বৌদ্ধপল্লিতে হামলা: ট্রাকচালকের স্বীকারোক্তি- হামলার জন্য লোক আনা হয় কক্সবাজার থেকে by কামরুল হাসান ও আব্দুল কুদ্দুস

রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলার জন্য লোক আনা হয়েছিল ২৫ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজার শহর থেকে। লোক আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহূত ট্রাকের চালক রমজান আলী গতকাল রোববার কক্সবাজারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা বলেন।


রমজান আলী আসলে চালকের সহায়তাকারী (হেলপার)। ঘটনার রাতে তিনি ট্রাক চালিয়ে হামলাকারীদের রামুতে নিয়ে যান। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় সীতাকুণ্ড থেকে। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ঘটনার রাতে (২৯ সেপ্টেম্বর) ট্রাকটি মেরামতের পর তিনি পরীক্ষা করে দেখছিলেন। এ সময় কক্সবাজার বাস টার্মিনালের সামনে অন্য ট্রাকের হেলপার হারুন, রফিক, রমজান, আমিনসহ ২০-২৫ জন জোর করে তাঁর ট্রাকে উঠে পড়ে। তাঁদের নিয়ে রামুতে গিয়ে দেখতে পান, হাজার হাজার লোক সেখানে জড়ো হয়েছে। এরপর তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে আসতে চাইলে আবারও ৫০-৬০ জন লোক উঠে পড়ে। এদের তিনি চেনেন না বলে জানান। জবানবন্দির পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
জবানবন্দি দেওয়ার আগে রমজান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাড়িও রামুতে। সেখান থেকে তিনি খবর পান, রামুতে বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের মারামারি হচ্ছে। এ খবর জেনেই তিনি রামুতে ট্রাক নিয়ে যান। তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রমজান বলেন, জাকির নামের এক ব্যবসায়ী ট্রাকটির মালিক। ঘটনার দিন কক্সবাজার শহরের মনির হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী ট্রাকটি ভাড়া করেন। পুলিশ মনিরকে খুঁজছে বলে জানিয়েছে।
রমজানের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক যুবক মোহাম্মদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন রাতে তিনি দেখতে পান, কক্সবাজার বাস-ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে বাস-ট্রাকে করে শত শত লোক রামু যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি জানতে পারেন, রামুতে বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের সমস্যা হয়েছে। এ খবর পেয়ে তিনি নিজেও রামুতে যান। ফেরার সময় দেখেন, সবার হাতে লাঠিসোঁটা। চাকমারকুলের বাসিন্দা মান্নান গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, তিনি নিজে দুটি মন্দিরে হামলা করেন। একই ধরনের কথা স্বীকার করেন আবদুল্লাহ ও নুরুল ইসলাম।
রামুতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের হামলায় ১৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ২০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনজন। ১১ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটি: হামলার ঘটনা তদন্তে গঠিত সরকারি তদন্ত কমিটি গতকালও রামুতে বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য নিয়েছে। কমিটির প্রধান ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ হামলার সময় বাইরে থেকে লোক এসেছিল, এমন তথ্য পেয়েছে কমিটি। প্রশাসন সময়মতো ব্যবস্থা নিলে রামুর ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো যেত—এ ধারণা ঠিক কি না, জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বলেন, পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়ও এমন হয়েছিল।
রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা দেবী চন্দ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাইরের লোক আসা বন্ধ করতে ওসিকে চেকপোস্ট বসাতে বলেছিলাম। বেশি করে ফোর্সও আনতে বলি তাঁকে। কিন্তু ফোর্স আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়।’
পুলিশের গোপন প্রতিবেদন: রামু-পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন পুলিশ সুপার সেলিম মো. জাহাঙ্গীর। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, রামু বাজার মোড়ে লোকজন জমায়েত হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে আসেন স্থানীয় সাংসদ লুৎফর রহমান। তিনি চৌরাস্তায় পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বড়ুয়াদের রক্ষা ও বিক্ষোভকারীদের বাধা দিতে তিনি কোনো ভূমিকা নেননি।
এ বিষয়ে বিএনপিদলীয় সাংসদ লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইউএনওর ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তিনি নিজেও বিক্ষোভকারীদের থামানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, এখন এটা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। এটা করা হলে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা রোহিঙ্গাদের প্ররোচিত করে বৌদ্ধমন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন। ওই সময় সাংসদ লুৎফর রহমানও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রামু আসছেন। রামু খিজারী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জনসভায় ভাষণ দেবেন তিনি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গতকাল শহরে শান্তি শোভাযাত্রা বের করেন।

No comments

Powered by Blogger.