কথা সামান্যই-মামুলিতত্ত্ব ও ফালতু যুগ by ফজলুল আলম

বর্তমান যুগকে কী নামে অভিহিত করা যায়? উন্নয়নের যুগ, বিশ্বায়নের যুগ, উত্তর-আধুনিক যুগ ইত্যাদি। এত সব নামকরণের পেছনে অনেক বা কিছু যুক্তি ও তত্ত্বও আছে। কিন্তু আমার ধারণায় তাদের দেওয়া কোনো তত্ত্বই সঠিক নয়। বছর পাঁচেক আগে অরুন্ধতী রায়ের লেখা পড়ে আমি একমত হয়ে এই যুগের নাম দিয়েছিলাম 'বিপথগমনের


যুগ'। সব যুগের পেছনে কিছু ঐতিহাসিক তত্ত্ব থাকে এবং আমি এই বিপথগমনের যুগের পেছনের তত্ত্বের যথাযথ নাম দিয়েছি- 'মামুলি তত্ত্ব'। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক- অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের পেছনে এই 'মামুলি তত্ত্ব'ই কাজ করছে। এই লেখাটি আমার এই অনন্যসাধারণ তত্ত্বটিকে পাঠকের কাছে স্বীকৃত ও গৃহীত করবে- এই বিশ্বাস আমার আছে।
বিশ্ব এখন অনেক অগ্রসর। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-প্রযুক্তি- এসব লাগামহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা উন্নত থেকে উন্নততর জীবনের সন্ধানে ব্যস্ত- অনেকে সেটাও খুঁজে পাচ্ছে, অনেকে আবার খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে। উন্নতি করার পথ বাতলাতে গিয়ে বিশ্বায়নের প্রবক্তারা অগ্রসর হওয়াকে একটি বিশিষ্ট ট্রেনে ওঠার সঙ্গে তুলনা করেন এই বলে যে এই ট্রেনে উঠতে পারলেই তুমি বিশ্বায়নের সুফল পেতে শুরু করবে। চমৎকার কথা, শুনেই মনে হয় সব ফেলে, সব ছেড়ে-ছুড়ে ট্রেনটায় উঠে পড়ি। কিন্তু কোথায় সেই ট্রেন? কোথায় ট্রেনলাইন? সেসব খুঁজে পেতে অনেক সমস্যা। পেলামও যদি বা, টিকিট চেকার বা ট্রেনের কর্তৃপক্ষ (সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র) আমার পরিচয়পত্র চেয়ে বসতে পারে। তাতে যদি আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়, তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই!
যাকগে, এগুলো ফালতু কথা। মূল কথাটি হচ্ছে, বিশ্বের উন্নয়ন ও সভ্যতার বিকাশের সময় আমি এ ধরনের তত্ত্ব হাজির করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছি না তো? বিভ্রান্তি কিছুটা হবে- কারণ আমার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টা খুব কম ব্যক্তিই দেখছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-প্রযুক্তি এগোচ্ছে ঠিকই; কিন্তু একই সঙ্গে সভ্যতার বিকাশ নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। সভ্যতার সংকট নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি, কিন্তু সেসবের অধিকাংশই দুই মহাযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত। বর্তমান সময়ের যুদ্ধবিগ্রহের বিষয়ে 'সভ্যতার সংকট' কথাটি আর আলোচনায় আসে না, উল্টো আসে 'সভ্যতার প্রচার-প্রসার' অথবা আরো এক মামুলি তত্ত্ব 'সভ্যতাগুলের মধ্যে সংঘর্ষ'। দুষ্টু ও 'অসভ্যভাবে সভ্য' দেশগুলোকে শায়েস্তা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেখানে প্রো-পাশ্চাত্য সরকার প্রতিষ্ঠা করা এখন মহৎ উদ্দেশ্য বলে গণ্য করা হয়- অবশ্য সেসবের পেছনে অনেক অভিসন্ধি (সু-র চেয়ে কু-ই