের মিছিল। অধিকার আদায়ের স্লোগানে উত্তোলিত তাঁদের মুষ্টিবদ্ধ হাত। দাবি আদায়ের অঙ্গীকারে হরতাল পালনকারী মিছিলের মুখগুলো আপসহীন। ৬ ও ৭ তারিখের হরতালে এসবের কিছুই ছিল না। জয়নুল আবদিন ফারুককে যখন পুলিশ পেটাল, তখন তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি দলের কোনো কর্মী। অথচ পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, পুলিশের মার থেকে নেতাকে রক্ষা করতে শত শত কর্মী নিজের পিঠ পেতে দিয়েছেন পুলিশের নির্মম আঘাতের সামনে। নেতারাও পুলিশের মার থেকে বাঁচতে কোনো দিন দৌড়ে পালিয়ে আদর্শ, সাহস ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করেননি। জয়নুল আবদিন ফারুকের ঘটনায় বিজ্ঞজনরা যেসব পুলিশ অফিসারের নামে আজ ধিক্কার দিচ্ছেন তাঁরা কি চার জোট আমলের কহিনূরের কথা ভুলে গেছেন? তবে হ্যাঁ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক নেতার গায় লাঠি তোলা পুলিশের কাছে কাম্য নয়। কেবল রাজনৈতিক নেতা কেন, যেকোনো নাগরিকই পুলিশের লাঠিপেটা বা দুর্ব্যবহারের শিকার হতে পারে না। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। টেলিভিশনের ফুটেজ দেখলে বোঝা যায়, পুলিশ অফিসারদের মুখের ওপর কী পরিমাণ ঘৃণার শব্দ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে! তবু তাঁরা আরো ধৈর্যশীল এবং সংহত হতে পারতেন না কি? ঘটনার শুরুতে যেটুকু হয়েছিল, তারপর ন্যামভবনের লিফটের সামনের ঘটনাটুকু বাড়তি বৈকি! না হলেই বরং ভালো হতো। এক সিনিয়র সাংবাদিক বন্ধু বলেছেন, ওউ বাড়তিটুকু বোধ হয়, 'ওয়্যারলেসের মার'। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে অনেক সহকর্মীকেই 'ওয়্যারলেসের মার' খেতে দেখেছি। তবে দু'চারজন মারমুখী পুলিশ অফিসারের জন্য যাঁরা পুরো পুলিশ বিভাগকে দায়ী করেন তাঁরা বোধ হয় ঠিক করেন না। এই হরতালের পরপরই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ডাকা অযৌক্তিক এবং হেতুবহির্ভূত হরতালে আলখাল্লা মোল্লাদের হাতে যখন কিছু পুলিশ অফিসার রক্তাক্ত হলেন তখন তা নিয়ে সমবেদনা জানানোর লোক খুব একটা দেখা যায়নি। এ প্রসঙ্গে শেষ করি একটি মাত্র কথা বলে। ঘটনার পর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী জয়নুল আবদিন ফারুককে একবার হাসপাতালে দেখতে গেলেই পারতেন। সব বিচার-বিবেচনার পর তাতে ঢের লাভই হতো। ৬ ও ৭ তারিখের হরতালে জয়নুল আবদিন ফারুকের ঘটনা ছাড়া আলোচনা করার মতো আর কিছুই তো নেই। বরং হরতাল আহ্বানকারী নেতাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত হরতালের দিনগুলোতে ঠিকই খোলা ছিল। যে জয়নুল আবদিন ফারুক হরতালে ঘটনা সৃষ্টি করলেন, তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হরতালের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া লাগেনি। দেশের প্রায় প্রতিটি পাঠকনন্দিত দৈনিকে সেসব খবর ছাপা হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়েছে সচিত্র প্রতিবেদন। যে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সৎ ও নিবেদিত বলে দাবি করে তাদের সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব কিছুই খোলা রেখে আবারও প্রমাণ করেছে, তারা মিথ্যাচার করে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাঁওতাভাজি করে। ভণ্ডামি ছাড়া যে তাদের চরিত্রে সততা বলে কিছু নেই তা বারবার প্রমাণ করে জাতিকে বিভ্রান্ত করার পুরনো খেলাই তারা এখনো খেলে যাচ্ছে। নবম সংসদের সমাপনী অধিবেশনের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী সত্যই বলেছেন যে একদিকে অহেতুক হরতাল ডেকে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু রেখে বিরোধী দল প্রতারণা করছে সেই সাধারণ মানুষের সঙ্গেই। এ ধরনের ঘটনা এর আগেও দেশে ঘটেছে। কিন্তু কেউ কেউ অতীতে করেছেন বলে সবাই হিপোক্রেসি করবেন, সেটা তো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। আসলে সততা জিনিসটি রাজনীতিবিদদের চরিত্র থেকে টিকটিকির লেজের মতো খুব দ্রুত খসে পড়ছে। তাই কর্মী-সমর্থকদেরও অসৎ বানিয়ে নেতাগিরি করার প্রবণতা এখন বেশি দেখা যায়। এ ধরনের হঠকারী চরিত্র থেকে রাজনীতিবিদের বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থ ও পেশিশক্তি দিয়ে নয়, আন্তরিক ভালোবাসা, সততা, সহমর্মিতা, দায়বদ্ধতা ইত্যাদি শুভ গুণ দিয়ে জয় করতে হবে সাধারণ মানুষের মন। 'আমি তোমাদেরই লোক'_এই বিশ্বাস ও আস্থা যেন সাধারণ মানুষ খুঁজে পায় নেতার চরিত্রে। ভণ্ডামি, প্রতারণা, মিথ্যার নিয়ত বেসাতি দিয়ে রাজনীতিবিদরা দেশের রাজনীতির চলমান ধারাকে যদি চালু রাখতে চান, তবে যে সভ্যতার সংকট দেখা দেবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে, মনুষ্য সৃষ্ট সভ্যতার সংকটটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা ঠিকই শুধরে নেয়। প্রধানমন্ত্রী যে প্রতারণার কথা উল্লেখ করেছেন তা দেশবাসী জেনেছে গণমাধ্যমের সত্যনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহের ফলে। এর ফল হাতেনাতে না পাওয়া গেলেও মানুষের মনে প্রতারক রাজনীতিবিদদের প্রতি যে ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা তৈরি হলো তার প্রভাব পড়ুক আগামী নির্বাচনে, সেটাই প্রত্যাশা করি। ক্ষমতাবানদের ঘায়েল করতে ভোটের চেয়ে বড় অস্ত্র তো আর সাধারণ জনের কাছে নেই। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে যারা নিজের আখের গোছানোর ব্যাপারে সেয়ানা সেইসব নেতার হাতে যে দেশ ও মানুষের ভার দেওয়া নিরাপদ নয় সেটা বোধ হয় দিনে দিনে সবাই বুঝতে পারছে। কারণ সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে সচেতন। গণ-অনশন শেষে বিরোধী নেত্রীর আপাতত হরতাল না করার ঘোষণা নিয়েও তাই সবখানে চলছে নানা গুঞ্জন, আলোচনা, বিশ্লেষণ।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.