বেশি) থাকে, যেমন- নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত দেশের সম্পদ সুকৌশলে আন্তর্জাতিক নিয়মের মধ্যে পাচার করা। এর সবই এখন অহরহ ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে- তার পরও আশ্চর্য যে সেসব দেশের জনগণ মূষিকের মতো সব সহ্য করে যাচ্ছে। কিছু দেশে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ব্যবস্থা জনগণ নিলেও তাদের দমন করা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়; পাশ্চাত্য শক্তি এই দমনকাজে এগিয়ে আসে। প্রথমে তারা নিজেদের ঘোষিত নীতির সমর্থনে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করে। তারপর দোষারোপ করে জঙ্গিবাদকে, গরিবদের বিদ্রোহকে বা ইন্ধন জোগানোর জন্য অপর কোনো দুষ্টু বৈদেশিক শক্তিকে, অসভ্য সংস্কৃতির দেশগুলোকে ইত্যাদি। তাদের এই বারবার প্রায় একই ফন্দি, কৌশল, মতলব একঘেয়ে হয়ে উঠলেও তারা পরোয়া করে না, এমনকি উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও জিতে গেছে- এমন ভাবভঙ্গি করা থেকে তারা কখনোই বিরত হয় না।
প্রশ্নটা হচ্ছে, বিশ্বের জনগণ কেন প্রতিবাদ করে না? মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন লেখক, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ছাড়া (নিকোলাস হুইলার, মাইকেল ইগনিয়েটফ, মিশেল ফুকো, অরুন্ধতী রায়, নোয়াম চমস্কি প্রমুখ) কেউই উচ্চবাচ্য করে না। এমনকি পত্রপত্রিকাগুলোও নিরপেক্ষভাবে খবর ছাপিয়েই খালাস, দু-একটা প্রতিবাদী কমেন্ট্রি থাকলেও থাকতে পারে (ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য গার্ডিয়ান)। কিন্তু বিশ্ব অপশক্তির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে না কেউ?
লাগবেই বা কী করে? সময় কোথায়? সারা বিশ্বে এখন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত বিনোদনে ভরে গেছে। তার ওপর সামাজিক সংস্কৃতিতে এসে গেছে আমূল পরিবর্তন। বিশ্বের প্রায় সব দেশে (ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে) স্যাটেলাইট প্রযুক্তির প্রসারে ওয়াইফাই, সেলফোন, টাচস্ক্রিন কম্পিউটার, নতুন আঙ্গিকের সিনেমা, টেলিভিশন, অদৃশ্য টেলিভিশন- কত কী মানুষের দৈনিক জীবন ভরিয়ে রেখেছে (আমাদের দেশেও টেলিভিশন সিরিয়াল না দেখতে দিলে বাসায় কাজের লোক পাওয়া দুষ্কর)। এত সব ছেড়ে কোথায় ন্যাটো কয়টা বোমা মারল, কোথায় জঙ্গিদের পুঁতে রাখা বোমা ফেটে ভুল টার্গেটে মানুষ মরল, কোথায় গণহত্যা হচ্ছে বলে সেখানের শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো বিরক্তিকর কাজের দাবি ঘাড়ে এসে পড়ল ইত্যাদির পেছনে দেওয়ার সময় কোথায়? দুই চক্ষু বুজে বিনোদনের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া অনেক আনন্দের কাজ।
তাহলে মামুলি তত্ত্ব আসে কী করে? আসে একটু ঘোরা পথ ধরে। বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সংগীত, শিল্পকলা- এসবের দাবি দিন দিন বেড়েই চলছে, অথচ এই বৃহত্তর দাবি মেটাতে জনগণকে সত্যিকার শিক্ষা দেওয়ার অবস্থা আর নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রচুর অর্থের জোগান ছাড়া এসব বিনোদন ঘরে বসে তানপুরা বাজালে হয় না। তার ওপর এসব থেকে প্রচুর অর্থের আগমন হয়। ফলে সাংস্কৃতিক বিনোদন হয়ে গেছে একটা অর্থকরী বিষয়। এখানে এখন সত্যিকার অর্থে শিল্পের সাধনা হওয়ার মতো অবস্থা নেই। যা প্রমোট করলে বিনোদন ভোক্তারা খুশি হবে, তা সত্যিকার সংগীত দিয়েই হোক বা যৌনতার ছড়াছড়ি করেই হোক বা টিনএজারদের কল্পনাবিলাস পূর্ণ করার কথা বা অ্যাকশন দিয়েই হোক- সেসবই দিতে হবে। তাতে না থাকুক সত্যিকার সংগীত। যে জন্য আমরা কথা পাই 'তুমি চলে গেলে- যাবার আগে একটি চুম্বনও দিলে না, সেলফোনের নম্বরও না...তুমি গেলে চলে...', এসব লিরিকের সঙ্গে মজাদার পোশাক-আশাক, রংবেরঙের চুল, দ্রুত তালের গিটার ও ড্রাম দর্শক না মাতিয়ে পারে না। বিনোদনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই মামুলিত্বের ছড়াছড়ি। আমাদের টেলিভিশনে নাটকগুলোর কাহিনীর মামুলিত্বের কথা এখানে না ওঠালেও চলে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কী দেখছি? উচ্চশিক্ষার পেছনে দৌড়াচ্ছে সবাই, যোগ্যতা বা প্রয়োজন আছে কী নেই- সে দিকে লক্ষ নেই। নতুন প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতিতে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি নিচ্ছে। একের পর এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে- ভালো কী মন্দ তা দেখা হবে পরবর্তী কোনো একপর্যায়ে। শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার সময় মান নিরূপণ হয় অর্থবিত্তের ক্ষমতার ওপর। এসএসসি পরীক্ষায় পাসের বর্ধিত হারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এত এত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু কী শিক্ষা এখানে তারা পাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র, মামুলি বিদ্যার স্থান এটা নয়।
আমাদের মামুলি জীবনকে উন্নতমনস্ক করার কোনো পথ আর খোলা নেই। আমরা যা করছি, যে পথে আমাদের যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, যেসব সাংস্কৃতিক বিনোদন আমাদের উপভোগ করতে দেওয়া হচ্ছে- সেসবের একটা বিরাট অংশ ফালতু। আমরা ধীরে ধীরে ফালতু যুগে প্রবেশ করছি, আমরা একেকজন একেকটা আমড়া কাঠের ঢেঁকিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা মুষ্টিমেয় ক্ষমতাসীন লোকের নির্ধারিত ব্যক্তিদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে- আমাদের মতো সাধারণ মানুষের স্থান সেখানে কেউ দেবে না। আমরা মামুলি তত্ত্ব নিয়ে থাকি- সেটাই ক্ষমতাসীনরা চায়, আর যুগটা ফালতু যুগের দিকে ধাবিত হোক- সেটাও তাদের ইচ্ছা।
তার পরও কথা থেকে যায়। এত এত মামুলিত্বের মধ্যেও আমরা দেখছি, মানুষ হাল ছেড়ে দেয়নি, সত্যিকার শিল্প, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা তারা কোনো প্রতিদানের আশায় না থেকেও করে যাচ্ছে। বিনোদনের জগতে সব ট্র্যাশের মধ্যেও প্রতিভার ছাপ দেখা যাচ্ছে, সাহিত্যে আবর্জনার স্তূপের মধ্যে জ্বল জ্বল করে কিছু কালজয়ী রচনা। আমরা জয়ী হবই, আমাদের জীবন থেকে মামুলি কর্মকাণ্ড বিতাড়িত করবই- ফালতু যুগকে আমাদের গ্রাস করতে দেব না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক

No comments

Powered by Blogger.